ইদানীং কলাবতীর পাশে ইচ্ছে করে ঘুমায় না কমলা। অজুহাত দেখিয়ে বলে, অনেক রাতঅবধি আমি রেডিও শুনি। রেডিওর নাটকগুলো কী যে ভালো একবার শুনতে শুরু করলে শেষ না শুনে ছাড়া যায় না। আমি রেডিও শুনলে তোমার ঘুম চটকে যাবে মা। তোমাকে তো ভোরে উঠতে হয়। তোমার কষ্ট হবে।
রঘুনাথ আসবে তাই মিথ্যে কথার জাল বোনে কমলা। ওর জন্য রাত জাগতে কোনো কষ্ট হয় না তার। জানলা খুলে নেশাগ্রস্তের মতো ঠায় বসে থাকে সে। দৃষ্টি নিবদ্ধ ধুলো পথের দিকে। তাঁতশালের মাকুর মতো রঘুনাথেরও আসা-যাওয়ার বিরাম নেই। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে সে বুঝতে পারে না। সে জানে-চোরের দশ দিন তো মালিকের একদিন। সেদিনটাতে যে কী হবে। শিউরে ওঠে রঘুনাথ। কমলা তাকে সাহস জুগায়, ভয় পেও না। আমি তো আছি। পৃথিবীর সবাই একদিকে গেলেও আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। তাতে আমার যা হবার হোক। যে নিজের কাছে সাচ্চা, সে কেন অন্যকে ভয় পাবে।
কমলার ভালোবাসা ফুল ছুঁয়ে দেওয়ার মতো সুন্দর।
রঘুনাথ ওর ভালোবাসাকে ছুঁতে পারে, বুঝতে পারে। কমলা দল বেঁধে নাইতে আসে বুড়িগাঙে খরাবেলায়। কখনও সে চলে আসে পাকুড়তলার কলটাতে জল নিতে। এগুলো সব অজুহাত। যদি একবার রঘুনাথের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায় এই আশায়। আশা যে সবদিন পূরণ হয় তা নয়।
রঘুনাথের ঘাস ফড়িংয়ের স্বভাব। সে এক জায়গায় স্থিতু হতে জানে না। ইদানীং ওর বামুনপাড়ায় যাতায়াত বেড়েছে। সূর্যাক্ষ বন্ধুত্ব করেছে ওর সঙ্গে। দেবোত্তর ঠাকুরের বাড়িতে ওর এখন ঘনঘন যাতায়াত। কমলার মনটা অস্থির হয়ে ওঠে দ্বীপীর কথা ভেবে। দ্বীপীর মতো মেয়ে হয় না।
কমলার চোখের চাহুনি, চেহারা, কথা বলার ধরন দেখে দুর্গামণির মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে অনেকদিন আগে। রঘুনাথও নিজেকে বদলে নিয়েছে, সে এখন মায়ের কাছে ধোঁয়াশা দূরের জমি।
একদিন বাঁধের গোড়ায় দুর্গামণি ওদের দেখে ফেলে, এমন অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গ্রামসমাজে অচল এবং দৃষ্টিকটু। কমলা হেসে গড়িয়ে পড়ছিল রঘুনাথের উপর। নির্বিকার রঘুনাথ প্রতিক্রিয়াহীন। ঘনিষ্ঠতা না থাকলে এমনটা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসম ঘনিষ্ঠতা দুটি সবুজ মনে আগুন ধরায়। সেই আগুন এক সময় তৈরি করে দাবানল। পুড়িয়ে খাক করে দেয় সংসার। ভয়ে দুর্গামণির চোখের তারা কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসে। রঘুনাথকে একলা পেয়ে কাছে ডেকে বলে, সুফল ওঝার মেয়েটার কি নাম রে? বেশ বড়ো হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। রঘুনাথ মায়ের ভেতরের কথা আঁচ করতে পেরে চুপ করে থাকে। দুর্গামণি গলা চড়িয়ে বলে, ইখনকার ছেলেমেয়েদের কুনো লাজ-লজার বালাই নেই। ওরা যে নিজেদের কী ভাবে তা কে জানে। তা বাপ, তুরে এট্টা কথা বলি মন দিয়ে শুন। ঘরে তুর বাপ নেই। তুর কাকা থেকেও নেই। আপদ-বেপদ কিছু হলে আমি তুরে বাঁচাতে পারব নাই।
-কী বলতে চাইছো তুমি স্পষ্টাস্পষ্টি বলো তো? রঘুনাথের কথায় পোড়া লঙ্কার ঝাঁঝ।
-বলছিলাম কি ওই সুফল ওঝার মেয়েটার সঙ্গে বেশি ঢলাবি না। ওরা বড়ো ঘরের বিটি। ওদের গায়ে চট করে কাদা লাগে না। যত দোষ এই গরিব গুরবোদের-মনে রাখিস। দুর্গামণি আড়ষ্টতা কাটিয়ে বলল, ওর লজর দেখে আমার ভালো ঠেকেনি। মন বলছে তুর উপরে মেয়েটার টান জমেছে।
-সে আমি কি করে বলব? আমি হাত গুনতে জানি না। রঘুনাথ মুখ বেঁকিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইল।
দুর্গামণি তাকে ছাড়ল না, সত্যি করে বলতো–কবে থিকে ওর সাথে তুর আলাপ?
-কী যা তা বলছো! রঘুনাথ মায়ের দিকে বেজার চোখে তাকাল।
–যা তা নয় বাপ। ঠিক বলচি। দুর্গামণি জোরের সঙ্গে বলল, আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ লয়। আমি মা। আমাকে তুই ফাঁকি দিবি?
রঘুনাথ মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
দুর্গামণি ভাঙা গলায় বলল, বাপরে, এ কাজ তুর ঠিক কাজ হচ্চে না! পথ ছেড়ে দে। মেয়েটারে তুই যেতে দে। ওরে এটকে রাখলে তুর কষ্ট বাড়বে। সে-ও জ্বলবে।
রঘুনাথ বোবাদৃষ্টি মেলে তাকাল, মাকে তার বোঝানোর কোনো ক্ষমতা নেই। মার কাছে তাদের সম্পর্কটা যেন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
অন্ধকারে রঘুনাথ হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে। কমলার সঙ্গে দেখা হলে তার মনটা ফুরফুরে কাশফুলের মতো দোলা দিয়ে ওঠে। বুকের ভার কমে গিয়ে হালকাবোধ হয়। ঘরে ফিরে গিয়ে এখন তার ঘুম আসবে।
রাস্তার ধারে ঝাঁকড়া মাথার গাবগাছ অন্ধকারের চাদর জড়িয়ে মূর্তিমানের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাবতলায় এসে দম নিল রঘুনাথ। এভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে কমলার সঙ্গে দেখা করার কোনো অর্থ হয় না। সুফল ওঝা টের পেলে তার সর্বনাশ করে ছাড়বে। সুফল ওঝার রাগী মুখটা মনে পড়তেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল সে। ওই মুখটাকে সে আর দেখতে চায় না।
দূরে রাস্তার মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে দু-জন লোক। ওদের একজনের হাতে হ্যারিকেন আর অন্যজনের হাতে লাঠি, কোদাল। ওরা শেকড়বাকড়ের খোঁজে পাশের ঝোপে গিয়েছিল। কিছু শেকড় অমাবস্যায় তোলার নিয়ম। নাহলে সঠিক প্রয়োগ ঘটে না। রঘুনাথ কিসের আশঙ্কায় গাছের আড়ালে চলে গেল। দূর থেকে সুফল ওঝার গলাটা সে ঠিক চিনতে পেরেছে। অসময়ে তাকে দেখলে হাজার প্রশ্ন ভেসে আসবে। চোর বলে সন্দেহ করতে পারে। ইচ্ছে করলে রটিয়ে দিতে পারে বদনাম। রঘুনাথ কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না। গাবগাছের আড়ালে গিয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
