দুহাতে ধুলো আঁকড়ে ভূষণীবুড়ি মাটির মা হয়ে উঠল ক্রমশ।
.
১২.
টানা বৃষ্টিতে পুরো নেতিয়ে গিয়েছে কালীগঞ্জের অঞ্চল।
জগৎখালি বাঁধের উপর এখন প্যাচপ্যাচ করে কাদা। চন্দন রঙের ভেজা মাটি পেছল বড়ো। পা টিপে টিপে সাবধানে না হাঁটলে যে কোনো সময় বেসামাল হবে এই শরীর। চুনারাম এখন তাই ভয়ে বাঁধের উপরে খুব কম যায়। নেহাত ঠেকায় না পড়লে সে এড়িয়ে যায় বাঁধ ধার।
এখন বাঁধে দাঁড়িয়ে পুরো পণ্ডিত বিলটাকে দেখতে পায় গাঁয়ের মানুষ। বিল যেন ফুলেফেঁপে সাগর। সেখানে দিন রাত তালডিঙা নিয়ে মাছ ধরছে জেলেবস্তির লোকেরা। শুধু মাছ নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসেছে বিলে। বর্ষার সময় ডাহুক আর মেছো বকের চেহারা বুঝি পাল্টে যায়। গুড়গুড়ি বালিহাঁসগুলোকে যেন চেনাই যায় না। ওরা ডুব দেয়, কিছু দূরে গিয়ে আবার ওঠে। আবার ডুব দেয়, আবার ওঠে…এভাবেই চষে বেড়ায় সারা বিল। ওদের কালো কুচকুচে পাখনা থেকে তেল গড়ায়। চকচক করে পুরো শরীর। ওদের ছানাগুলো মা-বাবার পিঠের উপর চেপে আকাশ দেখে, বিলের জলের শোভা দেখে মোহিত হয়। শুধু মন খারাপ মেছেচিল আর মাছরাঙার। ভরা বিলে মাছের হদিশ পেতে তাদের কালঘাম বেরিয়ে পড়ে। এই বাড়তি জল সমস্যা বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের। জল না মরলে মনের মতো শিকার পাওয়া যাবে না। তখন পোকামাকড় ব্যাঙ গেঁড়ি-গুগলি খেয়ে বাঁচতে হবে।
বৃষ্টি হলে পিছু-নাচানো পাখিগুলোর সুখ ধরে না। ওরা নলখাগড়ার ঝোপে বসে মজা দেখে। কখনও ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় জলশোলার বনে। এখন বিল সবুজ হয়ে আছে জলশোলাগাছে। শুধু জলশোলা নয়, কত যে বুনোফুল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নাকছাবির মতো ফুটে আছে বিলের জলে-যার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না রঘুনাথ। চোখের আর কী দোষ। গত সাত-আটমাস বৃষ্টি হয়নি একফোঁটা। খটখটে মাটি ভাপ ছাড়ছিল হরদম। চারপাশে শুধু পাতা ঝলসে যাওয়ার কুঁচুটে ঘ্রাণ। এখন চারপাশ জুড়ে শুধু সবুজের সুঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে, পুরো এলাকাটাই হঠাৎ করে ধনী হয়ে উঠেছে বৃষ্টির জাদুস্পর্শে।
রঘুনাথ খেজুরগাছটার গোড়ায় এসে দাঁড়াল।
এসময় কমলার আসার কথা। লোকমুখে খবর পাঠিয়েছে সে। তার বিশেষ কী যেন দরকার। কী যে দরকার-ভাবছিল রঘুনাথ।
ক’দিন থেকে তার মনের অবস্থাও ভালো নেই, মেঘলা হয়ে আছে সব সময়। দুর্গামণির ভীতু চোখের দিকে সে এখন আর তাকাতে পারে না। ওর মনে ভয় ঢুকেছে। সে ভয় তাড়াবে কে? দুর্গামণির ধারণা হয়েছে-রঘুনাথকে সুফল ওঝা মেরে ফেলবে। এই অসম প্রেম সে কোনোদিন মেনে নেবে না।
কাশীনাথও মুখিয়ে আছে রঘুনাথকে জব্দ করার জন্য। এক কোপে পেলে সে আর দুকোপে যাবে না। বুনোপাড়ার ছেলে হয়ে তার বোনের হাত ধরেছে, ভাবা যায়? ঘোর অপরাধ। এই জঘন্য অপরাধের চরম শাস্তি হওয়া দরকার। শাস্তি যাতে সঠিক ভাবে দেওয়া যায় সেইজন্য গোপনে প্রস্তুত হচ্ছে সে।
রঘুনাথের এখন সামনে সমূহ বিপদ। তবু সে কমলার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে এসেছে। কতদিন দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। রাতে সে ছটফট করে, ঘুম আসে না। চোখের তারায় কমলার ছবি নড়ে ওঠে সর্বদা। মনের ভেতর কমলা পোষমানা টিয়াপাখির মতো কথা বলে।
আনমনে হাঁটতে গেলে হোঁচট খায় রঘুনাথ। হু-হু করে জ্বলছে বুড়ো আঙুলটা। কষ্ট হজম করে রঘুনাথ রাস্তার দিকে তাকাল। এদিকটা বেশ নির্জন। ফাঁকা ফাঁকা।
হেলেপড়া খেজুরগাছে বসে আছে মাছরাঙা পাখি। পাখিটারও চিন্তা। পাখির আবার কিসের চিন্তা-রঘুনাথ ভাবল। ওদের আকাশ আছে। খাঁচার চাইতে আকাশ কত বড়ো। ওদের গোপন ব্যাধির মতো ছোট জাত বড়ো জাত নেই। ওদের ধনী দরিদ্র নেই। ওরা সবাই মাছরাঙা।
বিলের জলে মুখ ভেঙ্গাচ্ছে সরু সরু ধানগাছ। গাছগুলো জল পেয়ে সব বেড়ে গেছে। ওসব গাছে ধান হবে না। দিনভর শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে খাড়া তীরের মতো। ওরা যে দাঁড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন-ওদের কষ্ট হয় না।
জলা ধানগাছগুলোর ভেতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে ঢোঁড়াসাপটা চলে গেল। রঘুনাথ দেখল ওদের গতিময় যাতায়াত। হাসি পেল। যেন অকাজের লোক, বেশি কাজ দেখাচ্ছে। ওদের চাইতে মেটে সাপগুলো ঢের ভালো। গায়ে পা পড়ে গেলেও ফুঁসে ওঠে না, মাটির চেয়েও শান্ত। শুধু ঝামেলা হয়, বুক ধকধকিয়ে ওঠে হঠাৎ ফণা তুলে দাঁড়ানো মাঠ খরিসসাপকে দেখলে। পালাবে না ছোবল মারবে–তা ওদের চোখ দেখে বোঝা যায় না। শুধু শরীর টানটান করে সতর্ক থাকতে হয়। না হলে বিপদ। ওরা তো সাক্ষাৎ যম। রঘুনাথের গা সিরসিরিয়ে উঠল।
দূর থেকে রঘু দেখতে পেল ছাতা হাতে নিয়ে কমলা আসছে, ওর পাশে দশ-বারো বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। সম্ভবত ওর কাকা-জেঠার মেয়ে। ওর মা পাঠিয়েছে পাহারা দেবার জন্য। যে-ই পাঠাক না কেন, রঘুনাথ আজ ভয় পাবে না। সে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। হুমড়ে পড়া হাওয়া বাঁচাল শরীরে ছুটে গেল বিলের দিকে। খলবল করে নড়ে উঠল জল। ঢেউ উঠল ছোট-ছোট। রঘুনাথ বুঝতে পারল, ওগুলো ঢেউ নয়, হাসির ঝলক।
প্রেমে পড়লে মানুষ শুকনো গাছে ফুল দেখে। তখন ভূত-ভবিষ্যৎ ভুলে যায়। মাঝ বিলের তালডিঙার মতো প্রেমের ভবিষ্যৎ, এই ভেবে নিশ্চিত হলো রঘুনাথ। কমলা সব ব্যাপারে সাহসী। সংকোচহীন।
সে এসে নুয়ে পড়া খেজুরগাছটার পাশে এসে দাঁড়াল। তার পাশে ঠাকুরের ঘটের মতো দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। কমলা অস্বস্তি কাটিয়ে বলল, তোমাকে আমার ভীষণ দরকার। আজ বেথুয়া থেকে আমাকে দেখতে লোক এসেছিল। আমাকে দেখে ওদের পছন্দ হয়েছে। আজই পাকা কথা বলতে চায়। আমি রাজি হইনি। ওরা আবার দশ দিন পরে আসবে।
