রঘুনাথ সত্যি-মিথ্যা জানে না। তবে সে জানে যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। চোরাকুঠুরীর মেঝেয় পা রেখে তার শরীরে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছে সে বড়ো বড়ো চোখ মেলে দেখতে চাইল লুলারামকে। দেখতে না পেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডাকল, কাকা, তুমি কুথায়?
-কেন রে, তুর বুঝি ডর লাগে? অন্ধকার থেকে উড়ে এল লুলারামের কণ্ঠস্বর। ভয় জিনিসটা এই বয়সে অপমান। রঘুনাথ নিজেকে সামলে নিল, ভয় পাবো কেনে? আমি তুমার কাছে যেতে চাই। রঘুনাথ নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজে পাবার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পরে আবার একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে লুলারাম সামনে এল। তার দু’হাতে রক্ত দেখে চমকে উঠল রঘুনাথ। লুলারাম সেই রক্তমাখা তর্জনী নিজের মোটা ঠোঁটে চেপে ধরে বলল, চুপ। হল্লা করিস নে। জানাজানি হলে হুজ্জোত বাড়বে!
অতো অক্ত? কী হয়েছে গো কাকা? রঘুনাথ হাঁপাচ্ছিল। সে কিছুটা উত্তেজিত। লুলারাম তাকে শান্ত হতে বলল, ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নাই। এট্টা কালোখাসি ধরে এনেচি মুকামপাড়া থিকে। পণ্ডিত বিলের বেড়ার ধারে চরছিল। দেকে আর লুভ সামলাতে পারলাম না। মনটা টেনে নিয়ে গেল হুড়হুড়িয়ে। ভাবলাম কত্তো দিন মানসো খাইনি। আর খাবো কি করে? খাসিমানসের যা দাম বেড়েচে। লুলারাম কথা থামাল।
রঘুনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলল, তার মানে চুরি করে এনেচো?
–ও কথা বলতে নেই ভাইপো। লুলারাম দাঁত বের করে হাসল, না বলে আনলে শাস্ত্রে বলছে চুরি করা হয়। তবে শাস্ত্রে এ-ও বলচে-চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা। তা আমাকে ধরার মতো কুনো মামু নেই এ-গাঁয়ে। চাইলে যখুন দেবে না তখুন না বলে নিয়ে এলাম। না বলে নিয়ে এলে কুনো দোষ হয় না। বরং মাসের সুয়াদ বাড়ে।
রঘুনাথের মুখে কথা আটকে গেল। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। কাকাকে এ চেহারায় সে কোনোদিন দেখেনি। না দেখলেই বুঝি ভালো হত। লুলারাম বলল, এই ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে তুর অতো না ভাবলেও চলবে। শুন, আমি তুকে কিজন্য ডেকেচি। মন দিয়ে শুন। ঢোঁক গিলে লুলারাম তার রক্ত জড়ানো হাতটা রঘুনাথের কাঁধের উপর রাখল, তুর কুনো ভাই নাই, দাদা নাই। মেয়ে দুটা আর তুই হলি আমার সম্বল। তুকে আমি কিছু গুপ্তবিদ্যে দিয়ে যেতে চাই। বংশের অক্ত ছাড়া তো এসব কাউকে দেওয়া যায় না। ওস্তাদের বারণ আচে। বুঝলি?
রঘুনাথ অন্ধকারে ঘাড় নাড়ল।
লুলারাম উৎসাহ পেয়ে বলল, তুর কচিয়াদাদু চোর ছিল জানিস তো? সে এখুন আর রাত-বেরাতে বেরুতে পারে না। সে আগে ছিল বাঘ, এখুন হয়েছে বুড়াবাঘ। তুই জানিস তো বুড়াবাঘ শিকার ধরতে পারে না। এখুন আমি তাকে শিকার ধরে এনে দিই। তা খেয়ে সে বেঁচে থাকে। আমি না থাকলে বুড়াটা মরে ভূত হয়ে যেত। এ সনসারে কেউ কাউরে দেখবে না। যে যার, তার তার। কপাল চাপড়েও কুনো লাভ নেই। কপাল আমবাতের মতো ফুলবে। তাতে কার লাভ? কারোর নয়। তাই বলছিলাম কি, তুই আমার পথে চলে আয়। আমি তুকে হাতে করে সব শিখিয়ে যাই। এতে আমার স্বার্থ আছে। আমি বুড়া হলে তুই আমাকে শিকার ধরে দিবি। কি রে দিবি তো?
রঘুনাথ হ্যাঁ-না কিছু বলতে পারল না চট করে। অন্ধকারে তার চোখ কুঁকড়ে যাচ্ছিল। শুধু লুলারামের কথাগুলো ছাড়া আর কিছু যেন ঘরের মধ্যে পড়ে নেই। এই অন্ধকার হাতড়ে কি পেতে পারে সে? অন্ধকার শুধু ভয়ের জন্মদাতা। চোরাকুঠুরীতে নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া চামচিকির ডানা ঝাড়ার ব্যস্ত আওয়াজ প্রকটিত হল। লুলারাম অধৈর্য হয়ে বলল, তুর বাপরে আমি পথে আনতে পারলাম না। সে যেটা বুঝবে–সেটাই শেষ কথা। গরিব মানুষের এত গোঁ ভালো দেখায় না। তারে আমি বলেছিলাম আমার সাথে কাজে লেগে পড়তে। সে আমার কতা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। তাতে কার ক্ষতি হয়েছে? গাঁ-ছেড়ে তাকে তো চলে যেতে হল দূর গাঁয়ে খাটতে। এতে কী লাভ হল বলদিনি বেটা।
লাভ-ক্ষতির কথা নয়, গুয়ারাম মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে। একথা ঠিক তার দুবেলা ভাতের জোগাড় হয় না, দুর্গামণিকে ঝোড়-জঙ্গলের শাক-লতা পাতা খুঁজে আনতে হয়, তবু তারা সম্মানের সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, পুলিশ এসে তাদের দরজায় লাথি মারে না, ধমকায় না। রঘুনাথ কাকার মুখের উপর একটা কথাও বলতে পারে না, তার আড়ষ্টতাবোধ হয়, সে পাথরচোখে গিলতে থাকে গুমোটবাধা অন্ধকার।
বিরক্ত লুলারাম উত্তেজিত হল না, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ঠিক আছে, তুই যা ভালো বুঝিস কর। মন চাইলে আসবি না হলি পরে চলি যাবি। সব তুর উপর ছেড়ে দেলাম। লুলারাম আর একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাল, বিব্রত রঘুনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, খাসিটা মেরেচি, মানসো লিয়ে ঘর যা। এই বয়সে একা খেতে পারি নে, দিয়ে খেলে কলজের দম বাড়ে।
প্রায় সের দুয়েক মাংস লুলারাম পাতায় মুড়িয়ে ধরিয়ে দিল রঘুনাথের হাতে, তার সতর্ক চোখ-মুখ, গলা নামিয়ে বলল, তুরে যা বললাম-দু কান যেন না হয়। পেটের কথা বাইরে গেলে বেপদ বাঁধে। কলিকালের মানুষরা ভালো হয় না, ওরা কেউ-কারোর সুখ দেখতে পারে না। তুর-আমার কতা আলাদা, অক্তের সম্পর্ক তো!
রঘুনাথ গুমঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘাম মুছল কপালের। চোরাকুঠুরীর ভেতর কুয়া খুঁড়ে রেখেছে লুলারাম। ললাটবাবুর লেঠেল হওয়ার সুবাদে সেই কুয়ায় খুঁজলে এখন হাড়গোড়ও পাওয়া যাবে। এই কুয়োর খবর গ্রামের অনেক মানুষই জানে না। তবে দুর্গামণির সব নখদর্পণে। সে একদিন কথায় কথায় ঢিলিকে সতর্ক করে বলেছিল, বেঘোরে জানটা কেনে দেবে বুন, চোখ মুদে থাকো, না হলে মানিয়ে নাও। এদের বংশ খুনেবংশ। মদ-মেয়েছেলে নিয়ে ওদের সময় কাটত। আমার শাশুড়ির মুখে গল্প শুনেচি-তার শ্বশুর নাকি মদ খেয়েই চক্ষু মুদল। তোমার বর লুলারে কুনো বিশ্বাস নেই। ও পারে না হেন কাজও নেই। ঝারির জন্যি ও তুমাকে ঝোড়কাটার মতো কেটে চোরাকুঠুরীর কুয়ায় ফেলে দিবে। থানা-পুলিশ পাড়াপড়শি কেউ টের পাবে নি।
