এবার ইন্দু সরে এল ভূষণীবুড়ির সমর্থনে, মা, তুমার বিটা আমার এট্টা কতাও শুনে না। মানা করলে আমারে করে মারতে আসে। লোকজন কুনো মানামানি নাই।
-ওঃ, মারবে সস্তা! তুমারে মারতে আসলে তুমিও চড়ে বসবা। ছাড়বা না। ভূষণীবুড়ি উল্টো সুরে রামায়ণ শুরু করল, তুমার শ্বশুরও অমন ত্যাড়াবেঁকা ছিল। নিশা করতে মানা করলে গজরাত। তবে আমিও কম ছিলাম না। দেশী মদের বোতলে আমি কাঁচা তেঁতুল সিজিয়ে মাড় করে রেখে দিতাম। ইবার কত খাবি খা। খাওয়া তো দূরে থাক রাগে শুধু খাবি খেত মানুষটা। অতীত একবার পিছু ধরলে ঘর ফেরে না। ভূষণীবুড়ি ছেলের মাথায় হাত রাখল, মেয়েটার লিয়ে ভাববি না। আমি তো আচি, আমি তো মরে যাইনি। বেশি বেগারবাই দেখলি পরে সে ঢ্যামনারে আমি টাইট দিয়ে ছেড়ে দিব। হারামীর ছানাটা ভেবেচেটা কি। ইবার কিছু হলে কতো ধানে কত চাল হয় তা আমি গুনে গুনে জামাইবাবাধনকে দেখিয়ে দেব। তুই মন শান্তি করে যা।
গরম দুধ জুড়ানোর মতো মনটা কি সহজে জুড়োতে চায়!
বিন্দুমণিকে নিয়ে দুলালের চিন্তার শেষ নেই। বিয়ের পরে রোজ তাকে চোখের জল ফেলতে হয়। রোজ শ্রীকান্ত তাকে লেবু চিপকানোর মতো চিপকায়। এমনিতে সংসারের যাতাকলে ভুষি হয়ে গিয়েছে তার জীবন, তার উপর ঘরের মানুষটার অত্যাচার তার মাথাটাকে বিগড়ে দিয়েছে।
দুবেলা খেতে পেলে কি সুখে থাকে মেয়েরা?
ইন্দু তবু মেয়েকে বোঝাতে কসুর ছাড়েনি। দুলালও তার পাশে ছিল সেই সময়। চোখের জল মুছে বিন্দু তাদের বলেছিল, তুমরা যাচ্ছ যাও। ও বেশি কিছু বাড়াবাড়ি করলে আমি পুটলি বেঁধে ঘর ফিরি যাবো। আর আসবো নি। কেনে আসব? আমার পিঠের চামড়া কি মোষের? শুধু পড়ে পড়ে মার খাবো। তুমরা কুনোদিন আমাকে মারোনি। ও কুথাকার কে হরি গো?
বিন্দুর মনের সব ক্ষোভ জ্বালা অশান্তি জড়ো করলে পণ্ডিত বিলের চাইতে আড়েবাড়ে বড়ো হবে। অশান্তির পাক আর ঘাঁটতে চায় নি দুলাল। বসন্তপুর ধ্যাওড়ার মুরুব্বির হাত ধরে বলেছে, খুড়াগো, মেয়েটা রইল, ওরে দেকো। ও তুমাদের লাতনির বয়সী গো। ভুলচুক করলে ওরে নিজের ভেবে মানিয়ে নিও। তারপর বেয়াই মশাইয়ের হাত ধরে সে কী বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। বেয়াই মশাই পেছনের মালাইচাকি চুলকে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ভয়ের কিছু লাই, চিন্তার কিছু লাই। সব ঠিক হয়ে যাবেন। তুমার ঘরের বিটি তো আমার ঘরের বিটি। ওসব নিয়ে ভেবো না। মন হালকা করে যাও। কাজ থিকে ফিরলে আবার এসে দেকা করে যেও।
জামাইয়ের দাবি ছিল সাইকেলের। এ বাজারে একটা সাইকেলের দাম মেরে কেটে মেলা টাকা। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? ভাবতে ভাবতে দুলাল যেন বুড়িয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ ইন্দুবালাই চিন্তামুক্তির আলোটা দেশলাই কাঠির মতো ফস করে জ্বেলে দিল, যে চার কাঠা জমিন আচে ওটা বেচে দাও। মানুষ থাকলে অমন জমিন ঢের হবে।
–দায়ে-অদায়ে শুধু ওইটুকুই তো ছিল! দুলালের চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল।
ইন্দু তাকে বুঝিয়ে বলল, দায়ে-অদায়ে তো প্রয়োজনের জিনিস লাগে গো। মেয়েটা ভালো থাকলে, ওর মুখে হাসি ফুটলে আমাদের আর বুড়া-বুড়ির কি চাই।
-ঠিক আছে, তুমার মতই আমার মত। দুলাল ঘাড় গুঁজে চলে গিয়েছিল গোঁসাই পাড়ায়। মাঝের গাঁয়ের নীলু বামুন বন্দকী কারবার করে। জমিটার উইল বাঁধা দিয়ে যদি কিছু টাকা দেয়? সুদ যা লাগবে শোধ করে দেবে সে।
বেঁচে থাকলে কারোর টাকা সে মারবে না।
নীলাক্ষ কথা রেখেছিলেন। সব শুনে বললেন, ঠিক আছে ঢাকা আমি দেব কিন্তু মুনিষ খেটে ফিরে আসার পর আমার টাকা ফেরত দিতে হবে। তখন আমি একদিনের জন্যও টাকা ফেলে রাখতে পারব না।
-সে ভাবতে হবে নি বাবু। গরিবের কতা চট করে নড়চড় হয় না। দুলাল অনুগত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে হাত কচলায়।
লেখাপড়া শেষ হলে টিপছাপ দিল দুলাল। টাকাগুলো গুণে নিয়ে সে আর দাঁড়াল না। সোজা বাঁধ ধরে চলে এসেছিল ঘরে।
বেয়াইঘর থেকে ফেরার সময় তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি এল। বেলগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়েও শরীর বাঁচাতে পারল না ওরা। ফাঁকা জায়গায় মাথা বাঁচানো দায়। ভিজে-নেয়ে ওরা ফিরে এল ধাওড়াপাড়ায়। তারপর থেকে শুরু হয় ফেরার মহড়া। বুকের পাথর নেমে যেতে বড়ো খুশি খুশি দেখাচ্ছিল দুলালকে, ইবার শান্তি মনে যেতে পারব। বেয়াই-মশাই আমার গা ছুঁয়ে কথা দিয়েচে-মেয়েটার কুনো ক্ষতি হবে না। আঃ, আজ বড়ো ভাল লাগছে গো!
বিদায়পর্ব শেষ হতেই বাঁধে উঠে এল ওরা।
দুলাল মুখ মুছে নিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে পিছন ফিরে তাকাল। অন্তত জনা পনের ছেলে-মেয়ে মাঝবয়েসী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তাদের দেখার জন্য। সাধারণত এপাড়ার খুব কম মানুষ বাইরে যায়। বাইরে যাওয়া বললে ওদের কাছে বড়োজোর দেবগ্রাম–বেথুয়াডহরী নয়ত কালীগঞ্জের হাটে যাওয়া। এই যাওয়াতেও বিচ্ছেদের ব্যথা আছে।
পথের এক পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টান করে বাঁধের দিকে হাপুস নয়নে চেয়েছিল ভূষণীবুড়ি। ধীরে-ধীরে ছোট হয়ে আসছিল ওদের দৃশ্যমান শরীর। বাঁক পেরতেই ওদের আর দেখতে পেল না সে। সাদা শাড়ির ময়লা আঁচল দাঁত দিয়ে চিপে শরীর বাঁকিয়ে কেঁদে উঠল সে। এমন সশব্দ ভগ্ন কান্নার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। সচকিত মানুষ এবার দৃষ্টি ঘোরাল ভূষণীবুড়ির উপর। সহানুভূতি, সমবেদনায় কলকলিয়ে উঠল জড়ো হওয়া গ্রামীণ মানুষ। বাতাস শুধু শুনতে পেল কাতর ভূষণীবুড়ির কণ্ঠস্বর, ইবার আমার কী হবে গো, ইবার আমি কারে লিয়ে থাকবো গো-ও-ও। আমার কলিজার ধন, পরানের টুকরা মুনিষ খাটতে চলে গেল গো-ও-ও-ও।
