বেড়ার পাশ ধরে বুনো বেগে ছুট দিল রঘুনাথ। হঠাৎ একজনের গরম নিঃশ্বাস তার ঘাড়ের উপর পড়তেই সে পাশের বেড়ার দিকে তাকাল। ঝিঙেলতা জড়িয়ে আছে কঞ্চির বেড়ায়। মাঝেমাঝে হলুদফুল ফুটে আছে ঝিঙেগাছের গয়নার মতো। কিছু দূরে দূরে খুঁটিবাশ পোঁতা।
জয় মা শীতলাবুড়ি। রঘুনাথ বেড়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চোখের পলকে টান দিয়ে একটা খুঁটি বাশ উপড়ে নিল। বাঁশটা আঁকড়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরে বুঝি অপদেবতা ভর করল। মাথার উপর খুঁটিবাশটা তুলে ধরে সে বোঁ-বোঁ শব্দে উন্মাদের মতো ঘোরাতে লাগল, আয়। মায়ের দুধ খেয়ে থাকলে এগিয়ে আয়।
মুখের দুপাশে গাঁজরা উঠে এল রঘুনাথের। সে গো-হাঁপানো হাঁপাচ্ছে। তার বুক কামারশালার হাঁপরের মতো ওঠা-নামা করছে ঘনঘন। খুঁটিবাঁশটা মাথার উপর তুলে সে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
বিকেলবেলায় স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে অমলকান্তিবাবু রোজ হাঁটতে বেরন। তিনি হঠাৎ খণ্ডযুদ্ধের এই দৃশ্য দেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলেন। স্কুলের ছেলেরা খোলা বাঁধের উপর নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে এটা কোনোমতে বরদাস্ত করা যাবে না। তিনি দূর থেকে চিৎকার করে উঠলেন, এ্যায়, লাঠি ফেলে দাও। কী হয়েছে? কী হয়েছে তোমাদের? কেন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছ? অমলকান্তিবাবু পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। অন্ধকার তখনও পুরোপুরি গাঢ় হয়নি। রঘুনাথকে চিনতে পারলেন তিনি, এ্যায় রঘু। বাঁশটা নামাও। মারামারি করলে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?
রঘুনাথ হাতটা শিথিল করতেই খুঁটিবাশটা তার পায়ের কাছে পড়ে গেল। মুখের গাঁজরা মুছে নিয়ে রঘুনাথ উত্তেজনায় ভেঙে পড়ল, মাস্টারমশাই, ওরা ভেবেছিল একলা পেয়ে আমাকে গুম করে দেবে। কিন্তু মা শীতলাবুড়ি আমাকে বাঁচিয়ে দিলো।
-শান্ত হও। মাথা ঠাণ্ডা করো। অমলকান্তি বোঝাবার চেষ্টা করলেন, এ্যায়, তোমরা কারা? কোথায় থাকো? কেন এসব করছো? এসব করে কি সুখ পাও তোমরা?
তিনটে ছেলে হকচকিয়ে তাকাল।
কাশীনাথ মাটি আঁকড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে কোনোমতে। ওর সারা শরীর কাদায় মাখামাখি। কপাল চুয়ানো রক্ত গালের দু’পাশে জমাট বেঁধে জোঁকের মতো শুয়ে আছে। তবু ও টলতে-টলতে অমলকান্তিবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল, স্যার, এই রঘু…আমার বোনের সর্বনাশ করে দিয়েছে। আমার বোন। কথা শেষ করতে পারল না কাশীনাথ, কান্নার ঝড়ে গুমরে উঠল সে।
অমলকান্তিবাবু কাশীনাথের কাঁধের উপর হাত রেখে বললেন, শান্ত হও। তোমাকে আমি ভালো ছেলে বলে জানতাম। বড়ো হচ্ছে। এখন পথে-ঘাটে মারামারি করা কি তোমাদের শোভা দেয়?
কাশীনাথ মুখ নামিয়ে নিল না; সংকোচ, লজ্জা বা অনুশোচনা কোনোকিছুই তার মধ্যে সংক্রামিত হল না। অমলকান্তিবাবুর চোখে চোখ ফেলে সে বলল, আজ রঘু বেঁচে গেল কিন্তু আজকের দিনটাই শেষ দিন নয়। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন নিয়ে একটা বছর হয়। একটা দিন বরবাদ হলে কিছু যায় আসে না। কাশীনাথ এবার তার সঙ্গীদের দিকে তাকাল, চল। এক মাঘে শীত যাবে না। রক্তের বদলা আমি রক্ত দিয়ে নেব। আমিও সুফল ওঝার ছেলে। যত বড়ো ফণা তুলুক না কেন সাপ-সেই সাপের বাঁচা-মরা সব আমার হাতেই থাকল।
টিপটিপিয়ে বৃষ্টি শুরু হতে ওরা আর দাঁড়াল না, জামতলা পেরিয়ে দৌড় লাগাল গাঁয়ের দিকে।
বৃষ্টির শব্দটা কখনও কখনও যুদ্ধের শব্দ বলে মনে হয়।
অমলকান্তিবাবু ছাতার নীচে ডেকে নিয়েছেন রঘুনাথকে, তোমাদের সমস্যাটা কি বলো তো?
রঘুনাথ দ্বিধা সরিয়ে তাকাল, ওর বুনের সাথে আমার ভাব হয়েছে। কিন্তু ওরা কমলাকে আমার সাথে মিলামেশা করতে দেবে না। আমি ছোট জাত। এই নিয়ে ওদের মনে গুঁজকাটালি।
মেয়েটা কি সত্যি তোমাকে ভালোবাসে?
রঘুনাথ অবাক চোখে তাকাল, আমার সাথে ঘর বাতে না পারলে কমলা পাগল হয়ে যাবে। এখুনই পাগল হয়ে গিয়েচে। মা-বাপ ওকে অন্য জায়গায় ব্যা দিবে।
সমস্যাটা অনেক গভীরে। কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না অমলকান্তিবাবু। গ্রাম- সমাজের দ্রুত বদল ঘটছে। বর্ণবৈষম্য এখনও গোপন-রোগের মতো ছড়িয়ে আছে গ্রামে-গঞ্জে। খবরের কাগজের পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি বিজ্ঞাপন দেখে এর অনুমান করা যাবে না। যতই আলো এসে পড়ুক তবু এই কঠিন চাপবাঁধা অন্ধকার সহজে অপসারিত হবার নয়।
কালীগঞ্জ-লাখুরিয়ায় অমলকান্তিবাবুর অনেকগুলো বছর অতিবাহিত হল। এখনও কুসংস্কারের সব লৌহকপাট তিনি কি ভাঙতে পারলেন? এসব সমাজ সংস্কারের কাজ সফলভাবে করতে গেলে যে শিক্ষার প্রয়োজন হয়, সেই পরিকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।
ধাওড়াপাড়ার কাছে এসে অমলকান্তিবাবু বললেন, তুমি এবার বাড়ি যাও। আমি এখান থেকে ফিরব। আজ যা আবহাওয়ার অবস্থা, আজ বেশিদূর যাওয়া আমার উচিত হবে না।
অমলকান্তিবাবু ফিরে যেতেই রঘুনাথ ঘরের দিকে গেল না। কী মনে করে সে সোজা চলে গেল বুড়িগাঙের কোলে। সারা শরীর কাদা-জলে মাখামাখি। এ অবস্থায় ঘরে ফিরলে দুর্গামণির প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হবে।
নিজের দিকে একবার তাকাল রঘুনাথ, তারপর বুড়িগাঙের পাড় থেকে সে সশব্দে লাফিয়ে পড়ল জলের উপর। অন্ধকারে সাঁতরে সে চলে গেল বহুদূরে। ক্লান্ত হয়ে আবার ফিরে এল পাড়ে। কপালের কাছটা সুপারির মতো ফুলে আছে। এতটাই ফোলা যে দুর্গামণির নজর এড়াবে না। এ ফোলা সহজে মেলাবারও নয়।
