দুর্গামণির সতর্কবাণী রঘুনাথের হুড়হুড় করে মনে পড়ে গেল। প্রথমে সে ভেবে ছিল এগুলো হয়ত গল্পকথা, কথার কথা। কিন্তু আজ সে যা নিজের চোখে দেখল বাইরে এসে ভাবতে গেলে হিম হয়ে যাবে গা-হাত-পা। রঘুনাথ একবার ভাবল–সে থানায় গিয়ে সব বলে দেবে; পরমুহূর্তে সে বোঝাল নিজেকে। না, ভালো হবে না। কাকাকে ধরিয়ে দিয়ে তার ক্ষতি বইতে লাভ হবে না। হাজার হোক কাকা, দায়ে-আদায়ে পাশে দাঁড়ায়। কাঁধ দেওয়ারও তো লোক দরকার। তাছাড়া নূপুর, নোলক ওদেরকে সে ভুলবে কি করে? ওরা তো কোনো দোষ করেনি। ওরা ফুলের মতো নরম, দিঘির জলের মতো মৃদুভাষী। বাবার পাপে মেয়েরা কেন ভুগবে?
রঘুনাথ মাংস নিয়ে আপনমনে হাঁটছিল। ঢুলিরামের গল্প সে দাদুর মুখে শুনেছে। বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে চোখে জল চলে আসত চুনারামের। মানুষ অতীতের কাছে দাস হয়ে থাকতে ভালোবাসে না। চুনারাম ঢেঁকুর তুলে বলত, আর কুনোদিনও মদ খাবো না। মদ মন খায়, শরীল খায়। আয়ু খায় চিবিয়ে-চিবিয়ে।
ঢুলিরাম নেশায় চুর হয়ে থাকত সব সময়। নেশা করলে তার পা টলত, মাথা টলত, মুখ দিয়ে আজেবাজে কথার চাইতে বেরিয়ে আসত টুসুগান। বেশ রগড়ের লোক ছিল সে। গঙ্গামণি প্রায়ই কেঁদে-কেটে বলত, ছেড়ে দাও গো এই সব্বোনাশী নেশা। নিজের শরীলটাকে দেখবা না? কী হয়েছে তুমার চেহারা! একেবারে ঢিংঢিঙা। মনে হয় ফুঃ দিলে উড়ি যাবা।
এই চেহারায় সাহেবমাঠে কাজ করত সে। হাতে লাঠি, হাঁটুর উপর খাটো ধুতি। ধাবড়া নাক, সরু মুখের কপালে জোঁকের মতো শুয়ে থাকত চিন্তার দাগ। ওগুলো দু-মুখো সাপের মতো টনটন করত প্রায়সময়। বর্ষার সময় দিন পনের জ্বরে পড়েছিল সে। জ্বর ভালো হতেই মাঠে গিয়ে দেখল তার জায়গায় অন্য মুনিষ কাজে লেগেছে। বেকার হয়ে গেল ঢুলিরাম। হাতে পয়সা নেই অথচ নেশা করার শখ আছে। নেশা না করলে তার প্রাকৃতিক কর্ম হত না। কাজ না করলে সংসার চলবে কি করে? চুনারাম আর মুনিরাম বেকার। ঘরে চাল নেই, তেল নেই। মাঠে কাজ নেই। গঙ্গামণি কোনমতে টানছিল সংসার। কোনোদিন কাজ পায়, কোনোদিন আবার কাজ পায় না। একদিন ঢুলিরামই দু-হাত সম্বল করে বেরিয়ে পড়ল ভিক্ষায়। বাঁচতে তো হবে? এই আকাল কবে যে কাটবে শীতলাবুড়ি জানে। ভিক্ষা করা সহজ কাজ নয়। মাত্র পনের দিনেই বুঝে গেল ঢুলিরাম। বামুনপাড়ার মানুষরা বলল, তোমাকে ভিক্ষে দিয়ে কী হবে। চাল বেচে তো তুমি চোলাই খাবে। তার চেয়ে বউরে পাঠাও, তার হাতে আমরা দুমুঠি চাউল তুলে দেব।
গঙ্গামণির সেই সুযোগ আর এল না। একদিন ভিখ মাঙতে গিয়ে গায়ে গরম বাতাস লাগিয়ে বাঁধের ধার থেকে কটরাব্যাঙের মতো ঠিকরে পড়ল ঢুলিরাম। মরেই যেত, শুধু ভাগ্যের জোরে চোখের পাতা তুলে তাকাল। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গেল না সে, কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে বলল, বাপ রে ওখানে গেলি পরে মরে যাবো। কড়া কড়া বড়ি আর ইনজিসিন এ গতর লিতে পারবে নি। তার চেয়ে দেহাতি দাওয়াই ভালো।
বাড়ি ফিরে এসে বার দুয়েক বাহ্যি গেল ঢুলিরাম। বাঁধের গোড়া থেকে তার ফিরে আসার কোনো ক্ষমতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত গঙ্গামণি তাকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে এল। এভাবে সাত দিন কাটল তবু অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। খেজুরপাতার তালাই এ লেপটে গিয়েছে ঢুলিরামের দেহ। চোখের কোল বসা। গাল ঢুকে গিয়েছে শুকনো আমের মতো। ইংরেজি দাবাইয়ের উপর তার কোনো আস্থা নেই, হাসপাতালের কথা উঠলেই সে চিঁ-চিঁ করে বলে, মরি তো এই হলদেপোঁতায় মরব। তুদের হাতে-পায়ে ধরি রে, আমারে আর হাসাপাতালে নিয়ে যাস নে।
ঘরের মানুষটার কাতরতা দেখে গঙ্গামণি পাড়া জাগিয়ে কাঁদে, হা আমার কি হল গো, মানুষটা যে আর বেছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না গো! মা শীতলাবুড়ি, মা গো মা, তুমি আর অতো লিঠুর হয়ো না। মুখ তুলে চাও মা। মুখ তুলে চাও। ঘরের মানুষটারে ভালো করে দাও মা। বুকের অক্ত দিয়ে তুমার ধার শোধ করব। দয়া করো মা, দয়া করো।
-মা’র দয়া হবে নি রে; আমার সময় হয়ে এয়েচে। ঢুলিরামের মাথাটা যেন খেতের তরমুজ, আমার কতা শুন। আমার জন্যি চোলাই কিনে আন ভাটিখানা থিকে। নেশায় আমার মন টনটন করচে।
–বাহ্যি দিয়ে অক্ত ঝরচে, এ সময় কেউ নেশা করে গো? গঙ্গামণির দৃষ্টিতে কাতর প্রশ্ন।
নেতানো ঢোঁক গিলে ঢুলিরাম বলল, আমার শেষইচ্ছেটা পূরণ করি দে বউ। তুর কাছে এ জীবনে আর কিছু চাইব না।
-আমি বউ মানুষ, কী করে চুল্লু ভাঁটিতে যাই বলো? এতদিন গেল, কুনোদিনও যাইনি। আচ আমার বাঁধো ঠেকচে। গঙ্গামণি তার অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিল।
ঢুলিরাম জোর গলায় বলল, তুই যা। আমার হাতে সময় কম।
—যাব যে পয়সা কুথায়?
ঢুলিরাম ফাপড়ে পড়া চোখ মেলে তাকাল, আমার শেষ ইচ্চেটা আর পূরণ হল না। বলেই সে গঙ্গামণির হাতটা ধরল। অমনি সরু লিকলিকে রূপার চুড়ি দুটো সরে গেল কনুইয়ের দিকে, আশায় চকচকিয়ে উঠল মন, এই তো পয়সা পেয়ে গিয়েচি। যা বউ, চুড়ি বেচে আমারে মদ এনে দে। আমি তো সোনাদানা চাইচি নে, সামান্য মদ।
গঙ্গামণি রুপোর চুড়ি বেচে দিল সাকরা দোকানে। টাকা নিয়ে সে দৌড়ে গেল ভাটিখানায়। ব্যস্ত হয়ে বলল, দাদা গো, ঘরে বড়ো বিপদ। ওর জন্যি মদ দাও।
