এখন বাঁধের উপর আঁধার নেমেছে চাপ চাপ। মাত্র বিশ হাত নীচে খলবল করছে বুড়িগাঙ। মাঠ-আগোলদারের গলা ভেসে আসছে বাতাসে। সাঁঝ লাগার মুখেই খেয়ে নেয় চুনারাম। রঘুনাথও দাদুর পাশে বসে পড়ে খাওয়ার জন্য। এসব সেই কবেকার অভ্যাস, চট করে ছাড়তে চায় না। সাঁঝরাতে খেয়ে ভোররাতে ওঠা ওদের স্বভাব।
দুর্গামণি দূরের ঘরগুলোর দিকে তাকাল। টিমটিম করছে ঘরগুলো। বেশির ভাগ ঘরই অন্ধকার। বাঁধ থেকে পাড়ার মধ্যে নেমে এল দুর্গামণি। এসময় বাঁধের উপর লোক চলাচল কম। শুধু যারা কালীগঞ্জে তাস খেলতে যায় তাদের কথা আলাদা। তারা সাইকেলের প্যাডেল ঘোরায়, হাতে দুই ব্যাটারির টর্চ। ঝড়-বৃষ্টিকে ওরা তোয়াক্কা করে না।
আজ ওদের দেখা পেল না দুর্গামণি। নিশ্চিন্তে সে পাড়ার ভেতর ঢুকে এল। ভূষণী বুড়ির ঘরটাতে আলো নেই। তরল আঁধারে ঘরটাকে কেউ চুবিয়ে দিয়েছে। মনসা গাছটাকে পাশ কাটিয়ে দুর্গামণি উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। দু-একটা জোনাকি মাথার উপর পিটপিট করে জ্বলছে। আজ আর জ্যোৎস্না ফুটবে না, আকাশের কপালের টিপ হয়ে হাসবে না চাঁদ। আজ ঘোরতর অমাবস্যা।
আঁধার রাতকে তবু দুর্গামণির শুভ মনে হয়।
আগড় খুলে সে ঢুকে যায় ভূষণী বুড়ির উঠোনে। পোষা কুকুরটা তাকে দেখে লেজ নাড়ে। শব্দ করে কুঁইকুঁই। কুকুরের এই শব্দ ভূষণীবুড়ির কাছে সংকেত পৌঁছে দেয়। বিছনায় সতর্ক হয়ে বসে ভূষণীবুড়ি অন্ধকারের দিকে তাকাল। পায়ের শব্দটা ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। ভূষণীবুড়ি অন্ধকার চিরে গলা ভাসিয়ে দিল, কে, কে?
–আমি দুর্গা। নিচু গলায় উত্তর দিল দুর্গামণি।
-ওঃ, গুয়ার বউ। আয়, আয়। তারপর সে অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজতে লাগল দেশলাই, না পেয়ে বিরক্তি উথাল উঠল তার শরীরে, দিয়াসিলাইটা যে কুথায় রেকেচি কে জানে। দাঁড়া বউ, দাঁড়া। খুঁজে দেখি। খুঁজতে খুঁজতে ভূষণীবুড়ি একসময় দেশলাইটা পেয়ে গেল। ডিবরি ধরিয়ে ডাকল, আয় বউ, ভিতরে আয়। পথ দেখানোর জন্য ডিবরিটা উঁচু করে তুলে ধরল সে।
দুর্গামণি মাথা নিচু করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। বারো বাই বারো হাত মাপের ঘর, মাথার উপর পচা বড় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ভরা বর্ষায়। রোদ উঠলে এই দুর্গন্ধ আরও বাড়বে।
দুর্গামণি কপাল কুঁচকাল, মাসী গো তুমার কাছে আসতে হল। দিনমানে সময় পাই না, তাই রাতকালে এলাম।
-বল বউ বল, আমায় কি করতে হবে?
–আমার ভারি বিপদ গো।
–কি বিপদ, কিসের বিপদ?
–ছেলেটা মুটে কথা শুনচে না। ওর মতিগতি বুনো হাওয়ার মতোন, আমি কিছু বুঝতে পারছি । দুর্গামণি হাঁপ ছেড়ে তাকাল।
-এখন কাঁচা বয়স, অক্ত টগবগ করে ফুটচে।
–তা লয় মাসী। ও মেয়েছেলের খপ্পরে পড়েচে।
-একী সব্বেনাশের কথা রে? ভূষণী বুড়ি নড়ে-চড়ে বসল, তা মেয়েছেলেটার নাম কি? কুথায় থাকে?
-তারে তুমি চেনো। দুর্গামণির উত্তেজনার পারদ চড়ছিল, সুফল ওঝার মেয়ে কমলা গো। সে আমার ছেলের পেছনে লেগেচে। আর ছেলেও চামএঁটুলির মতন ওর গায়ে লেগে গিয়েচে। শুতে বসতে খেতে মেয়েটার নাম না নিলে ও ক্ষ্যাপা হয়ে যায়। এখুন বলচে–তারে ব্যা করবে।
মুহূর্তে ভূষণীবুড়ি ফিরে গেল তার যৌবনে। নীলকণ্ঠর মুখটা ঘাই দেওয়া বোয়ালমাছের মতো নড়ে উঠল তার মনে। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে সে দুর্গামণির দিকে তাকাল, এই বয়সটাতে ছেলে-মেয়েদের এট্টু উড়ুউড়ু স্বভাব হয়। ভাদুরে কুকুরগুলার মতো ছুঁকছুঁক করে। এটাকে পীরিত করা বলে না, বলে কেচ্ছা। রঘুকে এ পথ থিকে সরাতে হবে। তবে এতে সুফল ওঝার যদি গোপন চাল থাকে তাহলে আমি পারব না। তখন তোরে যেতে হবে বাদকুল্লা। সিখানে মস্ত বড় গুণিন আচে। সে গুরুমারা বিদ্যে জানে। এক ফুঁঃয়ে পাশার ছক বদলে দেবে।
–আমি অতদূর কি যেতে পারব, মাসী?
–এখুনি তোকে যেতে হবে না। আগে আমি চিষ্টা করে দেখি। আমি ফেল হয়ে গেলে ছেলে বাঁচাতে তুকে সিখানে যেতে হবে। ভূষণীবুড়ির নিরাসক্ত কণ্ঠস্বর, এবার খোলসা করে বল তো কি হয়েছিল?
দুর্গামণি যতটুকু বলা যায় ঠিক ততটুকুই বলল, আমার ঘরের রঘুটা রাতকালে মেয়েটার ঘরে চলে যায়। ভাবো তো ওর মা-বাপ যদি টের পায় ছেলেটাকে কেটে দু-টুকরো করে দেবে। দুর্গামণি কথা শেষ করে ফুঁপিয়ে উঠল, তুমি তো জানো–ওর বাপ ঘরে নেই। এখুন যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কি মানুষটার কাছে জবাব দিব।
ঠিক আছে, মাথা ঠাণ্ডা করে বস। গণনা করে দেখি কতদূর কী করা যায়। মাটিতে খোলামকুচির দাগ কেটে আঁকিবুকি করল ভূষণী বুড়ি। তারপর মুখ উঠিয়ে চোখ কপালে তুলে বলল, কেস সুবিধের লয়। ওরে বশীকরণের শিকড়ি খাইয়েছে পানের সঙ্গে।
-রঘু তো পান খায় না। বিস্ময়ে দুর্গামণির চোখ অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। ভূষণী বুড়ি বেদম কেশে বলল, আমার গণনা তো ভুল হবার নয়। ঠিক আছে–আমি আবার গুণচি।
আবার মাটির মেঝেতে আঁকিবুকি দাগ কাটল ভূষণীবুড়ি, দীর্ঘসময় ধরে গণনা করে বলল, বলছিলাম না, আমার গণনা ভুল হবার নয়। আবার দুয়ে দুয়ে চার হল। সব ঝামেলা মিটে গেল।
-তার মানে? দুর্গামণির অবুঝ চোখে জিজ্ঞাসা।
–তুই কাল সকাল সকাল আসবি। আমি তোকে মাদুলি বানিয়ে দেব।
–মাদুলি?
-হ্যাঁ। অস্ত্র ছাড়া লড়াই হবে কি করে? ভূষণীবুড়ির ঠোঁটে স্বস্তির হাসি খেলে গেল, ওই মাদুলির একুশটা গুণ। ওই মাদুলি ধারণ করলে শুধু কমলা কেন ডাকিনী যোগিনী কেউই ছুঁতেও সাহস পাবে না।
