নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় রঘুনাথ শুধোল, কাশীদা কুথায়?
-সে তার ঘরে শুয়েচে। ঠোঁট উল্টাল কমলা। তারপর রঘুনাথকে ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে সে খিল লাগিয়ে দিল সতর্কভাবে।
তক্তাপোষের উপর এলোমেলো হয়ে আছে বিছানা। সেই বিছানা যেন রঘুনাথকে আকর্ষণ করছিল। কমলা গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে রঘুনাথের দিকে তাকাতেই ওরা দুজনে দু-জনের উপর ভেঙে পড়ল।
একটা বালিশে দুটো মাথা একে অন্যের দিকে মুখ করে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। কমলার বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে রঘুনাথ ফিসফিসিয়ে বলল, মামার ঘরে এতদিন থাকতে পারলে? আমার জন্যি তুমার বুঝি মন কেমুন করে না?
-কে বলল? কমলা রঘুর খোলা বুকে ঠুসে ধরল ঠোঁট, তোমার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। আমার যে কি হল আমি তা নিজেই জানি না। এভাবে চললে তোমার কাকির মতো পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হবে। এত কষ্ট বুকে নিয়ে কি বাঁচা যায় গো…
-তুমার এত কিসের কষ্ট?
-ও তুমি বুঝবে না। ছেলেদের প্রাণ সুপুরির চেয়েও শক্ত হয়। কমলার হাত রঘুনাথের বুকের উপর কিলবিল করে নড়ছে। একটা টান উত্তেজনা রঘুনাথের পায়ের বুড়ো আঙুলের কাছে এসে থেমে যাচ্ছে। ঘনঘন শ্বাস পড়ছে রঘুনাথের। ভয়ে কাঠ- ব্যাঙের মতো ক্রমাগত লাফাচ্ছে তার বুকটা।
বুকে মুখ গুঁজে কমলা কাতর চোখে তাকাল, এ ভাবে আর পারা যাচ্ছে না, চলো কোথাও পালিয়ে যাই।
রঘুনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, কুথায় যাবো বলদিনি?
-যেদিকে দু-চোখ যায়। কমলা সাহসী হয়ে উঠল।
-তুমার বাপ আমাকে বাণ চালিয়ে মেরে ফেলবে। তার মন্ত্রের বহু জোর। গাঁয়ের অনেক মানুষ তুমার বাপকে ভয় পায়। গলা কেঁপে গেল রঘুনাথের।
-তোমার ভেতর থেকে ভয় আর কোনোদিন গেল না। কমলা আশ্চর্য চোখে তাকাল, সেই প্রথম দিনের কথা তোমার মনে আছে। সেদিনও কাঁটা বের করতে গিয়ে তুমি ভয়ে কাঁপছিলে। তোমার এত ভয় কেন বলো তো?
রঘুনাথ কি জবাব দেবে খুঁজে পেল না। সে কমলার জ্যোৎস্নানরম মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল সে আকাশের চাঁদকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। জ্যোৎস্নার প্লাবনে ভেসে উঠছে তার শরীর।
সাঁঝবেলায় হাট থেকে ফেরার সময় কাঁটা ঢুকে গিয়েছিল কমলার পায়ে। হাঁটতে হাঁটতে ঝপ করে সে বসে পড়েছিল ধুলোয়। তার অস্ফুট আওয়াজে রঘুনাথ এগিয়ে গিয়েছিল সামনে, কী হয়েছে গো?
সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কমলা বলেছিল, পায়ে কাঁটা ঢুকে গিয়েছে। কাঁটাটা ভেঙে গিয়েছে। আর বেরুচ্ছে না। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।
-আমি কাঁটা বের করতে পারি। কথাগুলো বলে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল রঘুনাথ, যদি বলো তো চেষ্টা করে দেখতে পারি।
সংশয়াচ্ছন্ন চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল কমলা, দেরি করো না। খুব ব্যথা হচ্ছে। যা করার তাড়াতাড়ি করো। আমাকে আবার অতটা পথ যেতে হবে।
রঘুনাথ অনুমতি পেয়ে বাজারের থলিটা নামিয়ে রেখেছিল রাস্তার একপাশে।
তারপর হন্তদন্ত হয়ে ভেঙে এনেছিল খেজুরগাছের কাঁটা। মুখের থুতু দিয়ে সে কমলার পায়ের তালু পরিষ্কার করে কাঁটা দিয়ে বের করে দিল কাঁটা। বেশ বড় ধরনের বাবলাকাঁটা। ভাঙা কাঁটাটা কমলার হাতে তুলে দিয়ে বলল, নড়ো না। আর এট্টু বসো। আমি হাড়মটমটির রস হাতে পিষে লাগিয়ে দিচ্ছি। অক্ত আর বেরবে না, বিদনাও কমে যাবে।
কমলা অবাক হয়ে সেদিন রঘুনাথকে দেখেছিল। খুব বেশি বয়সের ফারাক হবে না ওদের। বলা যেতে পারে প্রায়ই সমবয়েসী। এই বয়সের ছেলেরা মেয়েদের ছুঁতে ভয় পায়। কমলা সেদিনই টের পেয়েছিল রঘুনাথের শরীরের কাঁপুনি। সেই কাঁপুনিটা রঘুনাথ এখনও বুকের ভেতর বয়ে বেড়ায়। অথচ কমলা সেই কাঁপুনিটাকে থামিয়ে দিতে উদগ্রীব। রঘুনাথের হাতটা বুকে চেপে সে বলে, দেখো, আমি কেমন ঘামছি। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো তো। আমার ঘামগুলো তুমি শুষে নাও। এই গরম আমি আর সহ্য করতে পারছি নে…। ণ
রঘুনাথের বুকের উপর ভেঙে পড়ল কমলা, কাজলাদিঘির জলের মতো ছড়িয়ে গেল তার কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো মাথার চুল। কমলা উশখুশিয়ে উঠল। ওর সারা শরীর জুড়ে ঢেউ উঠছে, হঠাৎ আসা বন্যায় সে বুঝি ভেসে যাবে, হারিয়ে যাবে। তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না রঘুনাথ, একটা অলঙ্ঘনীয় ভয় তার রক্তে পানকৌড়ি পাখির মতো ডুবসাঁতার কাটে, হারিয়ে যায় আবার ভেসে ওঠে, সাঁতরে অবলীলায় চলে যায় শরীরের একপাড় থেকে অন্যপাড়ে। কমলা ফুঁপিয়ে ওঠার আগে হকচকিয়ে তাকাল, কী হলো, ঠাকুর দেখার মতো কি দেখছো আমাকে! তোমার কি কোনো কথা নেই, ভাষা নেই।
রঘুনাথ গাছের মতো স্তব্ধ চোখে তাকাল, ইবার আমাকে ফিরতে হবেখন। রাত ফুরিয়ে আসছে। মনে হয় পোকরাতারা ফুটে উঠেচে আকাশে।
কমলা বিরক্তিতে ভ্রূ-কুঁচকে বলল, এত কষ্ট করে তোমার আসার কি দরকার ছিল বুঝি না। ঝুঁকি যখন নিয়েছে তখন আর একটু ঝুঁকি নিলেই পারতে।
রঘুনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি চাইনে আমার ভুলের জন্য তুমি জীবনভর কাঁদো। তুমাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছু নেই।
এবার ফুঁসে উঠল কমলা, ঢং করো না। তোমার কি আছে–তুমি কি তা জানো? কোনো মানুষই জানে না তার আসল শক্তির কথা।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল, আমি জানি-তুমার ভেতরে কী শক্তি আছে। মেয়েমানুষের ভেতরে নদী থাকে, বন থাকে। তারা মাঠের ঘাস। রাগ নেই, দুঃখ নেই।
