ভূষণীর দিন চলছিল কষ্টে। মাঠের কাজে গতর খাটাতে না গেলে তার দিন চলে না। দুলালকে জমির আলে শুইয়ে দিয়ে সে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। ছেলেটা কাঁদে। সেই কান্নার মধ্যে সে শুনতে পায় নীলকণ্ঠের খিলখিলানো দরাজ হাসি। তখন পরিশ্রমকে আর পরিশ্রম বলে মনে হয় না। মনে হয় সব শ্রমই পুজোর ফুল।
দুলাল বড়ো হয়ে হরিনাথপুরের ধাওড়াপাড়ায় বিয়ে করেছে। ইন্দুর স্বভাব, সাংসারিক টান মন্দ নয়, বরের উপর তার ভালোবাসা অটুট আছে। নিজে না খেয়েও সে দুলালকে খাওয়ায়, সব কাজে সে আগে থাকে, তার বিশ্বাস, প্রথম ঝড়টা যেন আমার গায়ে লাগুক। আমি থাকতে তুমার যেন কুনো ক্ষতি না হয়। মা শীতলাবুড়ির কাছে সে সবসময় এটাই কামনা করে।
দুলাল যখন বছর দশেকের তখন গাঁয়ে-গঞ্জে জোর গুজব, লাখুরিয়া কালীগঞ্জের মানুষ ফিসফিসিয়ে বলছে, এবার খেল জমবে। বড়ো ঘরের পাগলী বউটা ফিরে এসেছে। সে তো খালি হাতে যাবে না। শুনছি সে নাকি বুনোপাড়ার দুলালকে সাথে করে নিয়ে যাবে। দুলাল তার বরের শেষ চিহ্ন। ভূষণী তাকে পেটে ধরলেও তার দাবীর চাইতে সুবর্ণার দাবী কম নয়। কেসটা যদি কেসনগরের কোর্টে ওঠে তাহলে খেল জমবে।
এক টানটান উত্তেজনায় ভূষণী ঘুমোতে পারেনি পরপর সাতদিন। গাঁওবুড়া তাকে বলল, হাওয়া খারাপ দেখচি। ছেলেটারে লিয়ে যেদিকে দু-চোক যায় পেলিয়ে যা। ওই বড়োলোকের বিটির সাথে তুই কি কেস লড়ে পারবি? সে তুর কলজের ধনকে লিতে এয়েচে। এ ছেলের উপর তুর যেমুন টান, তারও তো তেমন থাকবে।
ভূষণী শেকড় ছড়ানো গাছের মতো অনড় অবিচল, কেনে পেলিয়ে যাব? আমি কি চোর না ডাকাত? পেটে ধরা ছেলেটা তো আমার, তুমরা সব সাক্ষী আচো। ওঃ, অতো মাগনা নাকি, চাইলেই মোওয়ার মতো হাতে তুলে দিয়ে দিতে হবে। এদেশে কি বেচার নেই? হলেওবা বড়ো ঘরের বিটি, ওর খেয়াল-খুশিতে কি চাঁদ-সূর্য উঠবে নাকি?
ভূষণী পালাল না, মাটি কামড়ে পড়ে রইল গাঁয়ে। পালালে বছর আটেক আগেই সে পালিয়ে যেত যখন তার যৌবন খুবলানোর জন্য চার খেতে আসা মাছের মতো হামলে পড়েছিল শরীরচাটা মাছ। সেই সময় তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি ভূষণী, লোভের ফাঁদে ডাকপাখির মতো ধরা দেয়নি। নীলকণ্ঠর স্মৃতি আঁকড়ে সে বাঁচতে চেয়েছে বছরের পর বছর। এখন চোখ মুদলে নীলকণ্ঠর গায়ের নিঃশ্বাস তার উদোম বুকে আছড়ে পড়ে, নীলকণ্ঠ তার সরু থুতনি নিয়ে গিয়ে আলতোভাবে ঠুসে ধরেছে বুকের ঢালু জলাশয়ে। এই স্মৃতি, এই অনুভব রক্তে পানকৌড়ি পাখি হয়ে সাঁতার কাটে। মানুষটা রক্ত মাংসের শরীর নিয়ে তার বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। স্বপ্নে এসে কথা বলে। হাসে, শিস দেয়। খুনসুটিতে জাগিয়ে তোলে ভূষণীর ক্ষুধিত শরীর।
ঝুমুরগানের দিন সুবর্ণা রিকশা নিয়ে সোজা চলে এসেছিল হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। তার হাতে একটা নতুন কাপড়, মিষ্টি। দুলালের জন্য জামা-প্যান্ট-খেলনা। অশ্বত্থতলায় রিকশা দাঁড় করিয়ে সুবর্ণা চলে গিয়েছিল ভূষণীর ঘরের দাওয়ায়। ভূষণীকে বলেছিল, আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি বোন। ভয় পেও না, আমি রাক্ষুসী বা ডাইন নই যে তোমার ছেলেটাকে কেড়ে নিয়ে পালাব। তাই যদি আমার মনের ইচ্ছে হত তাহলে আমাকে এখানে আসতে হত না। টাকা ছড়ালে কাক-শকুনের অভাব হয় না। এখন গাঁ-ঘরে শ’টাকায় লেঠেল পাওয়া যায় কিনতে। তোমার ছেলেকে ছলে-বলে কেড়ে নিয়ে যেতে আমার বেশি সময় লাগত না। কিন্তু আমি তা করব না। সেটা আমার ধর্মও নয়। আমি শুধু এসেছি মানুষটার শেষচিহ্ন দেখতে। তোমার ওই ছেলের মধ্যে সে আজও বেঁচে আছে। সুবর্ণা কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, ভূষণীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাকে বসতে বলবে না? ঠিক আছে আমি দাঁড়িয়েই কথা বলছি। ছেলেটাকে একটু নিয়ে এসো। ওকে আমি চোখের দেখা দেখে চলে যাব। তোমার কোনো ভয় নেই। দিনের বেলায় আমি চুরি করতে আসিনি। ওই দেখো আমার রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আজ আমি শহরে ফিরব।
ঝুমুর গানের আসর ভেঙে ছুটে এসেছে মানুষ। সবাই মজা দেখার জন্য উদগ্রীব। এত মানুষের ভিড় ঠেলে সুবর্ণা দুলালকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। ভূষণী মনের জোর ফিরে পেল। দুলালকে নিয়ে এল। সুবর্ণার কোলে তুলে দিয়ে বলল, এই ছেলেই আমাকে মাঠবাবুর কথা ভুলতে দেয় না। কি করে ভুলি? মানুষটা তো রসের জাহাজ। আমাকে সেই জাহাজে চেপিয়ে কুথায় কুথায় নিয়ে গেল। আমার ঘরের মানুষটা চার বছরে আমাকে যা দেয়নি, বাবু আমাকে চারমাসে তা দিয়েছে। আগে আমি শেয়ালকাঁটা গাছের মতো খড়খড়ে ছিলাম, বাবু আমাকে জলোপাতার মতুন নরম আর সোন্দর করেছে।
-এমনিতেই তুমি খুব সুন্দরী। সুবর্ণা মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন কথাটা, তোমার বাবুর নজর ছিল মানতে হবে। সত্যি বলতে কি–তুমি আমাকে সব দিক দিয়ে হারিয়ে দিয়েছ। আমি হেরে গেছি ভূষণী। ওকে আমি দুলাল দিতে পারিনি। শুধু ঘৃণা আর অবহেলা দিয়েছি। আজ বুঝতে পারছি আমার তাচ্ছিল্য অবজ্ঞা ওকে আজ এপথে নিয়ে এসেছে। আমি যদি ওর প্রতি মনোযোগী হতাম, ওকে যদি সামান্য ভালোবাসা দিতাম তাহলে ও খাঁচা ভেঙে পালাত না। আমি যা দিতে পারিনি, তুমি ওকে তাই দিয়েছ ভূষণী। আমার পালিশ করা রূপের চাইতে তোমার আকাড়া চালের লালআউস ভাত ও অনেক তৃপ্তি সহকারে খেয়েছে। আমি হেরে গিয়েছি ভূষণী।
