-বল কি? দুর্গামণির গলা কেঁপে উঠল বিস্ময়ে, তাহলে কাল আমি ঠিক সকালে আসব।
-আসার সময় পেছন ফিরে তাকাবি না। পেছন ঘুরে দেখলে হওয়া কাজ হয় না। ভূষণীবুড়ি সতর্ক করল।
দুর্গামণি তাকে পাল্টা চাপ দিল, ফিসফিসিয়ে বলল, আমি যা বললাম এ কথা যেন দু-কান না হয়। তাহলে সুফল ওঝা রঘুর ক্ষতি করে দেবে।
সুফল তো ছেলেমানুষ, ওর মরা বাপেরও ক্ষেমতা হবে নি। আত্মসম্মানে ঘা লাগতেই চটে উঠল ভূষণীবুড়ি।
শেকড় ছোঁয়ানো ফণা তোলা সাপের মতো ঝিমিয়ে গেল দুর্গামণি, গলা খাদে নামিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বলল, মনে দুখ লিয়ো না। কী বলতে কি বলে ফেলেচি। ছেলের চিন্তায় মাথাটা আমার ঠিক নেই।
–যা বউ, কতা আর বাড়াস নে। কাল সকালে আসিস। ভূষণীবুড়ির কথায় গাম্ভীর্য ফুটে উঠল।
দুর্গামণি ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। কিছুটা হলেও তার মনের ভার কমে এসেছে। দয়ালের মৃত্যুর পর ভূষণী ময়ূরভঞ্জ চলে গিয়েছিল। সেখানে বেশিদিন থাকেনি তবু যা শিখে গাঁয়ে ফিরেছে তার দাম নেহাৎ কম নয়। নীলকণ্ঠকে কি সে বশ করেছিল মন্ত্রবলে? যারা নিন্দুক তারা এ কথা আজও রটিয়ে বেড়ায়।
ভূষণী বুড়ির হৈ-চৈ নেই। সে বয়স্ক কুসুমগাছের মতো গম্ভীর আর লক্ষ্যভেদী। তার মন্ত্র সাপের মতো এঁকেবেঁকে নয়, চলে তীরের মতো সোজা। মা শীতলার দয়া হলে রঘুর প্রেমের ঘুড়িটা কমলার মনটাকে কেটে দিয়ে ছেইরে হয়ে উড়বে। তার নাগাল আর কোনোভাবে পাবে না রঘুনাথ। হাওয়ায় ভাসা ঘুড়ি আর চৈত্রমাসের ফাটা শিমুলতুলোর স্বভাব একই।
.
১৩.
টানা বর্ষায় ভরে উঠেছে মাঠ-ঘাট।
ফিটকিরি রঙের জলগুলো ফিট ব্যামোর রুগির মতো শুয়ে আছে অসাড়। মাঠপালান হাওয়ায় সেই জলে মাঝেসাঝে সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো ঢেউ ওঠে। চার আঙুল উঁচু সেই টেউগুলো গুডুলপাখির মতো জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দৌড়োয়। বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে রঘুনাথ এসবই দেখছিল।
বিকেলের দিকে বৃষ্টিটা পুরোপুরি থেমে যায়, আবার উৎপাত শুরু হয় সাঁঝের পর থেকে। লাল-চা খেয়ে ঘর থেকে বেরনোর সময় দুর্গামণি বলল, অবেলায় আবার কুথায় যাবি বাপ। ঘরে থাক। কখন যে বৃষ্টি হামলা চালাবে তার তো কুনো ঠিক নাই।
রঘুনাথ একবার ভাবল-সে বেরবে না। কিন্তু বিকেল হলে মনটা কেমন ছটফট করে, ঘরে বসে থাকতে একেবারে মন সায় দেয় না। বাইরে না বেরলে গুমোট হয়ে থাকে মন। এসময় জামতলায় বসে বিড়ি ফুকলে এমন সুখ আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
কমলার সঙ্গে বুড়িগাঙের পাড়ে দেখা হয়েছিল রঘুনাথের। ওর শাঁখের মতো মাজা শরীর চিন্তায় নিষ্প্রভ দেখাচ্ছিল। এমন মনমরা, গোড়াকাটা গাছের মতো ঝিমুনিভাব কোনোদিন দেখেনি রঘুনাথ। ফলে এগিয়ে গিয়ে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে তেমন সাহস আর হল না। ওদের ঘনিষ্ঠতার খবরটা সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিন ঘরে এসে সুফল ওঝা শাসিয়ে গেল দুর্গামণিকে, ছেলেকে সামলাও। ওর নজর এখন উপরপানে। নিজেকে যদি না বদলায় তাহলে পরে ওর ডিমা দুটা আমি উপড়ে নেব।
কথাটায় কাঁপুনি ছিল, জুরো-রুগির মতো কেঁপে গিয়েছিল দুর্গামণি। কাঁচা পয়সার মুখ দেখে সুফলের মাথা ঘুরে গিয়েছে। পয়সার গরমে তার এখন ধরাকে সরাজ্ঞান।
গুয়ারাম ঘরে থাকলে এমন অন্যায় মেনে নিত না। এমনিতে সাত চড়ে রা কাড়ার মানুষ নয় সে। তবু অন্যায় দেখলে তার মাথায় কাঁকড়াবিছে কামড়ে দেয়। পারুক না পারুক সে প্রতিবাদ করবে গলার রগ ফুলিয়ে।
দুর্গামণির অপমান হজম করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। সুফল ওঝা কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে হঠাৎ আসা ঝড়ের মতো মিলিয়ে গেল। সেই থেকে মনের ভেতর তছনছ শুরু হয়েছে দুর্গামণির। একা একা সে জ্বলছে। একথা চুনারাম বা রঘুনাথকে সে বলতে পারেনি। যদি সে বলত তাহলে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত তাদের উঠোনে। সুফল ওঝাকে আর মাথা উঁচু করে সাইকেল নিয়ে চলে যেতে হত না।
দুর্গামণির মনটা থেঁতলে যাওয়া কুমড়োর মতো রস চুয়াচ্ছে সর্বদা। ভয়টা তাকে তাড়া করছে মাঝে মাঝে।
পশ্চিমে সূর্য ঢলে যেতেই রঘুনাথ উঠে দাঁড়াল ঘরে ফেরার জন্য। আজও সূর্যাক্ষর সঙ্গে তার দেখা হল না। আর ক’মাস পরে ওর পরীক্ষা। দ্বীপীর কথা তার মনে পড়ল। দ্বীপী কেমন আছে কে জানে।
রঘুনাথ ধাওড়াপাড়ার দিকে হাঁটছিল। বাঁধের উপরটা প্যাচপ্যাচ করছে কাদায়। এঁটেলমাটির কাদা পা-হড়কে দিতে পারে যে কোনো সময়।
রঘুনাথের পা হড়কাল না, তাকে জোর করে ঠেলা মেরে বাঁধের উপর ফেলে দিল কাশীনাথের দলবল। ওরা তৈরি হয়েই এসেছিল। রঘুনাথের বুকের উপর একজন চড়ে বসে বলল, ঢ্যামনার বাচ্চা। আজ তোর একদিন কী …আমাদের একদিন। আজ ভাদুপরবের চোলাই তোর পেট থেকে বের না করে ছাড়ব না।
–তুমরা কি চাও? রঘুনাথ জানতে চাইল বহু কষ্টে।
–আমরা চাই তোর টাটকা মাথা। কথা ফুরোল না, আর আগেই চড় কিল ঘুষিতে তৎপর হয়ে উঠল হিংস্র হাতগুলো। রঘুনাথ দেখল মাত্র হাত পাঁচেক দুরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে কাশীনাথ। ওর ঠোঁটে প্রচ্ছন্ন গর্ব। সেই গর্বে কঠিন হয়ে উঠছে ওর ঠোঁট দুটো।
এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না রঘুনাথ। আচমকা আক্রমণে সে কিছুটা কাহিল। পর মুহূর্তে সে গা ঝাড়া দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল হামলে পড়া তিনজনকে। তারপর চিৎকারে বাতাস ফাটিয়ে ঠুকরে উঠল সে, বেধুয়ার ছা’রা আমাকে মারচে, দাঁড়া দেকাচ্ছি মজা। রঘুনাথ বাঁধের গোড়ায় একটা আধলা ইট দেখতে পেয়ে ছুটে গেল ক্ষিপ্র গতিতে। আধলা ইটটা তুলে নিয়ে সে বুনো মোষের মতো তেড়ে গেল রুদ্ধশ্বাসে। মাটি কেঁপে গেল যেন। যেন ঝড় উঠল। ভেঙে গেল বাঁধ। সজোরে ইটটা কাশীনাথের মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল সে। পাখিমারা টিপ ব্যর্থ হল না। আধলা ইটের আঘাতে কাশীনাথ বাপ রে বলে ঠিকরে পড়ল কাদায়। চারপাশে ছড়িয়ে গেল কাদাজল। রে-রে করে তেড়ে এল বাদবাকিরা। সামনাসামনি লড়াই হলে রঘুনাথ ওদের সঙ্গে পারবে না। ওরা অবশ্যই তাকে ঘায়েল করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।
