সুফল ওঝার হাতের হ্যারিকেনটা দুলছিল। তার অন্য হাতে চটের থলি। মাটি সমেত শেকড়বাকড় বেরিয়ে আছে বাইরে। এগুলো ধুয়েমুছে সাফসুতরো করে তার ব্যবসা চলবে। ঝাড়-ফুক করে অবস্থা ফিরে গিয়েছে সুফল ওঝার। ঘরের খড়ের চাল সরিয়ে টিন দিয়েছে মাথার উপর। সেই টিনের চালে টিনের ময়ুর দোলে হাওয়ায়। দূর থেকে তা দেখতে পায় গ্রামের সবাই। অনেকের চোখ ঈর্ষায় করকরিয়ে ওঠে। সুফল ওঝার সেসব দিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের কাজে পাগল। নিজের ব্যবসা নিয়ে মাতাল।
দু-জন মানুষ গাবগাছ ছাড়িয়ে চলে যেতেই স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বাঁচল রঘুনাথ। তার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
রাতের আঁধারে শেকড় তোলার ঝুঁকি অনেক। ঝুঁকি ছাড়া আজকাল কোনো কাজ হয় না। কমলা হাসতে হাসতে বলে, ডরেছে কি মরেছো। আমার বাবাকে দেখো এই বয়সেও এ-গাঁ সে-গাঁ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওই মানুষটার কোনো ভয়ডর নেই।
আজ অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছে রঘুনাথ। ভাগ্যিস সুফল ওঝা রাতকালে ঘরে ছিল না। ঘরে থাকলে বিপদ বাধত। বয়স বাড়লে মানুষের ঘুম পাতলা হয়।
রাস্তায় উঠে এসে রঘুনাথের ইচ্ছে করল দৌড়ে বাঁধের ধারে চলে যেতে। কিন্তু বাধ সাধল বৃষ্টি। গুড়গুড় শব্দে রাগ উগরাল মেঘ। হাওয়া এসে মারতে লাগল শপাং শপাং চাবুক। গাছ কেঁপে গেল, উড়ে গেল ধুলো। চোখে হাত চাপা দিয়ে রঘুনাথ ধুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। বৃথা সেই চেষ্টা। দুড়দাড় শব্দে বৃষ্টি নামল। ভোরের বাতাস ভিজিয়ে দিল জলের ধারা। শুধু গাছপালা নয়, রঘুনাথও ভিজে গেল জলের ছাঁটে। ভিজে সপসপে হয়ে ঘরে ফিরল সে।
দুর্গামণি এখনও জেগে আছে রঘুনাথের প্রতীক্ষায়। ছেলেকে বিছানায় না দেখে তার মনে চিন্তা মাগুরমাছের কাঁটা মেরেছে। আর ঘুমাতে পারেনি সে। ছেলেটা রাতকালে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কোথায় যায়, কেন যায়? এ-ও কি সেই নেশা? এই সবে ষোল ছাড়িয়ে সতেরোয় পা রেখেছে রঘুনাথ, এর মধ্যেই এত কিছু। দুর্গামণির সব হিসাব ওলোট পালোট হয়ে গেল। নিজের যৌবনকালের কথা মনে পড়ল। তখনও প্রেম-পীরিত সব ছিল। ছিল এক বন্য উগ্রতা। শ্যামের বাঁশি শুনে রাধা কি যায়নি যমুনায়! শুধু রাধা নয়, শ্যামও গিয়েছে ছুটে। তখনও চাঁদ ভাসত আকাশে, সূর্য হাসত পুবের কোণে। তবু দুর্গামণি কোনোমতে মেনে নিতে পারে না। অসহায়ভাবে সে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাল, বেছানা ছেড়ে কুথায় গেছিলিস এত রাতে?
-বাঁশতলায়। নামুচাপ পেয়েছিলো। রঘুনাথ হাত কচলায়।
–মিচে কতা কোস নে। ধমক দিতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠল দুর্গামণির, তুর বাপ ঘরে নেই। এখুন এসব কাজ কি তুর পক্ষে ভালো দেকায়। ধরা পড়লে সারা গায়ে ঢিঢি পড়বে। তখুন এই পোড়ামুখ নিয়ে বেরতে পারবি?
রঘুনাথ ঘাবড়াল না, দুর্গামণির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল, কমলার সাথে দেকা না হলে আমার নিদ হত না। ওর সাথে দেকা করে এয়েচি, এতে পাপ কুথায়?
–পাপ থাকে মানুষের মনে। কার মুখ তুই চাপা দিবি, বাপ। দুর্গামণির থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ বলল, যা সত্যি তাকে আমি চাপা দিব কেন যা সত্যি তার থেকে তো ট্যাঁক গজায়। সেই ট্যাঁক থেকে গাছ হয়। গাছ সেই থেকে ফুল হয়, ফল হয়। এসব যদি পাপ না হয়, তাহলে আমারটাও পাপ নয়।
-চুপ কর। ও কথা বলিস নে। দুর্গামণি বর্ষার বাদল মেঘের মতো ভেঙে পড়ল।
.
ঝমঝমানো বৃষ্টি থামতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল দুলাল। কাজ ছেড়ে বসে থাকা কাজের মানুষের পক্ষে সব চাইতে বুঝি কঠিন কাজ। চারপাশে জল ঝরে পড়ছিল টুপটাপ। অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছিল চতুর্দিক জুড়ে। ইন্দু চোখ ঘুরিয়ে বলল, হাঁ দেখো গো, মাত্রর ক’দিনের বরষাতে সব কেমুন পান্টি গেচে। গাছপালাকে চেনা যায় না, প্রথম বে-হওয়া ম্যায়ার মতো লাগছে।
দুলাল ভরসায় চোখে তাকাল, তা যা বলেচো। তারপরই তার কণ্ঠস্বর আর্দ্র হয়ে গেল, এতবার এলাম-গেলাম তবু মনটা ও-দেশে বাঁধা পড়ল না। আমার এই দেশটা কতো সোন্দর গো। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। ভালো করে দেখলে আর চোখ ঘুরানো যায় না।
বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু হাওয়ায় ভাসছে জলীয়ভাব। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ জলকণা আত্মগোপন করে আছে বাতাসে। কদিনে অশ্বত্থগাছের পাতা আরও লাবণ্যময়ী হয়ে উঠেছে জলের সোহাগে। আখ খেতের দিকে তাকালে আর চোখ ঘোরানো যায় না, প্রতিদিনের দেখা আখগাছগুলো যেন স্ফুর্তিতে টগবগিয়ে উঠছে গাঙ পালানো হাওয়ায়। আলোর ঘাসও স্পর্ধা নিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
দুলালদের যাওয়ার সময় ভূষণীবুড়ির গলা বুজে আসে কান্নায়। যত না কান্না আসে তার চেয়ে বেশি আসে কাঁপুনি। ছেলে বউ বাইরে থাকার অর্থ ভ্যারেণ্ডা গাছের মতো একা হয়ে যাওয়া। লোক বলে-একা না বোকা, ঠিক কথা। একা মানুষের মনটা সব সময় যেন ডানা ভাঙা পাখি, উড়তে পারে না। শুধু চিন্তা ভাবনার মেঘগুলো হানা দিয়ে কালো করে দেয় মুখখানা। দুলাল চলে যাওয়া মানে কলিজা উপড়ে বুড়িগাঙে ভাসিয়ে দেওয়া। অনেকদিন পরে ভূষণী বুড়ির সুবর্ণার মুখটা মনে পড়ল। সময় নদীর স্রোতের চেয়েও দ্রুতগতিতে বয়ে গেছে। সময়কে আটকে রাখবে এমন বলবান কোথায়? সুবর্ণা ধাওড়া পাড়া ছাড়ার আগে বলেছিল–সে আবার আসবে। কত বছর চলে গেল, ফি-বছর অশ্বত্থ গাছে নতুন পাতা গজায়, নতুন আলো এসে সেই তেল চকচকে পাতায় চুম্বন এঁকে দেয়, সব কিছুই হয় চারপাশ জুড়ে…শুধু কথা দিয়ে যাওয়া সুবর্ণা আর ফেরে না। সেদিন সুবর্ণাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল, ভূষণীবুড়ির মনে হচ্ছিল সুবর্ণাই নীলকণ্ঠর আসলি জোড়া। এ যেন যেমন হাঁড়ি তেমন সরা, একেবারে মাপে মাপে। বাবুঘরের বিটিদের খেয়াল-খুশি বোঝা দায়। সুবর্ণা যদি হিসাব মতো দুলালের পাশে দাঁড়াত তাহলে ছেলেটাকে আজ মাথায় বোঝা নিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে ভিন দেশে খাটতে যেতে হত না। ওদের অনেক ছিল। দুলাল কি তার থেকে কিছু পেতে পারত না? আসলে স্নো-পাউডার ঘষা সুর্বণা যা বলেছিল তা শুধু কথার কথা। একটা দীর্ঘশ্বাস ভূষণী বুড়িকে হারিয়ে দিয়ে মিশে গেল বাইরে। ভূষণীবুড়ি গলার কাঁপুনি থামিয়ে কোনোমতে বলল, শরীলের উপর লজর দিবি। শুধু কাজ কাজ করে শরীলটাকে ধসিয়ে দিবি তা যেন না হয়।
