চুনারামের শরীরের অবস্থা ভালো নয়, চটা ডাক্তার তার রোগ সারাতে পারল না। পুরিয়া ফেল মেরে গেল ধুমজ্বরের কাছে। চটা ডাক্তার নিজের মুখে বলল, রঘুরে, তোর দাদুকে কালীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যা। ওখানকার বড় ডাক্তারের হাতযশ আছে। তোর দাদুকে ভালো করে দেবে।
চুনারাম হেঁটে যেতে পারবে না। যেতে গেলে খাটিয়ায় নিয়ে যেতে হবে। তার জন্য কম করে চারটে মানুষ দরকার। ধাওড়াপাড়ার এখন যা অবস্থা তাতে চারজন কেন দুইজন পাওয়াই মহা ঝামেলার। কে আর হাসপাতালে যেতে চায় হাতের কাজ ফেলে? পুরুষ যারা ছিল বর্ষা পড়ার সাথে সাথে তারা চলে গিয়েছে খাটতে। ধান বোয়া শেষে ধান কেটে ঘরে ফিরবে ওরা। এসব করতে আরও মাস তিনেকের ধাক্কা। ঘরের মানুষ ঘরে না ফেরা পর্যন্ত চলবে অপেক্ষা।
কাশীনাথ চলতে চলতে আচমকা বলল, একটা কথা রাখবি, রঘু? পারলে কমলাকে তুই ভুলে যা। ওতে দুজনেরই মঙ্গল।
জগৎখালির বাঁধ ইস্কুল ধার থেকে সোজা চলে গিয়েছে বসন্তপুর ধাওড়া এবং সেখান থেকে পাণ্ডবপাড়া, ঘাসুরিডাঙা, এড়েডাঙা ছুঁয়ে একেবারে পলাশী-রামনগরের সুগারমিল। দু-ধারে বিস্তীর্ণ সোনা ফলানো মাঠ এখন আখ আর পাটের সংসার সামলাতে হিমসিম। মাটি এখানকার হারিয়ে দেবে চন্দনের বাহার। খোলা আকাশ বুড়িগাঙের উপর বিছিয়ে দেয় আবরণহীন শয্যা। এমন নৈসর্গিক পরিবেশে কাশীনাথের কথাগুলো রঘুনাথের মনটাকে বাসিফুলের মতো ম্লান করে দিল। সে কী জবাব দেবে কিছু বুঝতে না পেরে কাশীনাথের দিকে অবাক করা চোখে তাকাল, তুমি একথা কেন বললে ঠিকঠাক বুঝতে পারলাম না। কমলা তুমার বুন হলেও সে তো আমার গাঁয়ের মেয়ে। কমলাকে জড়িয়ে তুমার এমন কথা বলা কি শোভা দেয়?
-কেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছিস, রঘু? তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল কাশীনাথ, তোদের মধ্যে প্রেম চলছে এটা অনেকদিন আগে আমি টের পেয়েছি। কমলাকে আমি চিনি। সে আমার কাছে কোনো কথা লুকাতে পারেনি। আমি ওর চোখ দেখে মনের কথা সব বুঝে গিয়েচি।
-কী ওর মনের কথা? রঘুনাথের কণ্ঠস্বরে আগ্রহ ফুটে উঠল।
কাশীনাথ ধীর-স্থিরভাবে বলল, তোর জন্য ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। এসব প্রেম-পীরিতি বেশিদিন টেকসই হয় না। হলেও টোল খেয়ে যায়। তখন দুটো জীবনই বরবাদ হয়।
–তুমি যেটাকে বরবাদ ভাবচো আমি যদি ভাবি সেটাই আমার জেবন-তাহলে?
-আমার ভাবাভাবি নিয়ে তোদের কি এসে যায়? ঝাঁঝালো সুরে বলল কাশীনাথ, দুটো জীবন নষ্ট হয়ে গেলে আমার খারাপ লাগবে। গ্রাম বলে তোকে এত বোঝাচ্ছি। শহর হলে কবে খালাস হয়ে যেতিস।
–তুমি কি আমাকে জানের ভয় দেখাচ্ছ? রঘুনাথের চোখের তারা কেঁপে উঠল, শুনে রাখো আমার আর জান-প্রাণের কুনো ভয় নাই। মার পেট থেকে জন্মেচি যখন মরব তো একদিন। সে যখন মরব তখন দেকা যাবে।
মনে রাখিস, পিঁপড়ের পাখা গজায় মরবার জন্য। কাশীনাথের শরীর কাঁপছিল রাগে, এখনও নিজেকে সামলে নে রঘু না হলে এর মাশুল তোকে দিতে হবে। সুফল ওঝার কত লম্বা হাত তা তুই জানিস নে। জানলে পরে খরিস সাপের গর্তে হাত ঢোকাতিস না!
এসব শোনানোর জন্যি কি তুমি আমাকে ডাকলে? অসিহষ্ণু রঘুনাথের আর কিছু ভালো লাগছিল না, কাশীদা, এবার তুমি যাও। আমাকে একলা যেতে দাও। সাপ-আর নেউলে কুনো সম্পর্ক হয় না।
-ঠিক আছে। তোকে যা বলার আমি বলে দিলাম। পরে আমাকে দোষ দিবি না। কাশীনাথ ঘাড় নাড়ল, তুই তোর বাপ-মায়ের এক ছেলে। আর দুটা ভাই-বোন থাকলে কোনো কথা ছিল না। ওরা সামলে নিতে পারত। কাশীনাথ নাটকীয় ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। ইচ্ছে করেই হাঁটার গতি শ্লথ করে দিল রঘুনাথ। কাশীনাথের উপস্থিতি তার কাছে অসহ্য লাগছিল। চোখ কুটকুট করছিল তার। শয়তান মানুষের ছলচাতুরির কোনো অভাব হয় না। কাশীনাথ একরকম শাসিয়ে গেল তাকে। এমনকী প্রাণের হুমকিও দিয়ে গেল। রঘুনাথ মরতে ভয় পায় না। তবে সে যদি মরে, মরার আগে আর দশটাকে মেরে তবেই সে মরবে। কমলার জন্য এ জীবনটা কিছু নয়। এ জীবনটা সে কমলার কাছে বন্ধক রেখেছে যে। তার এবড়ো-খেবড়ো জীবনে কমলাই ফুল ফুটিয়েছে। ফলে তাকে অবহেলা করলে তার পাপ হবে।
হাসপাতালের বড় ডাক্তার মাটির মানুষ। রঘুনাথ তাকে যতদূর সম্ভব অসুখের কথা বুঝিয়েছে। রুগী না এলে সাধারণত ওষুধ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারবাবু সদয় হলেন। হাসপাতালের টিকিটের উপর ওষুধ লিখে দিয়ে বললেন, যাও, কম্পান্ডারবাবুর কাছ থেকে ওষুধটা নিয়ে নাও। যেমন বললাম–তেমন খাওয়াবে। যদি দেখ জ্বর তিন দিনের মধ্যে কমল না তখন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। কথাটা মনে রেখো। হাসপাতালে ওষুধ আনতে গিয়ে অবনীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল রঘুনাথের। অবনী হাসপাতালের কর্মচারী। ছোটখাটো চেহারার মানুষটার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক সরলতা ফুলের সুগন্ধর মতো ছড়িয়ে আছে। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, মোটা ভ্রূ’র লোকটাকে দেখে রঘুনাথের হঠাৎ করে তার বাবার কথা মনে পড়ে গেল। কতদিন হল ঘর ছেড়েছে গুয়ারাম। আজ সে গায়ে থাকলে রঘুনাথকে ওষুধ নিতে হাসপাতালে আসতে হত না। সংসারের প্রথম দফার ঝড়টা সব সময় সামাল দেয় গুয়ারাম। চুনারাম একটা শক্ত খুঁটি। আজ সেই মানুষটাই জ্বরে কাতরাচ্ছে।
