-সাত দিন ধরে অসুক। এখন মদ খাবে? কেমন মানুষ গো তুমার বর। ভাটিখানা মালিকের কপাল কুঁচকে গেল, সব জেনে-শুনে এ পাপ আমি করতে পারবোনি। তুমি ঘুরোন যাও।
–আমি খালি হাতে ঘুরে গেলে সে আর বাঁচবে নি। গঙ্গামণি আঁচলে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠল, দাদা গো, মানুষটারে বাঁচাও। মদ ছাড়া যে মানুষটার একদিনও চলে নি, সে যে সাতদিন ধরে কী ভাবে আচে একবার তার কথাটা ভেবে দেখো।
বাটিতে মদ ঢালতে-ঢালতে ভাটিখানার মালিক বলল, এট্টা কতা ছিল যদি রাখো। মদ আমি দিচ্ছি ঠিকই কিন্তুক মন আমার সায় দিচ্চে নি। শুনেচি-নেশার জিনিস না দিলে পাপ হয়। সে আমার পাপ হোক। তুমি ওরে এক ঝিনুক মেপে মদ দিও। এর বেশি দিও না, আমার মাথার দিব্যি।
গঙ্গামণি সাবু ফোটান দিতে চেয়েছিল ঢুলিরামকে। সে হাত দিয়ে বাটি সরিয়ে দিল অনীহায়, আগে মদ দে বউ। মদের ঘেরাণ শুঁকে মাথা ধরা সারাই।
গঙ্গামণি বাটিটা ধরিয়ে দিলে চুমুক লাগাতে যায় ঢুলিরাম, আঃ, কতদিন পর চেনা ঘেরান পেলাম! পরানটি একেবারে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল রে!
দাঁড়াও ঝিনুক নিয়ে আসি। গঙ্গামণি পা বাড়াল।
পানসে হেসে ঢুলিরাম বিষাদভরা চোখে তাকাল, কেনে রে, আমি কি কোলের খোকা নাকি? নেশার সময় বাধা দিস নে, চটকে যাবে।
দু’ ঢোঁক খেয়েই ঢুলিরামের হাত আলগা হয়ে বাটিটা পড়ে গেল বিছানার উপর। দু’বার হেঁচকি উঠেই ঢেঁকির কাঠের মতো স্থির হয়ে গেল ঢুলিরাম।
চোখ বুজলেই রঘুনাথ যেন গঙ্গামণির কান্না-দৃশ্য দেখতে পায়। মনটা ঘোলা জলের চুনো মাছের মতো ছটফটায়। বেড়ার কাছে এসে সে দেখে দুর্গামণি বসে আছে তালপাতার আসনে, তার সম্মুখে ঠাকুর হয়ে বসে আছে দুলাল। কী ভেবে রঘুনাথ তাদের সামনে দিয়ে গেল না। অবেলায় মাংস দেখে দুলালের মনে সন্দেহ হবে। হাজারটা প্রশ্ন করবে তাকে। তার সব প্রশ্নের উত্তর কি দিতে পারবে রঘুনাথ। সেই কারণে বুক কেঁপে উঠল। পিছন দিক দিয়ে ঘরে ঢুকে রঘুনাথ শুনল, দুর্গামণি বলছে, ইবার যখুন খাটতে যাবে আমারে সাথে করে লিয়ে যেও। রঘুর বাপ যাওয়ার পর থিকে মনটা আমার ভালো নেই। কুনো মতে বেঁচে আছি গো। বারবার মনে হয়-খাটতে না গিয়ে আমি বুঝি অপরাধ করে ফেলেছি।
-সে তুমি যেও। তবে ইখানকার রাঁধাবাড়ি কে করবে? দুলাল আরও কিছু শোনার জন্য হাঁ-করে তাকাল। একটু ভেবে নিয়ে দুর্গামণি বলল, আমার ঘরের রঘুটা সব পারে। দুটা মানুষের ভাত সে কি ফুটিয়ে নিতে পারবে না?
–বেশ পারবে! তাহলে তৈরি থেকো। দুলাল উঠে দাঁড়াল।
কঞ্চির আগাড় সরিয়ে দুলাল চলে যেতেই দুর্গামণি বিড়বিড়িয়ে বলল, মা শীতলাবুড়ি, তুমি আমার মনোকামনা পূরণ করো। ঘরের মানুষটাকে আমি গিয়ে যেন ভালো দেখতে পাই। ওরে ভালো রেখো মা।
.
০৯.
ভালো-মন্দ, থাকা না থাকা সব শীতলাবুড়ির ইচ্ছে। ক’ দিনের গরমে দুমদুম বাষ্প হয়ে যাচ্ছে বুড়িগাঙের জল। পাল খেদিয়ে এখন আর সুখ নেই কারোর। পাঁচ বছর আগে যা সুখ ছিল এখন তা ছিবড়ে। গোরু-মোষ পিছু মুড়ি আর জিরেন-কাট রসের পাটালি দিত মনিব। এখনও দেয় কিন্তু দায়সারা দশা। মন ভরলেও পেট ভরে না। রঘুনাথ হাঁপিয়ে উঠেছে গোরুর পাল খেদাতে গিয়ে। দুর্গামণি তার মনের ছটফটানি লক্ষ্য করে বলল, মাথা গরম করে কুনো লাভ হবে নি। এক কাঠা করে মুড়িই বা কে দেয় এই বাজারে।
সবাই দেবে। ঝাঁঝিয়ে উঠল রঘুনাথ, ভাবছো মুফতে দেয়, তা তো নয়। গোরু চরাতেও মেহনতের দরকার হয়। পাল খেদানো মুখের কতা নয়। এট্টু চোখ সরে গেলে কপালে চরম কষ্ট আচে। গোরু এদিক-ওদিক কেটে পড়লে জান ঢিলা হয়ে যাবে। তখুন বদনামের আর শেষ থাকবেনি।
-কুন কাজটা আরামের বল তো? দুর্গামণি অসন্তুষ্ট চোখে তাকাল।
রঘুনাথ মুখ ভার করে বলল, একাজ বড়ো এক ঘেয়েমীর কাজ। আমি হেঁপসে উঠেচি মা। পাল নিয়ে যেতে হলে তুমরা যাও, আমি আর যাবো না। ওসব আমার ভাল লাগে না।
–তুর কি হয়েছে বল তো? দুর্গামণির গলায় সন্দেহ প্রকট হল, ওই বামুনপাড়ার ছেলেটাই তুর মাথা খেল। বড়গাছে ভাঁড় বাঁধলে চলবে? নাকি তা শোভা দেয়? রঘুনাথ কপাল টিপে ধরল রাগে, তুমার আর বিদেশে খাটতে গিয়ে লাভ নেই।
-তুর বাপ যে গিয়েছে।
–যাক।
–আমি না গেলে ভালো দেকায়? দুর্গামণি কেমন সহজ হয়ে এল, ইবারটা যাই, আর যাবো না। বয়স হচ্চে।
-আমি এট্টা কাজ পেয়ে গেলে আর তুমারে খাটতে দিতাম না।
–ছেলের কথা শুনে হেসে উঠল দুর্গামণি, তুর মনটা বড়ো সাফসুতরো। তুর উপর রাগ করে থাকতি পারি নে।
শেষ পর্যন্ত পরদেশে আর খাটতে গেল না দুর্গামণি।
সাঁঝবেলায় কীর্তন দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল চুনারামের। সে ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখছিল তন্ময় হয়ে। খোল করতালের শব্দ তার কানে যেতেই হুঁশ ফিরে এল। দুপুরবেলা সে কালো সুড়সুড়ি পিঁপড়েদের দল বেঁধে যেতে দেখেছে নিরাপদ আশ্রয়ে। পিঁপড়েগুলোর হাঁটা-চলায় অস্বাভাবিকতা পুরো মাত্রায় লক্ষ্য করেছে সে। সুড়সুড়ি পিঁপড়ে সাধারণত চোখে পড়ে না। কারণ ছাড়া ওই জাতের পিঁপড়েগুলো মানুষের চোখের আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে। সামান্য হলেও চুনারামের বয়স্ক-মন বৃষ্টি হতে পারে এই আশায় পুলকিত হয়ে উঠেছিল। যদি বৃষ্টি হয়–শুধু মানুষ নয়–গাছপালা প্রকৃতি–সাহেবমাঠ-বুড়িগাঙ সব যেন দম ছেড়ে বাঁচবে।
