আমি গো কচিয়া দাদু! রঘুনাথ দাঁড়াল।
মুনিরামকে সে কচিয়া দাদু বলে ডাকে। এই সম্বোধন দুর্গামণি তাকে শিখিয়েছে ছোটবেলা থেকে।
-কুথায় যেচিস রে দাদুভাই? মুনিরামের প্রশ্নে রঘুনাথ বলল, কাকা আমাকে ডেকেচে!
-ওঃ। ঠিক আচে যা। সময় পেলে টুকে আসিস। গল্প করব। মুনিরামের কথায় বেদনা ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার সবাই এই মানুষটাকে এড়িয়ে চলতে পারলে খুশি হয়। সবাই জেনে গিয়েছে এই মানুষের দ্বারা কারোর কোনো উপকার হবে না। বুড়ো ঘোড়ার কদর কোনোকালেই ছিল না। এটা ঘোড়ারই দুর্ভাগ্য। রঘুনাথ ওখান থেকে সরে এলেও তার মনে একটা প্রশ্ন দানা বাঁধল। বয়স কি মানুষের সব কেড়ে নেয়? কেন নেয়? পাকা তেঁতুল, পুরনো চাল, এমনকী পুরনো ঘিয়ের কদর এখনো কমেনি। তাহলে মানুষের কেন এ হাল হবে? লুলারাম নিজের বাবাকে কোনো গুরুত্ব দেয় না। সে যে একজন বয়স্ক মানুষ, এ সংসারের মাথা এই বোধ তাকে এখন আর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় না। সে ভাবে–মুনিরাম পৃথিবী ছেড়ে বিদেয় নিলে তার বুঝি রক্ষে। ঝারির সঙ্গে লটরপটর তাহলে জমবে ভালো। ঢিলিকে সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, একটা পাগলীকে এত গুরুত্ব দেবার কোনো অর্থ হয় না। শুধু পথের কাঁটা মুনিরাম সরে গেলেই লুলারাম স্বাধীন, আজাদ পাখি।
নূপুরের সাথে দেখা হল দাওয়ায়। রঘুনাথ কিছু বলার আগেই নূপুর আগ বাড়িয়ে বলল, কুথায় থাকিস রে দাদা? বাবা কত খুঁজল তোকে।
–আমি মানিকডিহি গিয়েচিলাম।
-কেন রে? বাবুদের সাথে বুঝি তুর ভাব জমচে? নূপুর না বুঝেই খোঁচা দিল রঘুনাথকে। রঘুনাথ ম্লান হেসে তাকাল, সূর্যকে চিনিস? ও আমার বন্ধু হয়েছে।
নূপুর অবাক হল না, ভালো কথা। তবে বড়ো মানুষ বড়ো ধড়িবাজ। ওরা যখুন তখুন চোখের পাতা উল্টায়।
–সূর্য অমন নয় রে! রঘুনাথ জোরের সঙ্গে বলল।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নূপুর বলল, ভালো কথা। ভালো হলে দেখতে ভালো লাগে। ঠকতে না হলে আরও ভালো। লুলারামের মাটির ঘরখানা অন্ধকারের আখড়া। এই আঁধারে রহস্য শুয়ে আছে চাদরমুড়ি দিয়ে। এ গাঁয়ের সবাই জানে লুলারামের মাটির ঘরে মা লক্ষ্মীর আনাগোনা আর সেই লক্ষ্মীকে কিভাবে খুশি করতে হয়, পূজা দিতে হয় লুলারামের চাইতে এ গাঁয়ের কেউ বেশি জানে না। এককালে লুলারাম ললাটবাবুর লেঠেল ছিল। ললাটবাবুর অঙ্গুলি হেলনে সে উঠত-বসত। তার নির্দেশে লুলারাম কত নিরীহ মানুষের মাথা ফাটিয়েছে, মেরে অথর্ব করে দিয়েছে তার কোনো গোণা গুণতি নেই। টাকার বিনিময়ে সে পারে না এমন কাজ তার দৃষ্টির মধ্যে নেই। ফলে এখন ও গাঁয়ের মানুষ লুলারামের সামনে বেশি তেড়িবেড়ি করে না। সমঝে চলে। কার মনে কী আছে তা জানতে লুলারাম এখন আগ্রহী নয়। তবে নিজের নামটার উপর তার বড়ো ঘেন্না। প্রায় মুনিরামকে বলে, আর নাম পেলে না খুঁজে! আমি কি লুলা নাকি যার জন্যি আমার নাম লুলা রাখলে?
মুনিরাম কোনো উত্তর দিতে পারে না, ভীতু চোখে তাকায়। যা মেজাজ, বিশ্বাস নেই এই পাষণ্ড ছেলে কখন কি করে ফেলে।
কাঁথ দেওয়ালের পাশ দিয়ে হাত পাঁচেকের চওড়া দাওয়া। সেই দাওয়া মাথায় খড়ের ছাউনি নিয়ে সোজা এগিয়ে গিয়েছে আরও বিশ-বাইশ হাত। দাওয়া যেখানে শেষ হচ্ছে–সেখান থেকে শুরু হচ্ছে আঁধার ঘরে যাওয়ার সরু পথ। বেশি দূর যেতে হল না, সামান্য গিয়েই রঘুনাথ টের পেল একটা অন্ধকার পুরী তাকে হাঁ করে যেন গিলতে আসছে। আলো থাকলে ভালো হত, আলো না এনে ভুল করেছে সে। একবার ভাবল ফিরে গিয়ে নূপুরের কাছ থেকে লম্ফো চেয়ে আনবে। কিন্তু ফস করে দেশলাই জ্বলে উঠতেই সে অবাক চোখে তাকাল। সেই স্বল্প আলোয় রঘুনাথ দেখল লুলারামের হলদে হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো বিকশিত হয়ে পরিতৃপ্তির একটা হাসি উগরে দিচ্ছে। বড়ো জান্তব আর পৈশাচিক হাসি।
রঘুনাথ ভাবছিল এই অন্ধকার কুঠুরীতে লুলারাম কি করছে একা একা। তীব্র গরমে আশপাশ যখন আইঢাই করছে তখন এই গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশে একটা মানুষ একা একা কি করতে পারে ওখানে? চোরাকুঠুরীর গল্প এর আগেও শুনেছে রঘুনাথ কিন্তু কোনোদিনও সাহস করে ওখানে ঢোকার তার স্পর্ধা হয়নি। মুনিরাম, দুর্গামণি মানা করত তাকে। মুনিরাম বলত, দাদুভাই, বিচুটি বনে ঢুকলে যে কুনো সময় ওর জ্বলুনীপাতা গা-গতরে ঘষে যেতে পারে। তখুন চুলকে চুলকে চাকড়া-চাকড়া দাগ হবে সারা গায়ে। সেটা কি ভালো দেখায় দাদুরে! বিচুটি বনের ধারে-কাচে যাস নে। আলো বাতাসে হাত-পা ছড়িয়ে খেল। আন্ধারঘরে মন আন্ধার হয়ে আসে।
গুয়ারামও খুশি হত না রঘুনাথ লুলারামের উঠোনে পা রাখলে। সে বেজার হয়ে বলত, খেলতে মন চায় পাকুড়তলায় চলে যা। কারোর দোরে লাফ-ঝাঁপ খেলা ভালো নয়। সব ঘরেই সব সময় কিছু না কিছু খেলা হয়। সে খেলা ছোটছেলেদের দেকা বারণ।
–কি খেলা বাপ?
–বড়ো হ। বুঝবি? গুয়ারাম এড়িয়ে যেত প্রশ্ন।
এখন রঘুনাথ বড়ো হয়েছে কিনা জানে না তবে চোরাকুঠুরীর অনেক রহস্য গল্প তার কানে এসেছে। ললাটবাবুর সৌজন্যে লুলারাম চোরাকুঠুরীটাকে দিনে দিনে বানিয়ে ফেলেছে গুমঘর। প্রতিশোধ নেওয়ার এমন মনোরম জায়গা আর কোথাও নেই এই গ্রামে। গুমঘরে ধরে এনে কারোর গলা দাবিয়ে দিলে কেউ টের পাবে না। খুন করলেও রক্তের ছিটে নজর এড়িয়ে যাবে। এমনকী আর্ত-চিৎকার হারিয়ে যাবে মাটির দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে। লুলারামের বধ্যভূমি এই চোরাকুঠুরীর গল্পকথা কোনোদিনও শেষ হবার নয়।
