কমলা মন খারাপ করা চোখে তাকাল, ওর কাঁদো-কাঁদো মুখ। রঘুনাথ বিল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, হঠাৎ করে যে এত বিপদ এসে যাবে ভাবতে পারি নি। কী যে করব, মাথায় কিচু ঢুকচে না।
-তোমাকেই তো ভাবতে হবে। এখন বোবা হয়ে থাকলে বিপদ ঘটে যাবে। কমলার গলা কঠিন হয়ে উঠল ধীরে-ধীরে, আমি আর পারছি না ঘরবার সামলাতে। তাছাড়া আমার অত শক্তিও নেই। এ সময় আমার পাশে তোমার দাঁড়ানোর দরকার।
-বলো আমারে কী করতে হবে?
কমলা দুঃসাহসী হয়ে উঠল, চলো, আমরা পালিয়ে যাই।
কুথায় পেলুবো? বড়ো অসহায় শোনাল রঘুনাথের গলা।
–যেদিকে দুচোখ যায়। এত বড়ো পৃথিবীতে পালাবার জায়গার কি অভাব? শুধু ইচ্ছেটা থাকলেই হবে। জোর করল কমলা।
পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা কী ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ওকে কিছু বলতে হল না, ও পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল বিলের ধারে। আলোচনার গুরুত্ব বুঝে বোবা হয়ে গিয়েছে মেয়েটা।
ভুল করে শ্বাস ছেড়ে কমলা যেন রুইমাছের মতো ভেসে উঠল, যা বলার এখনই বলো, আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। দোকানে যাচ্ছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। তবু মা সঙ্গে বোনকে পাঠাল।
–তুমি যদি সুফল ওঝার মেয়ে না হতে তাহলে আমি আরও জোর পেতাম।
–সুফল ওঝার মেয়ে হওয়া কি পাপের?
-না, তা নয়। রঘুনাথ কমলার মন জুগিয়ে বলল, তুমি যা আমাকে করতে বলবে তাতেই আমি রাজি আচি।
-তাহলে ঘর কবে ছাড়বে?
–যেদিন তুমার মন হবে।
-বেশ। এখন আমি আসছি। কমলা এগিয়ে গিয়ে তার বোনকে ডাকল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে রঘুনাথকে একবার দেখল। রঘুনাথের দু-চোখে বিছিয়ে গিয়েছে শঙ্কা। এর পরিণতি কোথায় তা সে জানে না। সে শুধু জানে–তার কমলা আছে, কমলা থাকবে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। ঘরসুদ্ধু মানুষ এ বিয়েতে মত দিয়েছে। তার বাবা গর্ব করে বলছে, মেয়ে আমার বড়ো ঘরে পড়বে গো! এই পচা গা ছেড়ে মেয়ে আমার ঢেউনের বাসিন্দা হবে। সবই মা মনসার কৃপা। হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর দয়া।
কাশীনাথ কমলার বিয়ে নিয়ে তেমন বেশি আগ্রহী নয়। কেন না কমলা তার মান-সম্মান রেখে কথা বলে না। আজকাল তার ব্যবহার অনেকটাই পাগলের মতো। চাহনিও বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। সংসারের কাজে-কর্মে তার মন নেই। সব সময় কী যেন ভাবতে থাকে সে। কোথায় যেন হারিয়ে যায় সে। বোনের এই অন্যমনস্ক মনটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না কাশীনাথ। হাজার বুঝিয়ে যখন কাজ হল না, তখন হাল ছেড়ে দিয়েছে সে। কমলাও চায় না দাদা গায়ে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ করুক।
যার এত অনীহা, সেই কাশীনাথ খুশি হয়েছে পাত্রর সঙ্গে কথা বলে। মেয়ে দেখে পছন্দ হয়েছে ছেলের মা এবং আমার। ওরা পণ নেবে না, খালি হাতেই বৌ করে নিয়ে যাবে কমলাকে।
কলাবতী এতটা আশা করেনি। কমলাকে আড়ালে ডেকে সে বুঝিয়ে বলল, যাচা অন্ন ছাড়তে নেই মা। পরে তাহলে কপাল চাপড়াতে হয়। কমলা ঠোঁট কামড়ে বলেছিল, এ বিয়েতে আমার মত নেই, মা।
মত নেই, তার মানে? হাঁ-হয়ে গিয়েছিল কলাবতীর মুখ, এত ভালো ছেলে। এ ছেলেকে না করে দিলে শেষে তোর কপালে কানা-খোঁড়া জুটবে। তাছাড়া তোর মামা এনেছে সম্পর্কটা। মামার মান-সম্মানের কথা একবার ভাববি নে, মা।
বিয়েটা সারাজীবনের ব্যাপার। এ নিয়ে আমি কোনো আপোষ করতে চাই না। কমলার গলা থেকে ঝলকে ঝলকে নেমে এল বিরক্তি, আমাকে জোর করো না। জোর করলে এর ফল মারাত্মক হবে।
-তোর বাবাকে আমি কী বলব? মহাফ্যাসাদে পড়ে কলাবতী তাকাল।
–যা হোক একটা কিছু বানিয়ে বলে দাও।
–মিথ্যে কথা বলব?
–মিথ্যে কথা তো তুমি নিজের জন্য বলছো না, আমার জন্য বলছো। মেয়ের ভালোর জন্য মিথ্যে কথা বললে তোমার কোনো পাপ হবে না। কমলা নির্দ্বিধায় বলল কথাগুলো।
বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে সময় নেয় কলাবতী। এ কী শুনছে সে। দিনে দিনে মেয়েটার এ কী হলো? এই কমলাকে সে তো আগে চিনত না। যে মেয়েটা ভালো করে গুছিয়ে কথা বলতে পারত না, তার মুখে এমন কথা কে জুগাল? আর ভাবতে পারছিল না কলাবতী। মাথাটা বড্ড ধরেছে। মনে হয় চোরা গ্যাস- অম্বলের ফল।
মেজাজটা খিটখিটে হয়ে উঠল কলাবতীর, ওই বুনো ছেলেটার সঙ্গে তোর শেষ কবে দেখা হয়েছিল?
কমলা অকপটে বলল, ওর সাথে আমার রোজই দেখা হয়।
-কাজটা ভালো করছিস না, কমলা।
-ভালো-মন্দ আমি জানি না। আমার মন যা চায়, আমি তা করি। কমলা জেদ ধরে দাঁড়াল। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ে সে যেন অবজ্ঞাকে ছুঁড়ে দিতে চাইছিল কলাবতীর মুখের উপর।
কলাবতী আশ্চর্য হয়ে বলল, তুই যে এত বদলে যাবি আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তোর বাবার এত নামডাক। তার মেয়ে হয়ে তুই যদি এসব করিস তাহলে লোকে কি ভাববে?
-কে কি ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কলাবতীর মুখের দিকে তাকাল কমলা, তুমি এখন যাও মা। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। তবে একটা কথা, জোর করতে যেও না।
–জোর করব না? কলাবতীর কণ্ঠস্বরে বিস্ময়, আমি চাই–তোর ভালো হোক। তুই সুখি হ।
–তাহলে আর কেন কথা বাড়াচ্ছ। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
-তুই এখনও আগুন আর জলের ফারাক বুঝিস না। তোর উপর কি সব ছেড়ে দেওয়া যায়, নাকি তা সম্ভব!
-তা যদি না পারো তাহলে তোমারই কষ্ট বাড়বে। কমলা জোরের সঙ্গে বলল, একটা পাগলও নিজের ভালোটা বোঝে। আমি তো পাগল নই, পুরোপুরি সুস্থ। তাহলে আমি কেন নিজের ভালো বুঝব না?
