-তাহলে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেচো? তা কি নাম যেন তুমার মেয়ের?
–পারুল। হাবুলচোর কাশল, কন্যাদায় মহা দায়।
–বুঝলাম। তাহলে কী করতে চাও এখন? লুলারামের কথায় যেন প্রাণ ফিরে এল হাবুলচোরের, আমি ভাবছিলাম গাঙ পেরিয়ে নয়াগ্রামের দিকে গেলে কেমুন হয়? ওদিকটায় কারোর হাত লাগেনি। আমি খোঁজখবর লিয়ে দেকেছি–মন্মথ মাস্টারের বাড়িটা সব দিক দিয়ে ভালো। ভালো মালকড়িও পাওয়া যাবে। মা শীতলাবুড়ির কেপা হলে বড়পুজা অব্দি আরামে চলে যাবে।
-সে তো বুঝলাম। কিন্তুক অত লৌকো কুথায় পাবে?
–সে সব আমি ঠিক করে রেখেচি।
কপালে ভাঁজ ফেলে লুলারাম বলল, আরও ভালো করে খোঁজখপর নাও। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। সামনের মাসের অমাবস্যায় কাজ হয়ে যাবে।
-মাঝে কি তুমার ঘরে একবার আসব?
-আসতে পারো, তবে দিনের বেলায় ভুল করেও এসো না। গাঁয়ের সব মানুষ তুমাকে চেনে, তুমি কি করো সব জানে। লুলারাম সাবধান করার গলায় বলল।
হাবুলচোর কথা মিটে যাওয়ার পর তার কাপড়ের ঝোলা থেকে বের করে আনল দেশি মদের বোতল, কাচের গ্লাস, আর ডালমুট, লুলাভাই, তুমার জন্য এনেচি। লোকাল ভাটির মাল নয়, খাস বেথুয়ার জিনিস।
দুটো গ্লাসে মদ ঢালল হাবুলচোর, একটা গ্লাস লুলারামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এখন আর দেশী খেয়ে জুত পাই না। সব ভেজাল। কী খাবো বল তো? গাঁ-গঞ্জে জুচ্চোর ভরে গিয়েছে।
লুলারাম খোলা পানীয়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, মদ খাওয়ার সময় অতো কতা বলো না। নেশা জমতেও ধ্যানের দরকার।
হাবুলচোর মুখ দিয়ে দোষ-স্বীকার করার শব্দ করল, তা যা বলেচো। লাখ কথার এক কথা।
ওদের নেশা জমে উঠতেই রঘুনাথ আর দাঁড়াল না। হাবুলচোরকে সে যে এর আগে দেখেনি তা নয়। একবার পণ্ডিত বিলে টানাজাল ফেলে মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল সে। সেবার তাকে জামগাছে বেঁধে বেদম মারে গ্রামের লোক। পরে থানা থেকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রায় মাসের উপর লেগেছিল তার সুস্থ হতে। এত মার খেয়েও সে লুলারামের নাম ফাঁস করেনি। রঘুনাথ দেখেছে সেদিন বিলের রাস্তায় লুলারাম ঘোরাঘুরি করছিল বেশ ডাঁটের মাথায়। তার সতর্ক দৃষ্টি ছিল হাবুল চোরের চোখের উপর। দৃষ্টি দিয়ে দূর থেকে হাবুলচোরকে শাসন করছিল লুলারাম।
গুপ্তবিদ্যায় শাসন না থাকলে লাগামছাড়া হয়ে যায় ভাবনাচিন্তা। বাঁধের উপর এসে রঘুনাথ ভাবছিল –হাবুলচোরের মেয়ে পারুলের কথা। মেয়েটাকে সে দেখেছে। বেশ স্বাস্থ্যবতী, শ্যামলা। তবে ওর চোখ দুটো বেশ সুন্দর, কাজলটানা, পদ্মর পাপড়ির মতো। পারুলের চেহারায় একটা মাতৃমুখ ভেসে ওঠে। ওকে দেখে কোনো খারাপ চিন্তা মনে আসে না।
পারুলের ভাবনা যেন কমলার কথা মনে করিয়ে দেয় রঘুনাথকে। হপ্তাখানিক পেরিয়ে গেছে তবু ওর সাথে দেখা হয় নি। রঘুনাথ খবর নিয়ে জেনেছে-কমলা তার মামার বাড়ি গিয়েছিল। কুলবেড়িয়া হাঁটাপথ। ভ্যানরিকশার ঝামেলা নেই। কমলা যে ফিরেছে–এ খবর সে জানে। নোলকের সঙ্গে তার পাকুড়তলায় দেখা হয়েছিল। কী কথায় যেন নোলক বলে ফেলেছে কথাটা।
রঘুনাথ আর বাড়ির দিকে গেল না। কে যেন তাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল কমলাদের ঘরের দিকে। আজ রাতে তার আর ঘুম আসবে না, আজকের রাত তার ঘুরে বেড়ানোর রাত।
চেনা পথ তবু আঁধারে হাঁটতে রঘুনাথের কেমন ভয় ভয় করে। ভয় তার সুফল ওঝার ছেলে কাশীনাথের জন্য। ছেলেটার বড্ড মাথা গরম। বারদুয়েক স্কুল ফাইনাল দিয়েও সে বেড়া ডিঙাতে পারল না। এখন ঘরে বসে টিউশন পড়ায়। বাপের ওঝা- গিরির ওপর তার আস্থা একেবারে নেই বললেই চলে। সুফল ওঝা বলছিল, এই মাদুলি শরীলে ছুঁয়ে থাকলে সব পড়া তোর হড়হড়িয়ে মনে পড়ে যাবে। এই মাদুলির নাম–বিদ্যাদেবী সরস্বতী মাদুলি। বৃহস্পতিবারে তুই এটাকে ধারণ করবি। ধারণের দিন নিরামিষ খাবি।
নিষ্ঠাসহকারে ডান হাতের বাহুতে মাদুলিটা ধারণ করেছিল কাশীনাথ, কিন্তু কোনো কাজের কাজ হয়নি। পড়া মনে পড়া তো দূরের কথা, মুখস্থ পড়াও মনে পড়ছিল না ঠিকঠাক। ঘরে ফিরে এসে সুফল ওঝাকে রাগের মাথায় ধরিয়ে দিয়েছিল মাদুলি, এই নাও তোমার যন্ত্র। মগজে কিছু না থাকলে শুধু মাদুলি পরে কিছু হয় না। তোমার জন্য আমি স্কুল ফাইন্যাল পাশ করতে পারলাম না। তোমার এই মাদুলি আমার পড়ার ইচ্ছেটাকে নষ্ট করে দেয়। আমি যে মন নিয়ে পড়ছিলাম, সেই মনটাকে নষ্ট করে দিল তোমার এই মাদুলির চিন্তা। আমাকে দিয়ে তুমি যা করার করলে, খবরদার তুমি এ মাদুলি আর কাউকে দেবে না। আমার মতো আর কারোর সর্বনাশ হোক এ আমি চাইনে।
মুখ শুকিয়ে চুন ফুটেছিল সুফল ওঝার, দৃষ্টি নিষ্প্রভ। গলা কাঁপছিল উদ্বেগ দুঃশ্চিন্তায়। তবু ছেলের সামনে সে তার পেশাকে ছোট করতে পারে না। এতদিন ধরে লালন করা গর্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া কি সহজ? যে কোনো খেলায় জয়-পরাজয় থাকতেই পারে। তা বলে আত্মসমর্পণ কখনো উচিত নয়।
কাশীনাথ বদরাগী ছেলে। সে রঘুনাথের চাইতে বয়সে বড়ো হবে। সরাসরি কুস্তি লড়ে রঘুনাথ হয়তো তার সঙ্গে পারবে না। না পারলে পিছিয়ে সে আসবে না। কমলাকে সে মন দিয়েছে। একথা মিথ্যে নয়। মন দেওয়ার অর্থ নিজেকে অন্যের কাছে বন্ধক রাখা। মন এক জায়গায়, দেহ এক জায়গায়–এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। রঘুনাথ কঞ্চির আগোল সরিয়ে নিকোনো উঠোনে পা দিল। অমনি দাওয়ার শুয়ে থাকা কালো রঙের কুকুরটা ডাকতে ডাকতে ছুটে এল তার সামনে। রঘুনাথ ভয় পেল না। শরীর টানটান করে দাঁড়াল। চেনা মানুষ দেখে ডাক থেমে গেছে কুকুরের। পায়ের কাছে এসে সে লেজ নাড়ছিল আদর খাওয়ার জন্য। রঘুনাথ উবু হয়ে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বেশ বোঝা গেল রাতচরা গোরুর মতো তার এই জায়গায় যাতায়াত আছে। ইঙ্গিতপূর্ণ তিন টোকায় দরজা খুলে পাটখেতের বুনো হাওয়ার মতো বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলা, যেন সে জানত রঘুনাথ আসবে, সে না এসে থাকতে পারে না। তবু অভিমানে কমলার ঠোঁট নড়ে উঠল, এত দেরি হল যে! যাও, ভালো লাগে না। তোমার জন্যি পথ দেখে-দেখে চোখ আমার শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে গেল।
