সুবর্ণা গোপালের মুখে চুমু খেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। এখনই ছেলেটার মুখের আদলে ছাপ পড়ে গিয়েছে বাবার, জলছবির মতো নীলকণ্ঠ স্পষ্ট হয়ে উঠবে সময়ের সাথে সাথে। ধাওড়াপাড়ার ধুলোমাটি মেখে সে নীলকণ্ঠ হয়ে ঘুরে বেড়াবে। সুবর্ণা অনেক ভেবে নিয়ে সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, তুমি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারো। নীলকণ্ঠর সম্পত্তিতে তোমারও ভাগ আছে আমি মনে করি। তুমি চাইলে এর অর্ধেক আমি তোমার নামে লিখে দেব।
-টাকা-পয়সা, ধনদৌলত আমার দরকার নেই। ভূষণী ঘাড় দোলাল তীব্র অনীহায়। সুবর্ণা বললেন, ঠিক আছে। তোমার কথা আমার মনে থাকবে। এ পৃথিবীটা গোল, এবং যথেষ্ট ছোট। যদি বেঁচে থাকি তাহলে তোমার সঙ্গে আমার আবার ঠিক দেখা হবে। ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করো। ও তো শুধু তোমার একার ছেলে নয়, ও ছেলে আমারও। সময় পেলে আমি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো। যদিও কালীগঞ্জের বসবাস আমি উঠিয়ে দিয়েছি। পচা সুতোয় কোনো সম্পর্ক বাঁধা যায় না, বাঁধতে গেলে শক্ত ডোর দরকার, নাহলে ছিঁড়ে যায় ভূষণী।
সুবর্ণা চলে গেলে ভূষণী বুক হালকা করে শ্বাস ছাড়ল কিন্তু তার মনের খচখচানিটা কমল না। মাঠবাবু কিসের জন্য তার ছায়া চেয়েছিলেন, যার ঘরে সব সম্পদ গোছানো আছে সে কেন ভিখারি হতে গেল তার মতো দেহাতির কাছে। তাহলে কি ভালোবাসা যুগে যুগে মানুষকে ভিখারি করে দেয়, সময় সেই ধারাকে বয়ে নিয়ে যায় অনন্তকাল।
.
পাকুড়তলা থেকে রঘুনাথ যখন ঘরে ফিরে এল তখন রোদ টং-টং করছে আকাশে। দুর্গামণি মুখ ভার করে বলল, তুর এখন আসার সময় হলো? বাপের স্বভাব নিয়ে গা ঘুরলে কি দিন চলে যাবে? অত বড়ো ছেলে গতর না খাটালে চলবে কি করে?
দুর্গামণি যে বেজায় রেগে আছে এটা বুঝতে পেরে মুখে কুলুপ আঁটল রঘুনাথ। বুকের ভেতর জমে থাকা গল্পগুলো সে এখন আর হালকা করতে চাইল না। ওগুলো তার সুখের স্মৃতি, যদি হারিয়ে যায় অবহেলায় তাহলে সে ভীষণ কষ্ট পাবে। যে জগৎ তার জানা ছিল না, সেই জগৎ-এ সে পা রেখেছে। সেই অনাস্বাদিত বিশ্বকে সে এবার নিজের মতো করে ভালোবাসতে শুরু করবে। সে থমকে দাঁড়াবে না, আরও অনেকে পথ হাঁটতে হবে তাকে। এই প্রস্তুতিতে রঘুনাথ যেন উজ্জীবিত হয়ে উঠল।
ঘরের কাজ করতে করতে দুর্গামণি বলল, তোর কাকা তুকে ডেকেচে। সে ঘরে আচে। তুকে দেকা করতে বলচে। নূপুর এসেছিল। খপর দিয়ে গেল। বলল–ভেষণ দরকার। যা, একবার তার ঘর থিকে ঘুরে আয়।
লুলারামের মাটির দোতলা ঘরখানায় অনেক রহস্য দানা বেঁধে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এ পাড়ার মানুষ গুজব ভালোবাসে, গুজব ছড়াতে পারলে কদমফুলের মতো তাদের মনটা খুশিতে উপচে ওঠে। লুলারাম বরাবরই নিজেকে রহস্যের মোড়কে ঢেকে রাখতে ভালোবাসে, এতে সে এক ধরনের তৃপ্তি পায় যা তাকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।
কঞ্চির বেড়াটা পেরিয়ে এলেই শুরু হয় লুলারামের ঘরের সীমানা। ওর বাবা মুনিরাম গাছের ছায়ায় বসে আছে খাটিয়া পেতে। বসে থাকা ছাড়া ওই বুড়োমানুষটার বুঝি আর কোনো কাজ নেই। বয়স হলে এমনিতেই মানুষ কমজোরী হয়ে পড়ে। তার উপরে যদি শরীরে কোনো অসুখ স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে তাহলে তো আর ভোগান্তির শেষ নেই। কুষ্ঠরোগটা যদিও কোনো রোগ নয় তবুও এর মন ফালাফালা করার প্রভাব অস্বীকার করতে পারে না মুনিরাম। রোগটা ধরা পড়ার পর এই লুলারামই তাকে মোকামপাড়ার বিলের ধারে রেখে আসতে চেয়েছিল। সে যাত্রায় হাতে-পায়ে ধরে কোনোমতে বেঁচে যায় মুনিরাম। বিপদ কাটলেও বিভিন্ন রকমের ফাঁড়া খাঁড়ার মতো তার কপালে ঝুলছে। প্রায়ই থানা থেকে পুলিশের জিপ আসে পাড়ায়। অশ্বত্থতলায় তারা জিপ দাঁড় করিয়ে ভারী বুটের মচমচ শব্দ তুলে ঢুকে আসে গাঁয়ে। লুলারামের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে খিস্তি উগরে দেয় তারা। তখন দরজা খুলতে দেরি হলে আর রক্ষে নেই। দুমদুম লাথি পড়বে কাঠের দরজায়, সেই লাথিতে কেঁপে উঠবে পুরো পাড়া। লুলারাম চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে আসার আগেই থানার মেজবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন, যাক আজও বেঁচে গেলি! যেদিন ধরতে পারব সেদিন মারের চোটে তোর অন্নপ্রাশনের ভাত বের করে ছেড়ে দেব। এই এলাকায় চুরি-ডাকাতি একদম আমি বরদাস্ত করব না।
মুনিরাম হাতজোড় করে কিছু বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেবেন মেজবাবু, চুপ কর হে, তোমাকে আর আদা ছাড়াতে হবে না। বেশি ওকালতি করতে এলে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলের ভাত খাইয়ে দেব।
জেল কী জিনিস তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে মুনিরাম। তাই এখন জেলের কথা শুনলেই তার শরীরটা সিঁটিয়ে যায়। ঢিলি তার স্বামীর কী দোষ বুঝতে পারে না। নূপুর, নোলকের অবস্থাও তথৈবচ। তারা ঘুমচোখে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। এসব তাদের আর ভালো লাগে না। গাঁয়ের মানুষগুলো দিনেরবেলায় তাদের কত কথা শোনায়। সে সব কথা গায়ে ফোসকা ফেলে মনটাকে ঘা করে দেয়। ঢিলি তাদের বোঝায়, মন খারাপ করবি নে। পাপ বাপকে ছাড়ে না। তুর বাপও পার পাবে না।
মুনিরাম গাছের ছায়ায় খাটিয়া পেতে আরাম করছিল চুপচাপ। এখন ওর শরীরটা রোগ আর বয়সে গুটিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বসে থাকলে তাকে এক দলা মাংসের মতো দেখায়। মুনিরামকে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে মুখ তুলে তাকায় সে, কে, কে যায় রে?
