একথা শুনে কমলার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। ছাড়া চুল খোঁপা করে নিয়ে সে সবিস্ময়ে নিজের দিকে তাকাল, আমার অনেক ভাগ্য যে তোমার মতো ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সবাই যেরকম হয়–তুমি সেরকম নও। তুমি আলাদা।
রঘুনাথ প্রতিক্রিয়াহীন। সে শুধু মুচকি হেসে বলল, আমার মা বলে সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নাহলে সম্পর্ক পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছাড়ে। তুমার আমার মেলামেশাটা পচা সুতোর বাঁধন নয় যে হুট করে তা ছিঁড়ে যাবে।
তোমার কি আমার কাছে কিছু চাওয়ার নেই? কমলার সকৌতুক প্রশ্ন। কাঁধ ঝাঁকিয়ে রঘুনাথ বলল, চাওয়ার কি আছে? না চাইতে তুমি আমাকে সব দিয়েছো। আমার এখন শুধু একটাই চাওয়া। সারাজীবন আমি যেন তুমার মুখের হাসিটুকু দেখতে পাই।
কমলা ফোটা পদ্মের মতো অপেক্ষায় ছিল ভ্রমরের গুঞ্জন শোনার জন্য। রঘুনাথ সমর্পণের গলায় বলল, ডুবে যাওয়া সহজ কিন্তু ভেসে থাকা কঠিন। আমি সদা সর্বদা তুমার মনে ভেসে থাকতে চাই।
রঘুনাথ জানে কমলার সঙ্গে তার এই সম্পর্ক এ সমাজ কোনোদিনও মেনে নেবে না। এই সম্পর্ক পরিণতির দিকে এগোলে ঝড় উঠবে। এলোমেলো হয়ে যাবে তাদের সংসার। মাটি হারা হয়ে বাঁচতে হবে তাদের। পালিয়ে বাঁচার মধ্যে সুখ কোথায়? তাছাড়া কমলার যদি মোহভঙ্গ হয় তখন? কাঁচা বয়সের ভালোবাসার রঙ পাকা হলেও সেই রঙের স্থায়ীত্ব কলার কষের মতো গাঢ় বা দীর্ঘস্থায়ী নয়। রঘুনাথের বুকের ভেতর তাই ভয়ের উইটিপিটা একটু একটু করে বাড়ছে।
বারোয়ারিতলার রামযাত্রার আসরে কমলাকে পাপড় কিনে দিয়েছিল রঘুনাথ। কাশীনাথ এটাকে ভালো নজরে দেখেনি। রঘুনাথকে বাঁধের ধারে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধমকেছে, বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়াতে যাস নে। হাত ভেঙে দেব।
-কী যা তা বলচো! রঘুনাথের গলায় ফ্যাসফেসে শব্দ উঠল।
–যা তা নয়, ঠিক বলছি। বাবার কানে কথাটা তুলে দিলে তুই কি ধাওড়াপাড়ায় টিকতে পারবি? কাশীনাথের তিক্তস্বরে বিষ ঝরে পড়ল। এখনও সময় আছে, সাবধান হয়ে যা। বেশি বাড়লে ব্যাঙের ছাতার মতো ফুটুরডুম হয়ে যাবি।
সেদিন কাশীনাথের চোখে জ্বলন্ত আঁচ দেখেছিল রঘুনাথ। সামান্য হলেও ভয় পেয়েছিল সে। সে জানে কাশীনাথের একটা দল আছে গ্রামের মধ্যে। সে দলের সব সদস্যই তার বয়সী। ওদের মাথা গরম, টেম্পার বেশি। ছোট-বড় জ্ঞান ওদের খুব কম। রঘুনাথ ইচ্ছে করেই আর কথা বাড়ায়নি। সে জানত এখানে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হবে না। সমাজের স্তরগুলো একদিনে ভাঙবে না। ওগুলো ভাঙার জন্য কপোতাক্ষর মতো বেশ কিছু মানুষের দরকার। সূর্যাক্ষর মতো উদার মন না হলে বুড়িগাঙের জলও একদিন সমাজ-সংস্কারের ধুয়োয় কালো হয়ে যাবে।
রামযাত্রার শেষে কমলা রঘুনাথকে খুঁজছিল। কাশীনাথ তার চঞ্চল চোখের তারাকে এক জায়গায় থামিয়ে দিল কথার বাণে, তুই যাকে খুঁজছিস তাকে আমি লাথি মেরে ভাগিয়ে দিয়েছি। ছিঃ কমলা, তোর এতটা নীচে নামা উচিত হয়নি। মনে রাখিস–তুই সুফল ওঝার মেয়ে। তোর বাবার সুনাম দশ গাঁয়ে। তুই যদি ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসিস তাহলে আমাদের আর মুখ দেখাবার জায়গা থাকবে না।
–তুই অকারণে অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে ভাবছিস দাদা। কমলার টলটলে চোখে পাপের কোনো স্পর্শ ছিল না, রঘু আমাদের গাঁয়ের ছেলে। ও আমাকে একটা পাঁপড় কিনে দিয়েছে-এতে দোষ কোথায়? ওর সরলতাকে কু-নজরে দেখা উচিত নয়।
-তুই বড়ো হয়েছিস–একথাটা মাথায় রাখিস। কাশীনাথ ভেঙে পড়ল না, রুখে দাঁড়াল, লোক যাতে আঙুল তুলে কিছু না বলতে পারে সেইজন্য তোকে আগে-ভাগে নিষেধ করলাম। মানুষ যখন ভুল করে, সেই ভুলটা সে নিজে ধরতে পারে না। অন্যকে ধরিয়ে দিতে হয়।
-রঘুনাথের উপর তোর কি আগে থেকে কোনো রাগ ছিল?
কাশীনাথ শরীর ঝাঁকিয়ে কুলকুল করে হেসে উঠল, রাগ? ওর উপর রাগ করার আমার সময় কোথায়? ওর সাথে তুই আমাকে গুলিয়ে ফেলেছিস কেন? ও কোথায়, আর আমি কোথায়!
ঠোঁট কামড়ে অবজ্ঞার হাসি হেসে উঠল কমলা, কে যে কোথায় তা যদি সে নিজে বুঝতে পারত তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।
-একটা বুনোপাড়ার ছেলের জন্য ওকালতি করে তুই আমাকে ছোট করছিস?
ছোট তুই অনেক আগেই হয়ে গেছিস। রঘুনাথকে শাসিয়েছিস-সেটা খুব বড়ো মাপের বাহাদুরির কাজ নয়। কমলার স্ফুরিত ঠোঁট ঘৃণায় বেঁকেচুরে গেল। কাশীনাথ সেই রক্তবর্ণ চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। কমলা এত শক্তি পেল কোথা থেকে? সে শুনেছে প্রেমে পড়লে মানুষ বড়ো একরোখা হয়ে যায়। তখন বর্ষার নদীকে তার মনে হয় মামুলি ডোবা। জলোচ্ছ্বাসকে মনে হয় জলের ছিটে। তাহলে কি কমলা ইতিমধ্যে মন দিয়ে ফেলেছে বুনোপাড়ার রঘুনাথকে। ব্যাপারটা বেশ জটিল এবং উদ্বেগপূর্ণ। এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। কমলার ঘোরাফেরা, হাবভাব মেলামেশার উপর নজর রাখা দরকার। সুফল ওঝা ঘরে থাকে না। প্রায়ই এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে দৌড়াতে হয় তাকে। তার অবর্তমানে ছেলে হিসাবে কাশীনাথের দায়িত্ব কম নেই। দায়িত্ব এড়িয়ে থাকা যে ভীষণ কঠিন।
০৩. ভীষণ কষ্ট
১১.
কমলাকে ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট হয় রঘুনাথের।
আসার সময় কমলাও কেমন ম্লান বিধুর দৃষ্টিতে তাকায়। অনেক কিছু তার বলার থাকে, সে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারে না। সময় তখন ঘোড়ার মতো লাফায়। গুছিয়ে রাখা কথাগুলো সব ছেঁড়া মালার ফুলের মত এলোমেলো হয়ে পড়ে। অন্য কোনো প্রসঙ্গ এসে গিলে নেয় নির্দিষ্ট সময়।
