প্রাণভরে ছাতু তুলে ঘরে ফিরে এসেছিল চুনারাম। ছাতু তোলার গল্প গর্বভরে শুনিয়ে দিল দুর্গামণিকে। রঘুনাথ ভেবেছিল দাদুর কথা শুনে খুশি হবে দুর্গামণি। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। সব শোনার পরে রাগে ঝাঁ-ঝাঁ করছিল দুর্গামণির মাথা, ছিঃ, একাজ তো মানুষের কাজ হয়নি। পরের বেড় থেকে ছাতু তুলে আনায় কুনো বাহাদুরী নেই। বাবু যদি দেখতি পেত তাহলি লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত।
রঘুনাথ অতিরিক্ত উৎসাহ নিয়ে বলেছিল, বাবু দেখবে কি করে? আমরা যে আলো না ফুটতেই ঘর থিকে বেরিয়ে গিয়েচি।
-কাজটা ভালো করিস নি বাপ। দুর্গামণির কণ্ঠস্বরে হতাশা ঝনঝনিয়ে উঠল, পরের জিনিস না বলে নিলে চুরি করা হয়।
–তাহলে আমরা চোর?
-হ্যাঁ, চোরই তো। দুর্গামণির গলা কঠিন হয়ে উঠল। এরপরে রঘুনাথের আর কথা বলার সাহস হয়ে উঠল না। বউমার রকমসকম দেখে চুনারাম আর কথা বাড়ায়নি। সুড়সুড় করে চলে গিয়েছিল তক্তাপোষের কাছে। দাওয়ার একধারে তক্তাপোষটা সব সময় পড়ে থাকে। চুনারামের ওটাই বিশ্রাম করার জায়গা। বসে পা দোলাচ্ছিল সে। দুর্গামনির কথা ভাবছিল সে। গরিবঘরের মেয়েটার সাহস আছে। অভাবে সে ভেঙে পড়ে না। অন্যায়ের কাছে নিজেকে সে বিকিয়ে দিতে শেখেনি। ধাওড়াপাড়ায় এমন বউ কটা ঘরে আছে? চুনারাম বিড়ি ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল বাতাসে। বউমার জন্য গর্ব হল তার। এ মেয়েই পারবে গুয়ারামকে পথে আনতে। এর হাতে সংসারের রাশ থাকলে সে সংসার খাদে তলিয়ে যাবে না।
দুর্গামণির মুখটাই ঘুমাতে দিচ্ছিল না রঘুনাথকে। সে উঠে গিয়ে চুনারামের বিছানার পাশ থেকে বিড়ির ডিবা আর দেশলাই নিয়ে এল। বিড়ি খেলে ধোঁয়ায় যদি মনটা খোলা হয়। সাবধানে বিড়ি ধরিয়ে ফুঁসফুঁস করে টানল রঘুনাথ। তবু মন থেকে তার ভয় গেল না। এ পাড়ার সব ছেলেরাই গুরুজনদের সামনে বিড়ি ফোঁকে। এটাই রেওয়াজ। দুর্গামণি রঘুনাথকে সেই সহজ পথে চলতে দেয়নি। চোখ রাঙিয়ে বারবার শাসন করেছে সে, খবরদার কুনোদিন ওসব ছুঁয়ে দেখবি না। যদি কুনোদিন তোকে নেশা করতে দেখেছি সেদিন চ্যালাকাঠ দিয়ে মেরে তুর মাথা ফেটিয়ে দেব।
-রতন, ড্যাবরা যে খায়?
–ওরা গু খায় বলে তুই-ও খাবি? দুর্গামণির জবাবের কাছে মাথা ঝুঁকে গেল রঘুনাথের। সেই থেকে একটা ভয় এবং শ্রদ্ধা তার মনের ভেতর বাসা বাঁধল। মাকে সে কোনো কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারে না। দুর্গামণি প্রায়ই তাকে বলে, শুধু ঘাড়ে-গর্দানে বড়ো হলে মানুষ বড়ো হয় না। মানুষকে বড়ো হতে গেলে বড়ো কাজ করে দেখাতে হয়।
বড়ো কাজ মানে দশের কাজ, সমাজের কাজ। রঘুনাথ ভাবে। এসব কাজে হিম্মত দরকার। চড়াইপাখির মতো বুক নিয়ে এসব কাজ হয় না।
বিড়িটা নিভিয়ে উঠোনে ফেলে দিল রঘুনাথ। পুরো মুখটা তেতো হয়ে গিয়েছে। গলাটা শুকোচ্ছে বারবার। মনটা ছটফট করছে কী জন্য সে ঠিক বুঝতে পারে না। সন্ধের পর থেকে জোর বৃষ্টি হয়েছে। পথের ধুলো এখন কাদা। মাটি থেকে অদ্ভুত একটা সুগন্ধ উঠে আসছে বাতাসে। খরার বাতাস আজ বড়ো অহঙ্কারী। এই শান্ত পরিবেশটা ভালো লাগছিল রঘুনাথের। শীত-শীত আমেজ ছড়িয়ে রয়েছে সাবধানে। বৃষ্টির সময় বুড়িগাঙের জলে খৈ-ফোটার মতো চড়বড় চড়বড় শব্দ হয়। জলের বিন্দুগুলো ভেঙে কাচের মতোন ছড়িয়ে যায় জলের উপর। সামান্য ঢেউ দিলে সেই দৃশ্য অপার্থিব।
রঘুনাথ ভাবল কাকার সঙ্গে তার একবার দেখা করার দরকার। লুলারামের প্রস্তাবটা মনে ধরার মতো। রাতের কাজটা ঠিকঠাক শিখে নিতে পারলে তখন শুধু টাকাই টাকা। গুয়ারাম রগড় করে বলে, টাকা নয় তো যেন চাঁদির জুতা। চাঁদির জুতায় কাঠেরপুতুল হাঁ-করে। বুবায় কতা বলে। মরা মানুষ পিটপিটিয়ে তাকায়।
রঘুনাথের টাকার ভীষণ দরকার। গুয়ারামের ঘর ছেড়ে যাওয়াটা তার মনোপূতঃ হয়নি। পেটের দায়ে মানুষ কেন জন্মভিটা ছাড়বে? মাটি ছেড়ে গেলে মানুষের আর থাকে কি?
লুলারামের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে কী ভেবে আগড় থেকে হাত সরিয়ে নিল রঘুনাথ। তার মন বলল, যাসনে রঘু, উখানে যাস নে। পাপের পুকায় কেমড়লে তার বিষজ্বালা বড়ো ভয়ঙ্কর। তুই সইতে পারবি নে, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাবি। তারচে ঘুরোন যা, ঘর যা। লুভের পথ, পাপের পথ তুর নয়।
কী ভেবে অন্ধকার বেড়ার ধার থেকে মাথা নিচু করে এল ফিরে রঘুনাথ। বাঁধের উপর উঠে এসে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। রাতেরবেলায় বাঁধের ধার শান্ত, একেবারে শুনশান। এসময় আকাশ থেকে দেবতারা নেমে এসে বুঝি হাওয়া খায়। বুড়িগাঙের জলে গা ধুয়ে আবার চলে যায় স্বর্গে।
এখন কদমগাছের পাতা নড়ছিল জলে হাওয়ায়। মুখ থ্যাবড়া পেঁচাটার মনে সুখ নেই। ইঁদুরগুলো আজ সব কোথায় পালাল? বসে বসে ঘাড় ঘুরাল পেঁচাটা। যেন ঘাড় নয়–পুরো শরীরটা তার ঘুরে গেল। এ সময় বুড়িগাঙের জলে কপাত করে ঘাই দিয়ে উঠল মাছ। দূরে কোথাও ক্র্যাও-ক্র্যাও শব্দে ডেকে উঠল রাতপাখির দল। এক-যোগে প্রহর ঘোষণা করে ভেসে এল শেয়ালের চিৎকার।
.
১০.
রঘুনাথ আকাশের দিকে তাকাল। ফিকে জ্যোৎস্না চুঁইয়ে নামছে পৃথিবীতে। অমাবস্যা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। হয়ত ভোরের দিকে আরও ঝকঝকে দেখাবে চারপাশ। কী ভেবে বাঁধের ঢালু পথ বেয়ে মাঠের দিকে একা একা নেবে গেল রঘুনাথ। তার হাতে লাঠি বা কোনো আলো নেই। সাহেবমাঠের আল সব সময় বিপজ্জনক। ওখানে শামুকভাঙা খরিস সাপের বসবাস। ওরা মাঠেই শঙ্খ লাগে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। ঘাস কাটতে গিয়ে দুপুরবেলায় রঘুনাথ অনেকগুলো খরিসের ছাকে দেখেছিল চরতে। ভয় যে লাগেনি তা নয়। তবে ওদের সে মারেনি। দুর্গামণি খরিসের ছাগুলোকে ড্যাকা বলে। ড্যাকা ওদের চলতি নাম। হাঁটতে হাঁটতে রঘুনাথের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি চলকে উঠল। এই মাঠে কমলার সঙ্গে তার কতবার দেখা হয়েছে। যতবারই চোখাচোখি হয়েছে ততবারই চোখ নামিয়ে ভীতু খরগোসের মতো দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছে কমলা। ওর নরম চোখের তারায় ধরা পড়ে যাওয়ার কাঁপুনি। এই কাঁপুনিটা রঘুনাথের বুকের ভেতরে পুরুষমথের মতো ফড়ফড় করে। এই ফড়ফড়ানীর অন্য নাম কষ্ট। সূর্যাক্ষ বলে, কষ্ট নয়রে, ভালোবাসা।
