ভালোবাসা কি রঘুনাথ এখনও জানে না। তবে কমলার সঙ্গে তার যেদিন দেখা হবে সে রাতে সে স্বপ্ন দেখবেই দেখবে। ঘুম ভেঙে গেলে সারারাত তার আর ঘুম আসে না। আখখেতের আলের কচি-কচি ঘাস মাড়িয়ে কমলার দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তার মনের ভেতর বায়োস্কোপের ছবির মতো দুলতে থাকে। চোখ বুজে ভাবলে কী আনন্দ, মনটা কদমফুলের মতো ফুটে ওঠে, মৃদু চাপা একটা সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয় বিছানায়।
আজ সেসব কোনো অনুভব রঘুনাথকে ভাবায় না। সে ভাবছে একটাই কথা। সে কোন দিকে যাবে? চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। ধরা পড়লে? মার, অপমান, থানা-পুলিশ কিংবা জেল-হাজত। সে ধরা পড়বে কেন? গুরুবিদ্যা কোনোদিন কি বিফলে যায়? কাকার কাছে কাজ শিখবে সে। কাকা-ই হবে তার ওস্তাদ, গুরু। রঘুনাথ ভেতরে-ভেতরে তাতছিল। দুর্গামণির মুখটা মনে পড়তেই তার উথলে ওঠা আবেগে কে যেন ঠাণ্ডা জল ছিটিয়ে দিল। আলের উপর পা থেবড়ে বসে পড়ল সে। আবার দোলাচালের দোলনার মতো দুলতে লাগল মনটার। বাঁধের উপর দৌড়ঝাঁপ খেলা পাড়ার কুকুরগুলোর চিৎকার ভেসে এল, রোজ ওরা এসময় পাগল হয়ে যায় কেন? এটা কি কুকুরের স্বভাব? এভাবে চিৎকারে পাড়া মাথায় তোলার কোনো কি কারণ আছে, নাকি এই প্রহর পেরনো সময়ে তারা কী বিশেষ কাউকে দেখতে পায়? রঘুনাথ নিশ্চিত হল যে রাতের সময়টুকু সবার জন্য ভাগ-বাটোয়ারা করা থাকে। চোর কোন সময়টাকে পছন্দ করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করার জন্য? লুলারামকে একথা অবশ্যই সে জিজ্ঞাসা করবে। সব কাজেরই একটা নিয়ম-নীতি-নিষ্ঠা থাকার প্রয়োজন। এসব যখন রঘুনাথ ভাবছিল তখন বাঁধের উপর দিয়ে চলন্ত একটা আলোক উৎসকে দূর থেকে দেখতে পেল। আলোটা কিসের সেটা অনুমান করার জন্য সে ঘাড় সোজা করে বাঁধের দিকে তাকাল। তখনই তার কানে এল শেষযাত্রার ধ্বনি। বল হরি হরি বোল। কাদের আবার শূন্য হল সংসার? কার আবার পুড়ল কপাল? শ্মশানঘাটে যাওয়ার রাস্তাটা বাঁধ ধরে গিয়ে মানিকডিহির গাঁয়ে ঢোকার ঢালুপথ পেরিয়ে আরও অনেকটা। হ্যাজাকের আলো পায়ের গতির সঙ্গে দুলছে। সরে সরে যাচ্ছে জমকালো আলো। রঘুনাথ অনুমান করল হ্যাজাক নিয়ে শ্মশানে যাওয়ার মানে মৃতর বাড়ির অবস্থা মন্দ নয়। আলোটা বেশ কিছুক্ষণ পরে দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই একরাশ বিষাদ-দুঃখ এসে গ্রাস করল রঘুনাথকে। অথচ সে বুঝতে পারল না তার এত কিসের দুঃখ।
রাত বয়স্ক হতে থাকে, মাথার উপর উড়ন্ত রাতপাখির ডাকে রঘুনাথের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়। ঘরে ফেরার তাগিদটা এবার তাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। এত বড়ো একটা রাত দু-চোখের পাতা এক না করে ফুরিয়ে যাবে ভাবা যায় না। দুর্গামণি বলে, রাত উজগারা ভালো নয়। রাত শুধু ঘুম খায় না, খুনও খায়।
দু-হাতে ভর দিয়ে রঘুনাথ উঠে দাঁড়াতে চাইলে একটা ফিসফিস কথা তার কানের গহ্বরে সিঁধিয়ে যায়। এত রাতে কে কথা বলছে অমন চাপা গলায়? কণ্ঠস্বরটা চেনা মনে হচ্ছে, তবু সঠিক যেন চিনতে পারছে না সে। আগ্রহ আর বিস্ময়বোধে রঘুনাথ টানটান হয়ে বসে থাকল ঘাসের আসনে।
ঘন আখগাছের ভেতরে সম্ভবত দুজন মানুষ কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। এরা কি কথা বলার জন্য আর জায়গা খুঁজে পেল না। আশ্চর্য! রঘুনাথ শুনল একটি অপরিচিত কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন গলায় বলছে, এ হতে পারে না লুলাভাই। সব বিদ্যার চর্চা দরকার। চর্চা না থাকলে জং ধরবে। আর জং ধরলে কমে যাবে বিদ্যার ধার। তখন এই বয়সে ভেলকি হারিয়ে চোখ হবে সাধারণ হাটুরের মতোন। আমি চাই-হপ্তায় অন্তত দুটা করে কাণ্ড হোক।
সে তো হবে কিন্তু–। লুলারাম কী বলতে গিয়ে থামল, রোজ রাতে পুলিশ আসে আমার ঘরে। পাকুড়তলায় থানার গাড়িটা থামিয়ে তারা আমার কপাটে লাথ মারে। খিস্তি দেয়। এসব শুনে আমার মেয়েদুটো ভয়ে কাঁপে। তারা কান্নাকাটি করে। আমার আর ভালো লাগে না।
–ভালো না লাগলে চলবে? হাবুলচোর ঝুঁকে পড়ল, বসে খেলে সাগরও শুকিয়ে যায়। মানো তো কথাটা? নাকি মানো না? যাই হোক আমি বলছিলাম কি পুলিশও থাকবে, আবার চোরও থাকবে। এটা সংসারের নিয়ম। হাবুলচোর বড়ো করে শ্বাস টেনে নিল বুকের ভেতর, সেই শ্বাস শরীরে চালান করে লুলারামের মুখের দিকে সংশয় ভরা চোখে তাকাল, মরা পোড়ানো কি একা হয় গো, এরজন্য দল দরকার। বিদেশ-বিভূঁয়ে চুরির কাজে গেলে মানুষের খুব দরকার হয়। হাতে হাত না মিলিয়ে কাজ করলে খুব বিপদ। ধরা পড়ে গেলে ছাল ছাড়িয়ে ডুগডুগি বাজাবে। তবে তুমি থাকলে আমার কুনো চিন্তা থাকে না। তখন রাতকে ধমকাতে মন চায়।
অনেকক্ষণ চুপ করে গেল লুলারাম, একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল সে, কাজ করতে তো মন চায় হাবুলদা কিন্তু পেরে উঠি না। ছাতিটা আর আগের মতোন দঢ়ো নেই। বয়স হচ্চে তো
-এ তুমার ভুল ধারণা লুলাভাই।
–ভুল নয় গো, সত্যিকথা। মনে ভয় ঢুকেচে। ভয় হল গিয়ে উইপুকা। কখুন কুরে কুরে খেয়ে লিবে তুমাকে–টেরও পাবে না। লুলারাম ঘাড়-গর্দান টানটান করল। সামনে সরে এসে হাবুলচোর খপ করে হাত দুটো জড়িয়ে ধরল লুলারামের, ভাই, যে কতা বলছিলাম। মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্রপক্ষের দাবি-দাওয়া আচে। টাকার তো দরকার। কাজে না গেলে টাকা আসবে কুথা থেকে। টাকা তো আকাশ থিকে বৃষ্টির মতোন ঝরবেনি।
