-যা ভালো বুঝিস কর তবে ভেবে-চিন্তে। পরে যেন কাঁদতে না হয়।
-কাঁদব না মা, আমি তো তোমার মেয়ে। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে কমলা তার কষ্টটাকে বশে রাখার চেষ্টা করল।
কমলা চলে যাওয়ার পর বিলের ধারটা বড়োই ফাঁকা লাগছিল রঘুনাথের। এমন যে ঝড় উঠবে ভাবতে পারেনি সে। মন টলে গিয়েছে বারবার। কমলার যা মানসিক শক্তি, সেই শক্তি রঘুনাথের ভেতরে কেন জন্ম নিল না? কেন বারবার হেরে যাচ্ছে সে। কেন দু’পা এগিয়ে পিছিয়ে আসছে দশ পা? এ অবস্থায় একবার যদি সূর্যাক্ষর সঙ্গে দেখা হত তাহলে বুক উজাড় করে সব কিছু বলতে পারত রঘুনাথ। সব শুনে সূর্যাক্ষ তাকে সঠিক রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে পারত। অনেকদিন হল মানিকডিহি যাওয়া হয় নি তার। সময়গুলো বুনো খরগোসের মতো ছুটে পালিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে রঘুনাথের মনে পড়ে গেল হাবুল চোরের কথা। লুলারামও তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিতে পারে। ওদের অভিজ্ঞতার মূল্য তাকে দিতেই হয়। ওরা ঝুরি নামানো বটগাছের মতো।
লুলারামের প্রস্তাব মেনে নিলে টাকার কোনো অভাব হবে না রঘুনাথের। সে জানে–অর্থবল মহাবল। এর কোনো বিকল্প নেই। গ্রামসমাজে চট করে কেউ টাকা দিতে চায় না। অনেকেই টাকাকে ভালোবাসে নিজের চাইতে। সেই টাকার জন্য সে যদি একটু নীচে নামে তাহলে দোষ কোথায়? হাতে টাকা এলে কমলার সব অনুরোধ সে মেনে নিতে পারবে। কমলাকে আর দুঃশ্চিন্তার বোঝ মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করতে হবে না।
একটা পিটুলিগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রঘুনাথ দু’ভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তাটার দিকে তাকাল। একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে হাবুল চোরের বাড়ি, অন্য রাস্তাটা বাঁক খেয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে সূর্যাক্ষর ঘর। কোনটা বেশি নিরাপদ বুঝতে পারে না রঘুনাথ। সে যেন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে নিভে যাওয়া লম্ফ।
.
ধুলোর পথ টানা বর্ষায় রূপবদল করে চ্যাটচেটে কাদা। সতর্ক হয়ে পা না ফেললে পিছলে পড়ার ভয়। বড়ো ইস্কুলটার কাছে এসে রঘুনাথ শুনতে পেল কাশীনাথ তাকে ডাকছে। আজ কাশীনাথের সঙ্গে কোনো দলবল নেই, সে একা। ফলে রঘুনাথ সাড়া দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মুখ তুলে শুধাল, কী ব্যাপার কাশীদা?
তোর সাথে দুটো কথা আছে, দাঁড়া। জোরে পা চালিয়ে কাশীনাথ এগিয়ে এল, তোর কাছে বিড়ি আছে? যদি থাকে, দে। মাথাটা বড্ড ধরেছে। আর ভালো লাগছে না।
রঘুনাথ অবাক চোখে তাকাল কাশীনাথের দিকে। এত নরম কথার অর্থ বুঝতে পারল না সে। শয়তানের ছলের অভাব হয় না। আজ কি উদ্দেশ্য নিয়ে কাশীনাথ তাকে দাঁড় করাল ঠিক বুঝতে পারল না রঘুনাথ। তিতকুঁড়ো ঢোক গিলে রঘুনাথ হালকা গলায় বলল, তুমি আবার বিড়ি খাওয়া কবে থেকে ধরলে?
কাশীনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে তুই যে খাস? তুই তো আমার চাইতে অনেক ছোট।
পানসে হাসি ছড়িয়ে গেল রঘুনাথের মুখে, বিড়ি খেতে বয়স লাগে নাকি? বিড়ি খেতে গেলে শুধু কলিজার জোর দরকার। এই জোরকে অনেকে বলে দোম। তা বিড়ি যে খাবা–তুমার বুকে দোম আচে তো?
–আছে কী না নিজের চোখেই দেখ।
এবার আর বিড়ি না দিয়ে পারল না রঘুনাথ। শুধু বিড়ি নয়, সেই সঙ্গে ম্যাচিস বাক্সটা সে এগিয়ে দিল।
কাশীনাথ বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে রঘুনাথকে দেখছিল। অস্বস্তি হতেই রঘুনাথ শুধোল, অমন করে কী দেখচো কাশীদা?
-সত্যি কথা বলব? তোরে দেখছি।
ছ্যাঃ, বেটাছেলে আবার বেটাছেলেকে দেখে নাকি?
–কেন আমি দেখছি। এতে কোনো অন্যায় হয়েছে নাকি? কাশীনাথ ঝুঁকে পড়ল সামনে, কমলা তোর কথা খুব বলে। ও যে কত বোকা তা আমি এখন বুঝতে পারছি। আমার মনে হয় বোনটার মাথার ঠিক নেই। তা সত্যি করে বলতো–ওকে তুই কিছু খাইয়েছিস নাকি?
–এসব কী বলচো? রঘুনাথ ঘাবড়ে গেল, আমার বাপ-ঠাকুরদা ওসব বিদ্যে জানে না। ওসব বিদ্যে তো তুমার বাপ জানে, তাকে গিয়ে শুধধাও।
-না, না। তার কোনো দরকার হবে না। কাশীনাথ ঢোক গিলল। প্রসঙ্গ বদলে বলল, কোথায় গিয়েচিলিস অবেলায়?
দাদুর শরীল খারাপ, জ্বর। সাত দিন হয়ে গেল, ভালো হচ্ছে না। রঘুনাথের কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল, বড় কাহিল হয়ে গিয়েছে বুড়া মানুষটা। হাঁটতে চলতে পারে না। বসে থাকলেও টলে পড়ে।
–চটা ডাক্তারের পুরিয়া দিস নি? কাশীনাথ প্রশ্ন করল।
রঘুনাথ সহজভাবে বলল, হ্যাঁ দিয়েছি। কিন্তু তাতে কুনো কাজ হয়নি।
-নেশা ভাঙ করলে পুরিয়া-ওষুধে কাজ হয় না। এর জন্য কড়া-ডোজ দরকার।
সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নাড়ল রঘুনাথ।
কাশীনাথ বিজ্ঞের মতো বলল, এখনকার জ্বর-জ্বালা সব আলাদা। এক ওষুধে কাজ হয় না এখন। এসব জ্বর বাগে আনতে গেলে হাসপাতালের বড়ি-ইনজেকশন দরকার।
কাশীনাথের কথাটা ভুল নয়। চুনারামের জ্বরটার মতিগতি বোঝা গেল না সাত দিনে। সেদিন পণ্ডিত বিলে ছিপ ফেলতে গিয়েছিল চুনারাম। রোদ ফোঁটা দুপুর। বর্ষা কদিন ঢেলেই এখন ক্লান্ত। দম নিচ্ছে। কেঁচো খুঁড়ে মালাই চাকি ভরে ঘর থেকে বঁড়শি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল চুনারাম। বাঁশতলার ছায়ায় বসে বঁড়শি ফেলেছিল সে। হঠাৎ কেঁপে বৃষ্টি এল। চুনারাম প্রথমে ভেবেছিল–এই বৃষ্টি বুঝি ছাগল তাড়ানোর বৃষ্টি। কিছু পরে তার ভুল ভেঙে যায়। বৃষ্টি থামল না, ঝরল শুধু ঝরল। গোরুর মতো ভিজে গেল চুনারাম। সব বর্ষার জল সমান হয় না। এ বরষার জল গায়ে বসে গেল চুনারামের। এই ফাঁকে একটা দেড়হাত মাপের বাণ মাছ ধরল সে বঁড়শি গেঁথে। জলে বাণ মাছ কেন, চুনো মাছেরও তাগত কম নয়। ছিপে টান ধরতেই সে ভেবেছিল রাক্ষুসী বোয়াল। পরে জলের উপর ছরছর করে উঠতেই শুধু সূচলো লেজটুকু দেখা যায়। চোখের দৃষ্টি কমেছে। ছানি পড়েছে দু-চোখে। ফলে বাণ মাছের লেজকে তার ঢোঁড়াসাপের লেজ বলে ভ্রম হয়। পরে ডাঙায় তুলতে সেই ধন্দ কেটে গেল। খুশিতে ভরে গেল চুনারামের মনটা। বাণ মাছটা তিন পোয়ার কম হবে না। আহা, পেকে হলদে হয়ে আছে মসৃণ দেহ। শুধু শিরদাঁড়ার কাঁটাগুলো করাতের মুখের মতো খ্যাচখ্যাচ করে লাগে। হাতে ঢুকে গেলে যন্ত্রণা শুরু হয়। মাছ ধরার আনন্দে মাথায় জল বসে গিয়েছিল চুনারামের। হুঁশ ফিরল যখন মাথার জল শুকিয়ে গেল মাথায়। প্রথম রাতে খুঁক খুঁকে কাশি, ভোররাতে তেড়েফুড়ে জ্বর এল গায়ে। তাকে সামলানো দায়। জড়িবুটি চলছিল কদিন। তাতে কাজ হল না। শরীর ঝিমিয়ে গেল ক্রমে ক্রমে। হারিয়ে গেল ভেতরের শক্তি। বুড়াটা যেন আরো বুড়িয়ে গেল চোখের সামনে। জ্বর উঠলে আনশান বকত সে। কখনও গান ধরত চেঁচিয়ে। কখনও কাঁদত সুর করে। দুর্গামণিকে বলত, যাও বউমা, আমার ছেলেটারে ডেকে আনো। যদি না যেতে পারো তাহলে খপর পাঠাও। আমার মন কু গাইচে। কখন চক্ষু বুজে আসবে তা মা শীতলাবুড়ি জানে।
