আউটডোরের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে অবনী শুধিয়েছিল, ও ছেলে, তোমার ঘর কোথায় গো? একা এসেচ না সঙ্গে আর কেউ আচে?
রঘুনাথ পায়জামা গুটিয়ে আরাম করে বসে বলেছিল, বাপ গিয়েচে রাঢ় দেশে মুনিশ খাটতে। ঘরে মা আর দাদু আচে। ওরা আসতে পারবেনি। দাদুর গায়ে জ্বর। ওর জন্যি তো ওষুধ লিতে এয়েচি।
লম্বা লাইনটা দেখে অবনী উশখুশিয়ে বলল, দাও তুমার টিকিটটা দাও। যা ভিড়। দেখি ভিতর থেকে বাবুকে বলে ওষুধটা আনতে পারি কিনা।
টিকিটটা নিয়ে অবনী চলে যেতেই রঘুনাথ ভাবছিল-সংসারে মানুষ যে কত রকমের আছে তার কোনো গোনাগুণতি নেই। যেচে আজকাল কেউ কারোর উপকার করে? এমন বোকামানুষ দেশ-গাঁয়ে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। কাগজে মোড়ানো দু-রকম বড়িগুলো অবনী রঘুনাথের হাতে দিয়ে বলল, সাদা বড়িটা দিনে তিনবার। সকাল-দুপুর আর রাতে। আর এই লালচে বড়িটাও দিনে তিনবার। বুঝলে? রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই অবনী দাঁত বের করে শিশুর মতো হেসে উঠল, একদিন সময় করে তুমাদের হলদিপোঁতা ধাওড়ায় যাব। গাঁ ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। গা ঘুরলে মন ফুরফুরে হয়, মনের শান্তি বাড়ে। রঘুনাথ হাঁ করে শুনছিল সব। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কথা বলতে ভালোবাসে এটা দিব্যি বুঝতে পারল সে। কোনোরকম স্বার্থ ছাড়াই অবনী তার ওষুধ এনে দিয়েছে। রঘুনাথ সংকোচ সরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমাদের ঘর কুথায় গো? নেশ্চয়ই নদীয়া জিলায় তুমাদের ঘর নয়?
-ঠিক ধরেচো। আমরা এ জেলার নই। এ জেলায় আমি শুধু পেটের দায়ে। জমিজমা নেই। চাকরি না করলে যে আমাদের পেটে ভাত জুটবিনি। অবনীর পাংশু মুখ থমথমে হয়ে উঠল।
রঘুনাথ লজ্জা কাটিয়ে বলল, আমাদের গাঁয়ে যেও। চালের উপর পুঁইশাক হয়েছে। কেটে দেবো।
–না বাবা, পুঁইশাকের জন্য নয়। যদি যাই তো শুধু তুমাকে দেখতে যাব। অমায়িক হেসে অবনী তার খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বোলাতে লাগল, তুমার দাদু ওষুধ খাওয়ার পর কেমন থাকে জানিও। তেমন হলে তুমি আমার সাথে দেখা করো। আমি ডাক্তারবাবুকে বলে ভালো ওষুধ লিখিয়ে নেব। অবনীর কথায় কী জাদু ছিল, যার ছোঁয়ায় রঘুনাথের সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল, সে অবাক করা চোখে অবনীকে দেখছিল। তার মনে হল গুয়ারাম যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দু-চোখে উপছে পড়ছে স্নেহের সমুদ্র।
বেলা বাড়ে। রঘুনাথ ব্যস্ত হয়ে উঠল, আমি যাই। ঘরে মেলা কাজ পড়ে আচে। আজ দাদুর গা-হাত-পা মুছিয়ে দেব। যাওয়ার সময় বাজার থেকে সাবু কিনতে হবে। সাবু ছাড়া দাদু এখন কিছু খাচ্চে না। মুখে অরুচি হয়েছে।
যাও, যাও। তুমার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম। খাকি প্যান্ট-জামার ধুলো ঝাড়ল অবনী, তা বাবা, তুমার নামটা তো জানা হলো না। কী নাম তুমার?
–আজ্ঞে, রঘুনাথ রাজোয়ার। পাকুড়তলায় গিয়ে আমার নাম বললেই হবে। সবাই আমাদের ঘর দেখিয়ে দেবে। রঘুনাথের কথাবার্তায় সারল্য ফুটে উঠল।
অবনী অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠল, তুমার মতোন আমারও এট্টা ছেলে আচে। ওর নাম শুভ। বাঁধধারের বড়ো ইস্কুলে পড়ে। এর পরের বার এলে আমার কুয়াটারে এসো। শুভ’র সাথে আলাপ হয়ে যাবে।
রঘুনাথ পাকা রাস্তায় উঠে এলেও অবনীর মুখটা তার মন থেকে মুছে গেল না। কিছু কিছু ছবি থাকে যেগুলো স্মৃতিতেও রক্তমাংসের মুখ। অবনী ছবি নয়, রক্তমাংসের মানুষ। ওর শরীরে হাড়ের চাইতে স্নেহ-দয়া-মায়া বেশি। এমন মানুষ সবার বন্ধু হয়। এমন মানুষ এ সমাজে দুর্লভ।
সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে একা পথ হাঁটছে রঘুনাথ।
কাশীনাথকে আর দেখা যায় না, পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে তার স্বাভিমানী চেহারা।
.
দিনভর বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। গাছের পাতা চুঁইয়ে জল ঝরছে হরদম। মাটি ভিজে নরম হয়ে আছে হলদিপোঁতার মুখখানা। বাঁধের উপর হাঁটতে এখন ভয় পায় দুর্গামণি।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে শুয়ে পড়েছে চুনারাম।
দেশ-গাঁয়ে এখন আকাল চলছে কেরোসিনের। চড়া দামে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে কেরোসিন। এর চেয়ে মিঠে তেলের প্রদীপ ঢের ভালো। একবার ধরালে টিমটিম করে চলে অনেকক্ষণ। ঘর আলো নিয়ে কথা।
রঘুনাথ বিছানা নেওয়ার পরেই শুরু করেছে নাকডাকা। ছেলেটা ওর বাপের স্বভাব পেয়েছে। বিয়ের রাতে মানুষটার নাক ডাকার শব্দে ঘুমাতে পারেনি দুর্গামণি। মাস দুয়েক পরে তা মানিয়ে যায়। এই নিয়ে পাড়ার বউদের অনেক কথা শুনতে হয়েছিল তাকে।
-কী ব্যাপার চোখের কোল বসে গিয়ে কাচের গায়ে কালি পড়েছে যে! শরীল সামলে মৌজ-মোস্তি কর। নাহলে মরবি।
ইঙ্গিতটা ভালো নয় তবু হেসে সব হজম করেছিল দুর্গামণি। নাকডাকার কথা সে বলতে পারেনি ওদের। বললে ওরা বিশ্বাসই করবে না। এরও অনেক পরে পেটে আসে রঘুনাথ। স্পষ্ট মনে আছে–বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল দুর্গামণি। শাশুড়ি তার গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল, ভয় পাবে কেন গো বিটি। তুমার নারী জেবন সার্থক হল। গাছে ফল না ধরলে সে আবার কিসের গাছ? যাই, শীতলাথানে গোটা ফল চড়িয়ে আসি। বলেই একটা গোটা পেয়ারা নিয়ে সে খুশি মনে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে সন্ধের পর থেকে। আজ আর খুশি মনে ঘর থেকে বেরতে পারল না দুর্গামণি। মনের ভেতর পশ্চিমী হাওয়া বইছে তার। বুড়িগাঙের জল বেড়ে বুঝি বান আসবে এখুনি। কোনোমতে নাকে-মুখে গুঁজে সে দুটো খেয়েছে। খাওয়ার সময় রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাতে তার কষ্ট হয়েছে। ছেলেটার যে কী হল তা মা শীতলাবুড়িই জানে। যতদিন যাচ্ছে তত যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। মনে তার কোনো স্ফুর্তি নেই। আগে গাঙের জলের মতো সে উছলে উঠত কথায় কথায়। এখন উচ্ছ্বাস তো দূরে থাক এক চিলতে হাসিও তার ঠোঁটে দেখা যায় না। সারাক্ষণ কী যেন ভাবছে। কী ভাবছে তা আর অজানা নয় দুর্গামণির। সুফল ওঝার মেয়েটাই তার মাথা খেয়েছে। বড় ধড়িবাজ মেয়েটা। পুকুরের চালাক রুইমাছের মতো খেলিয়ে একদিন সে সরে পড়বে। এসব মেয়েরা নিজের ভবিষ্যৎ-এর কথা আগে ভাবে। ওদের কাছে প্রেম-পীরিতি কাঁচা বয়সের শরীরের খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। দুদিন গেলেই সেই ভালোবাসার রঙ ফিকে হয়ে আসবে। তখন আম একদিকে আঁটি আর একদিকে পড়ে থাকবে। আমে-দুধে গড়াগড়ি খাবে। রঘুনাথ আঁটির মতো শরীর নিয়ে বেঁচে থাকবে। একবার যদি কেউ মন খুবলে দেয় সে মনের কি দাম থাকল? খুবলে খাওয়া ফল আর খুবলে খাওয়া মন দেবতার ভোগে লাগে না। দুর্গামণির শরীর শক্ত হয়ে গেল চলতে-চলতে।
