বয়স বাড়লে শুধু চামড়া নয়, ঢিলেঢালা হয়ে যায় মানুষের মনও। ভেঙে যাওয়া কলসী-হাঁড়ির খোলামকুচির মতো স্বপ্নটাও অর্থহীন, গুরুত্বহীন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছড়িয়ে যাওয়া স্বপ্নকে নতুন করে মালা গাঁথার মতো আর একত্রিত করা যায় না। কুলু কাহারের ইচ্ছা ছিল সে ছেলেটাকে অন্তত লাখুরিয়া হাই ইস্কুল অবধি পাঠাবে, কিন্তু দুলুর জেদ, গোঁ আর পালিয়ে বেড়ানো স্বভাব তাকে পণ্ডিত বিলের জলের মতো স্থিতু হতে দিল না। ফলে অ-আ ক-খ শিখেই দুলুর পড়া শেষ। গায়ে গতরে বাড়তেই সে-ও কুড়ুল তুলে নিল কাঁধের উপর। একদিন কুলু কাহারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল কারখানায় কাজ করবে বলে। কাঠ-চেরাইয়ের কাজ মন্দ নয়। এ কাজ করে অনেকেই তো সংসার টানছে।
কুলু কাহারের এখন বয়স হয়েছে, সে আর নিয়ম করে খাটতে যেতে পারে না। তবু সে নিয়ম করে একবার স্ট্যাণ্ডের চা-দোকানটায় আসবেই আসবে। এতদিনের অভ্যাস, বাজারে না এলে তার ভাত হজম হবে না। দুলু হাজার নিষেধ করলেও সে শুনতে চায় না, গোসা করে বলবে, বুড়া হয়েচি মানচি–তবু এখুনও তো মাজা পড়েনি, লাঠি ছাড়া চলাফেরা করতে পারি। এখুনও মাল আমি তুলে দিতে পারব বাসের মাথায়।
মনে যত জোর থাক কুলু কাহারকে মোট বওয়াতে মানুষ এখন ভয় পায়। বুড়ো মেরে কেউ পাপের ভাগীদার হতে চায় না।
সংসার চলছিল দুলুর ঘাম ঝরানো মেহনতে। ফুঁকফুঁক করে প্রায়ই সে বিড়ি টানত বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে। কাঠ-চেরাইয়ের কাজে মেহনত যেমন আছে–তেমন আছে পয়সা। শক্তি জল হয়ে ঢল নামাত পা-বরাবর। যেমন খাটত তেমন খাদ্য পেত না দুলু। তার যুবক চেহারা ঝাঁপিতে আটকে রাখা জাতসাপের মতো ফুঁসছিল। একদিন বদলা নিল সে-ও। কাশি-কফের সঙ্গে কাঁচা রক্ত উঠে এল সেই প্রথম। কালীগঞ্জের ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে বলল, তোমার টি-বি হয়েছে দুলু। তোমার এখন আরামের প্রয়োজন। দুধ-ঘি, ভালো-মন্দ নিয়মিত খেতে হবে তোমাকে। যদি নিয়ম করে ওষুধ খাও আর আমার কথা শুনে চলো তাহলে তোমার এই অসুখ মাস তিনেকের মধ্যে পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে।
দুলুর বুকের রোগ ভালো হয়ে গেল, সে এখন সুস্থ মানুষ। তবু ডাক্তারবাবু মানা করেছেন তাকে কাঠ-চেরাইয়ের কাজে যেতে। গাঁয়েঘরে বিকল্প কাজ কোথায়? হালকা কাজ ছাড়া দুলুর চলবে না। শেষপর্যন্ত সে একটা কাজ পেল পালেদের আটা চাকিতে গম-পেষানোর। মাস গেলে মাইনে দেবে পালবুড়ো। এছাড়া জলখাবার, এটা-সেটা।
দুলু আটা চাকির কাজটা মন দিয়ে করছিল। এ কাজে সে বেশ স্ফূর্তিও পেত। হঠাৎ অমনোযোগে তার ডান হাতটা জড়িয়ে গেল ঘূর্ণায়মান বেল্টের সঙ্গে। মেসিনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে অক্ষম হল দুলু। মেসিন তার ডান হাতটা বল প্রয়োগে বিচ্ছিন্ন করে দিল শরীর থেকে।
সঙ্গে সঙ্গে কাটা হাত আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলা দুলুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল পালবুড়ো।
ডাক্তারবাবু জবাব দিলেন, এখনই একে কৃষ্ণনগরে নিয়ে যান। আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যা ব্লিডিং হয়েছে, ইমিডিয়েট ওর ব্লাডের দরকার।
পালবুড়োর চেষ্টায় দুলু প্রাণে বাঁচলেও তার ডান হাতটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রইল। অথর্ব হয়ে গেল দুলু। চোখ ফাটিয়ে কান্না এল তার। কুলু কাহার তার কোঁকড়ানো চুলে স্নেহের হাত রেখে বলল, চোখ মুছ। যা হবার তা তো খোদা করে দেখাল। খোদার উপর আমার কুনো রাগ নেই বেটা। তুর এট্টা হাত নেই তো কি আছে? তুর দুটা পা আচে। যার পা আচে সে তো ভবঘুরে। ইবার থিকে তুই চরে খা। আমি খোদাতালার কাছে তুর লাগি দোয়া মাঙচি।
দুলু সেই থেকে না ভিখারি, না বাউল, না ফকির। তবে তার গলায় চড়া সুরে খেলে বেড়ায় লালন ফকির। গাঁয়ে গঞ্জে, হাটে-বাজারে এমনকী রেলগাড়ির কামরায় সে ভিখ মেঙ্গে বেড়ায় সকাল থেকে সন্ধে। গান শোনানোর পরে বা হাতটা বাড়িয়ে দেয় হাতের তালু চওড়া করে। কেউ দেয়, কেউ আবার দেয় না। তবু সারাদিনে কুড়িয়ে বাড়িয়ে সে যা পায় তাতে তার দিব্যি চলে যায়। এখন মনে কোনো খেদ নেই দুলুর। কুলু কাহার তাকে বিয়ের কথা বললে দুলু হাসে, আর আমারে বাঁধতে চেও না বাপ। মন আমার বারমুখী হয়েছে। এ ঘর যে কবে পর হয়ে যাবে-সে কতা আমি হলফ করে বলতে পারচি নে। যে কদিন আমি সংসারের লতায় জড়িয়ে আছি, সে কদিন তুমাদের কুনো অসুবিধে হতে দিব না। জান দিয়ে হলেও তুমাদের আমি সেবা করে যাবো।
সন্ধে সাড়ে সাতটায় বাস থেকে নামল দুলু কাহার। তার গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা, মাথার কোঁকড়া চুল ঘাড় ছাপিয়ে কাঁধ ছুঁয়েছে, কপালে খড়ি দিয়ে আঁকা রসকলি, চোখে মুখে ক্লান্তির পাশে অদ্ভুত এক প্রসন্নতা। জমা জলে পা দিয়ে সে কিছুটা বিব্রত। পায়ের চপ্পলটা আর একটু হলে তাকে বেকায়দায় ফেলে দিত, নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে সে আশেপাশে আবেশী চোখে তাকাল। তার ঢুলু ঢুলু উদাসী চোখ হঠাৎই রঘুনাথকে দেখতে পেয়ে প্রফুল্লবোধ করল, কি রে, তুই ইখানে কি করচিলি? ফিরবি নে?
ঢিলিকাকিকে খুঁজতে বেরিয়েচি। রঘুনাথ এগিয়ে এল সামনে, তুমি তো দেবগ্রাম থিকে ফিরলে, সিখানে কি তার সাথে দিখা হলো তুমার? বাউল-কায়দায় ঘাড় নাচাল দুলু কাহার, তার কাটা হাতের ল্যাকপ্যাক করা জামার কাপড়টা সেই ছন্দে দুলে উঠল, তুর কাকারে বল–একবার বরমপুর বা কেসনগরে লিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে। শুনেচি ওর তো পয়সার কুনো অভাব নেই। অভাব নেই যখন তখন ওর অতো হাড়কিপটেমী কেন? টাকা-পয়সা কি সঙ্গে যাবার ধন রে! ওসব হল অলিত্য। নদীর ঢেউ। আজ আচে, কাল নেই।
