রঘুনাথ চুপচাপ শুনছিল। সে সব জেনে-বুঝেও এখন কিছু বলতে পারে না। ঘরের কথা বাইরে বলা শোভা দেয় না। লোক হাসবে। নিন্দে করবে। মুখে কুলুপ এঁটে রঘুনাথ দুলু কাহারের দিকে তাকাল, চলো দুলুকাকা। ঘরে গিয়ে আবার খপরটা দিতে হবে।
-খপর দিয়ে কি হবে? তারে তো আমি পেরাই লালগুলা টেরেনে দেখি। দুল ঠোঁট কুঁচকে আধ্যাত্মিক-মুদ্রায় ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিছুক্ষণ পরে সে নিজের অবস্থায় ফিরে বলল, চল চা খাই। আজ রাতে ঘুম ভালো হবে বুঝতে পারছি। সারাদিন ভেষণ কষ্ট যায়। গান গেয়ে-গেয়ে গলাটা ঘড়ঘড় করে ব্যথায়।
-একটু আরাম করলেই তো পারো।
–তা যায়। কিন্তু সনসার? সনসার যে আরামের কতা বলে না।
বাঁশের বাতা চিরে বানানো হয়েছে বেঞ্চি। লোক বসে-বসে চকচক করছে সেই বাতা। টুকরো ছিটকাপড় দিয়ে বানানো ঝোলাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বাঁ-হাত দিয়ে কাঁধটা রগড়ে নিল দুলু কাহার, তারপর গর্দান নাড়িয়ে মেয়েলী স্বরে বলল, দুটো চা।
দুলু পেশার সঙ্গে নিজেকে পাল্টে নিয়েছে পুরো মাত্রায়। চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে সে এখন ভিন্নমানুষ। যারা তাকে বছর পাঁচেক আগেও দেখেছে তারা এখন অবাক হয় দুলুর এই পরিবর্তনে। কুলু কাহার ছেলের এই পরিবর্তনে মাথার চুল চেপে আক্ষেপ করে, হায় খুদা, এ কী করলে গো তুমি? সব দিয়ে কেড়ে নিলে কেনে? আমার দুষটা কুথায়?
বাপের এই হাহাকারকে কোনো গুরুত্ব দেয় না দুলু। সে জানে দু-দিনের এই শরীর জলে ভাসবে, দাঁড়কাকে ঠুকরে খাবে। পচা দেহকে এত ভালোবেসে কি হবে? ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাড়ে চুমুক দিয়ে দুলু কাহার বলল, সামনে বড়ো খারাপ দিন আসচে রে! এমন এট্টা খারাপ দিন আসচে যখন মানুষ মানুষকে চিনবে না। এই দাদা, ভাই, কাকাখুড়োর সম্পর্কগুলো সব রেললাইনের খোয়ার চেয়েও নিরেট হয়ে যাবে। মানুষের মন থিকে দয়া-মায়া সব মুচে যাবে। কপালে ভাঁজ ফেলে অন্যমনস্ক হয়ে গেল দুলু কাহার।
রঘুনাথ আয়েশ করে চা-খেয়ে ঠোঁট মুছে বলল, কাকা, এট্টা কতা বলি তুমারে। রাগ করো না।
-রাগ করবো কেনে? বল, বল।
-তুমি টেরেনে গান গাও, গান শোনাও। কই গাঁয়ের মানুষকে তো গান শোনাও না? রঘুনাথের প্রশ্নে সামান্য হলেও বিচলিতবোধ করল দুলু কাহার, গাঁয়ের মানুষের আগের সেই মন নাই। এখুন হাড়সার খাওয়া ফসল খেয়ে ওদের মন হাড়ের চেয়েও শক্ত হয়ে গিয়েছে। ওদের মনে দয়া-মায়া বস্তুটাই নাই। তাছাড়া ভিখ দেওয়ার সময় ওরা মুষ্ঠি ভরা চালটাও দিতে চায় না। ভিখ না পেলে আমার তো চলবেনি। তাই হররোজ গাঁ ছেড়ে পালাই! কাজ-কম্মো সেরে আবার গাঁয়ে ফিরি। আমার যে টিকি বাঁধা আচে এই গাঁয়ে!
রাতে জাউভাত রেঁধেছে দুর্গামণি। বৃষ্টির পরে তার মেজাজটাও বেশ ফুরফুরে। রঘুনাথকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে, সে জিজ্ঞাসা করল, নিদ লাগচে বুঝি? ভোক লাগলে বল-ভাত বেড়ে দিই।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল, দাদু মনে হয় শুয়ে পড়েচে।
–শুতে দে। দিনভর আরাম পায় না মানুষটা। দুর্গামণির গলা নরম হয়ে এল, দুলাল কাল চলে যাবে। এদিকে আবার ইন্দুমণির জ্বর এয়েচে। দেখ দেকি কেমুন বেপদ! আর ভালো লাগে না।
-কাকা কেনে মুনিষ খাটতে চায় না? রঘুনাথের হঠাৎ প্রশ্নে ঠোঁট ওল্টাল দুর্গামণি, বুক ভরানো শ্বাস ছেড়ে ছেলের মুখের দিকে তাকাল, সবার ভাগ্য সমান হয় না বাপ। কারো কারোর ভাগ্য ভুষো ছাই দিয়ে ওপরওয়ালা লিখে দেয়।
-কাকা কেনে খাটতে যায় না আমি জানি।
–কী জানিস? দুর্গামণির চোখ শক্ত হয়ে উঠল।
রঘুনাথ অকপটে বলল, কাকার স্বভাব ভালো নয়। গাঁয়ের মানুষ কাকাকে লিয়ে অনেক কথা বলে। কাকা চোর। আমার কচিয়াদাদুও চোর।
-চুপ। যা বলেচিস, আর বলবি নে। দুর্গামণি জ্বলে উঠল, ওরা তুর গুরুজন। ওদের লিয়ে কু-ভাবতে নেই।
-কু’ কাজ করলে কু-ভাবব না?
–না। তুই ছোট, ছোটর মতুন থাক।
-আমিও তো একদিন বড়ো হবো। তখুন?
–তখুন কি? চুলায় শুকনো তুষ ছড়িয়ে দিয়ে দুর্গামণি অঙ্গার চোখে রঘুনাথকে দেখল।
রঘুনাথ মায়ের চোখে চোখ ফেলে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, কাকা আর কচিয়াদাদুর মতন আমিও রেতেরবেলায় মুনিষ খাটতে যাবো। রাতেরমুনিষ হলে আমাকে আর বাবার মতন গাঁ-ছাড়া হতে হবেনি।
দুর্গামণির সারা শরীর কেঁপে উঠল রঘুনাথের কথা শুনে, ওসব কথা মনে আনাও পাপ। যা নাক-কান মুল। এই আমার মাথায় হাত রেখে বল–আর কুনোদিন এসব কথা মনে আনবি নে। তুই যদি এসব কথা ভাবিস-তাহলি আমার মরণ হবে বলে দিলাম। কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না।
রাতভর ঘুমাতে পারল না রঘুনাথ, ঘুরে-ফিরে মায়ের কথাই ভাবছিল সে। তাদের সংসারে অভাব আছে কিন্তু সেই অভাবের কাছে এখনও মাথা বিক্রি করে দেয়নি দুর্গামণি। সে বিপথগামী হবে না, এটাই তার শপথ।
রঘুনাথের মনে পড়ল অনেকদিন আগের একটা ঘটনা। দাদুর সঙ্গে ছাতু তুলতে গিয়েছিল সে বামুনবাড়ির জঙ্গলে। এই এলাকার বালি ছাতু বেশ বিখ্যাত। বর্ষার শুরুতেই শুরু হয়ে যায় ছাতু ফোটা। ছোট ছোট ছাতুগুলো বর্ষার জল পেয়ে বনফুলের মতো মেলে ধরে নিজেদের। অসংখ্য ছাতু যেন ঘাস ফুলের মতো জাহির করে নিজেদের। বামুনবাড়ির কর্তা নীলাক্ষবাবু এইগুলোকে নজরে রাখেন, কাউকে হাত লাগাতে দেন না। চাইলেও একটা ছাতু কাউকে তিনি দেবেন না। নিজের সম্পত্তির উপর তার টান বরাবরের। চুনারাম এসব তথ্য জানত। রঘুনাথকে নিয়ে সে তাই বেরিয়ে গিয়েছিল ভোর-ভোর। আলো ফুটলে মানুষজনের সমাগম বাড়বে। ছাতু তুলতে দেখলে সেই খবর পৌঁছে যাবে বাবুর কানে। বাবু রাগারাগি এবং গালমন্দ করবেন। সেরকম হলে পাকমোড়া দিয়ে কেড়ে নেবেন বেতপালি। তখন সব শ্রমই পণ্ডশ্রম।
