কীর্তন দলটি নাচের মুদ্রায় হেলে দুলে বাঁধের উপর উঠে যাচ্ছে। বেশ কদিন থেকে ওদের আর প্রার্থনার অন্ত নেই। গরম হাওয়ার দাপটে মাঠেঘাটের কাজকর্ম এখন বন্ধ হবার মুখে। এত চড়া রোদে মুনিষগুলোও আর পারছে না। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে এ ও জ্ঞান হারিয়ে পড়ছে ঢেলা খেতে।
সন্ধ্যা গাঢ় হয়নি, মেঘ করে এল আকাশ জুড়ে। পাকুড়তলায় জল আনতে গিয়েছিল দুর্গামণি। সে ফিরে এল হড়বড়িয়ে। বাইরে অনেক কিছুই পড়ে আছে। মেঘের যা তর্জন-গর্জন। যে কোনোসময় ঢাললেও ঢালতে পারে। দুর্গামণি ঝুম কালো আকাশের দিকে তাকাল। চিকচিকিয়ে উঠল তার চোখের তারা। এক ফোঁটা বৃষ্টির দানা তার চোখের নীচটাতে পড়ল অশ্রুদানার মতো।
–মা শীতলাবুড়ি মুখ রেখো। আচ মন ভরে ঢালো। ঢেলে ঢেলে সব ভেসিয়ে দাও। জোর পায়ে দুর্গামণি আগড় সরিয়ে ঢুকে এল দাওয়ায়। দু’চারবার চাঁটি মারার মতো বাতাস এসে ফোঁসফোঁস করল কলাগাছের ঝাড়ে, নতুন বেরনো পাতাগুলো কাঁপতে লাগল হাওয়ার শাসনে, সজনেগাছের হলুদপাতাগুলো চুনোমাছের মতো সাঁতরে বেড়াল বাতাসের নদীতে। মাঝ আকাশে বাজ পড়ল কড়কড়াত। বিদ্যুৎ-এর চিকুর ফাটিয়ে দিল আকাশের সিঁথি। অনুরাগ পর্ব শেষ হলে শুরু হল তুমুল বর্ষণ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দলবদ্ধ ভাবে নেমে এল পৃথিবীর ধুলোয়। সৃষ্টির আদিম খেলায় মেতে উঠল চরাচর।
রঘুনাথ কালীগঞ্জ বাজারে এসেছিল ঢিলিকে খুঁজতে। হাট করতে এসে গাঁয়ের একজন ঢিলিকে দেখেছে পুরাতন বাজারে ঘোরাঘুরি করতে। নূপুর এসে বলল, দাদা, যা না রে, মাকে ধরে লিয়ে আয়। এখুন গেলে তার সাথে তুর দেকা হয়ে যাবে। তুকে দেখলে সে পেলিয়ে যেতে পারবে না। তুর কথা শুনবে। যা দাদা।
নুপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট পেয়েছিল রঘুনাথ। ওদের খাওয়া-পরার কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু সুখের। সুখ জিনিসটা দূর দেশের পাখির মতো উড়ে গেছে সংসারে ছেড়ে। শান্তি খুন হয়েছে চোরাকুঠুরীর অন্ধকারে।
ঠিক আচে। যেচ্চি। দেকি কতদূর কী করা যায়। রঘুনাথের কণ্ঠস্বরে ছিল সান্ত্বনা। নূপুর ব্যস্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ, তুই যা। তুই না গেলে মা বাস ধরে দেবগ্রাম-পলাশী পেলিয়ে যাবে। ওখান থেকে টেরেন ছাড়ে। টেরেন চেপে পেলিয়ে গেলে তার হদিস আর পাওয়া যাবে না। নুপুরের ছলছলানো চোখ মন খারাপ করে দিল রঘুনাথের।
কালীগঞ্জে এসে আটকা পড়ে গেল রঘুনাথ। এ বৃষ্টি যে চট করে থামবে না সে হাড়ে-হাড়ে টের পেল। অসুবিধা হলেও এই অসুবিধা মানিয়ে নেওয়া যায়। কদমগাছের ফুলগুলোর জন্য তার কষ্ট হত। ফি-বছর এ সময় ফুল ফোটে, গাছটা আকাশের ঝকমকে তারার মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। এ বছর সেই সময় কবে পেরিয়ে গেল। কুঁড়ি ধরেছিল কিন্তু শুকিয়ে তা বেশিরভাগই ঝরে গেল। বুড়িগাছের শুকনো মুখের দিকে আর তাকানো যেত না, যেন বড়ো ঘরের বিটি হঠাৎ রোগে-শোকে ধূসর মলিন শুকনো। ওর মুখে জলের ছিটে দেবার আর কেউ নেই।
চা-দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রঘুনাথ তবু ত্যাড়াবেড়া জলের ছাঁট ভিজিয়ে দিল তাকে। জলের মোহনী শক্তি প্রবল, রোমাঞ্চিত হল রঘুনাথ। রাস্তায় জল জমে যেতেই বৃষ্টি এবার দম নিল। তবু গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিকণা ঝিরঝির করে ঝরছিল। মাত্র ক’ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ধরিত্রী এমনভাবে সে শ্বাস ছাড়ল। উৎকট খরার সেই ভয়াবহতা এখন আর নেই, চারদিক থেকে ছুটে আসছে ঠাণ্ডা আমেজ। শুধু আমেজ নয়, সুখের গন্ধ পেল রঘুনাথ।
যার জন্য এতদূর আসা, সেই ঢিলিকাকিকে দেখতে পেল না রঘুনাথ। নূপুর আর নোলককে সে কি বলবে? কাকিকে খুঁজে পেলাম না এই কথাটা বলতেই তার বাবো-বাধো ঠেকবে। ওরা কাঁদবে না, কিন্তু মন খারাপ করে কষ্ট পাবে। এই মুহূর্তে লুলারামকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারল না। আজ ঢিলিকাকির এই অবস্থার জন্য লুলারামকাকাই দায়ী। ঝারির সঙ্গে কাকার সম্পর্কটা ডালপালা ছড়িয়েছে। লুকিয়ে লুলারাম গিয়ে মাংস দিয়ে এসেছে ঝারিকে। ভিকনাথ সব জানত, সে লোভে পড়ে কোনো নিষেধ করে নি। অভাব মানুষের সব খায়। ভিকনাথকে তার অভাব পুরোপুরি গিলে নিয়েছে। ফলে ঝারির মুখের উপর সে কোন কথা বলার সাহস রাখে না।
পুরাতন বাজারটা ঘুরে রঘুনাথ চলে গেল বাস-স্ট্যাণ্ডের দিকটায়। ওদিকটা এখন এই দিকটার মতো জমজমাট নয়। দু-একটা মিষ্টি দোকান, সোনা দোকান, কাপড়ের দোকান, সাইকেল দোকান ছাড়া আর কিছু নেই। বাস-স্ট্যাণ্ডের চা-দোকানটায় তখনও বেশ ভিড় দেখতে পেল রঘুনাথ। সবার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। সেই উত্তেজনাকে ঘিরে রয়েছে আশঙ্কা আর সংশয়।
দুল কাহারকে এ গাঁয়ের কে-না চেনে। ওর মতো দরাজ মনের মানুষ খুবই কম হয়।
দুলু কাহারের বাপের নাম কুলু কাহার। সে আগে পাল-কোম্পানির টালিকারখানায় কুড়ুল নিয়ে কাঠ ফাড়ত। শুধু কাঠফাড়া নয়, যখন যা কাজ পেত সে কাজ মন লাগিয়ে করত। গায়ে তাগদ থাকলে মানুষের মনে কর্মভীতি জমতে পারে না। টালি কারখানার কাজ মরশুমি কাজ। বর্ষা-বাদলের দিনে তা হবার নয়। ভেজা কাঠ শুকোবার জন্য রোদ দরকার। কাঁচা কাঠে পোড় জ্বলে না, শুধু ধোঁয়া উগরায়। কুলু তাই বর্ষা-বাদলের দিনে কুড়ুল ফেলে মোট বইত, মুনিষ খাটত। বিশেষ করে কালীগঞ্জ বাস-স্ট্যাণ্ডে তার সময় কেটে যেত বেশি করে। এখানে টুকটাক কাজ লেগেই থাকে। বাসের মাথার মাল-লোড করা, লরিতে পাট চড়ানো..আরও কত কী কাজ। দিনভর খাটলে ভাত-কাপড়ের অভাব হত না কুলুর। তার তিন বেগমের দু-জন এখন দেশ ছাড়া। শুধু ছোটবিবি তাকে জড়িয়ে আছে সুন্দরী শুয়োফলের মত। দুলু হল বড়ো বেগমের সন্তান। সে বড়ো বাপ ন্যাওটা। কুলুরও ছেলেটার উপর টান কম নয়। ওই ছেলেই তো তাকে খাওয়াবে, পরাবে। ওই ছেলেই তো তার বুড়ো বয়সের লাঠি, সাহারা। ছেলেকে তাই চোখে চোখে রাখত সে।
