-ঘর গেলে কি নিদ আসে রে? মন তো মাঠে পড়ে থাকবে। নীলকণ্ঠর কথা জড়িয়ে গেল, সে টলে পড়ল ভূষণীর উপর, আমাকে ধর। ঠেকা দে।
-ঘর যাও বাবু।
–কার জন্য ঘর যাবো বল? সেখানে কে আছে আমার?
–কেনে তুমার বউ!
–তার মুখে লাথি মারি। সে আমার মুখে লাথি মেরে চলে গিয়েছে। চুল চেপে ধরে ডুকরে উঠল নীলকণ্ঠ।
ভূষণী মাতাল মানুষটাকে সামলাতে গিয়ে নিজেই বেসামাল হয়ে পড়ল। নীলকণ্ঠ তাকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ল ঘাসের বিছানায়। ভূষণীর বুকের উপর চড়ে বসেছে সে, আমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিস নে ভূষণী। তুই ফিরিয়ে দিলে আমি মরব। কেউ আমাকে ভালোবাসা দেয়নি, অন্তত তুই আমাকে একটু হলেও ভালোবাসার স্বাদ দে। আমি তোকে ঠকাব না রে, তুই চাইলে আমি সব ফেলে তোকে নিয়ে পালিয়ে যাব।
আখের খেতে আলো আঁধারী আলো, কিছু দূরে দিঘিতে ঢেউ উঠেছে জলের, ছোট ছোট আবেগ ভরা ঢেউগুলো সিঁদিয়ে যাচ্ছে জলের শরীরে আলোড়ন তুলে। ভূষণী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে ঢেউ হল, জল হল, তারপর ভ্রমরবসা শাপলা ফুলের মতো হেসে উঠল খিলখিলিয়ে, কিছু হয়ে গেলে তার দায় তুমি নেবে তো বাবু? ধোঁকা দিবেনি তো?
-বললাম তো চল পালিয়ে যাই এদেশ ছেড়ে। নীলকণ্ঠ বাধাহীনভাবে ঠোঁট ঘষে ভূষণীর লালচে ঠোঁটে।
ভূষণী দু-হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে পুরুষশরীর। তার আধফোঁটা চোখ, মলাটহীন দেহাতি শরীর তিরতির করে কাঁপে, যাব নি গো বাবু যাবনি। এ মাটি ছেড়ে আমি কুথাও যাবনি। ইখানেই বাঁচব, ইখানেই মরব। এত সুখ এই দেশছাড়া আর কুথায় পাবো।
দয়ালের পুরুষক্ষমতা ছিল না যদিও সে সুপুরুষ তবু সে ফসল ফলানোর চাষি নয়। মাত্র তিন মাসেই ভূষণী টের পেয়ে গেল সে মা হতে চলেছে। নীলকণ্ঠ দয়ালকে আগোলদারের কাজ পাইয়ে দিয়েছে সাহেবমাঠে। রাতে সে ঘরে থাকে না। পাঁচ হাত লাঠি বাগিয়ে চলে যায় খেত আগলাতে। তার গলার স্বরে বাতাস কাঁপে, ভুই কাঁপে। মাঠ জেগে ওঠে সেই অসুর শব্দে। ঘরে বসে ভুষণী সব শুনতে পায়, নীলকণ্ঠর অপেক্ষায় তার দু-চোখের পাতা এক হয় না, শরীরের নেশাটা গুড়মদের মতো চাগান দেয়, নীলকণ্ঠ এসে তার নেশাকে চূর্ণ করে মোকামপাড়ার বিলপথে ফিরে যায়।
একদিন দয়ালের চোখে ধরা পড়ে গেল ওরা। সেদিন নেশার ঘোরে মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে ফেলল দয়াল। পুরো পাড়া জাগিয়ে দয়াল ঠুকরে উঠল, পালা আমার ঘর থিকে পালা। নাহলে চুলের মুঠি ধরে তুরে আমি ঘর থিকে ছুঁড়ে বুড়িগাঙের জলে ভেসিয়ে দেব। কাক-শকুনে খাক তুর যৌবন। তুর এত রূপের গরব। মরবি। মরবি। মরবি।
নীলকণ্ঠ চুপচাপ চলে গেলেও তার ভেতরে অপমানের তুষআগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল। সেই আগুন সময়ের প্রশ্রয়ে বেড়ে দাবানলের সৃষ্টি করল। এক মাসের মধ্যে দয়ালের লাশ পড়ে থাকল খেতের আলে। সাত মাসের পেট নিয়ে ভূষণী কাঁদল অঝোর ধারায়। সে চায়নি দয়াল ঝরে যাক তেঁতুলফুলের মতো।
এসব খবর সুবর্ণার কানে পৌঁছে গিয়েছিল লোক মারফত। তাছাড়া এই মুখরোচক সংবাদ নিয়ে চোত-গাজনে বোলান বাঁধল বারোয়ারি পাড়ার দল। তাতে নীলকণ্ঠ আর ভূষণীর প্রেমকাহিনি পেয়েছিল প্রাধান্য। দয়ালের অস্বাভাবিক মৃত্যুটাকে গ্রামের মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। ঈর্ষায় কালো হয়ে গিয়েছিল সুবর্ণার ফর্সা মুখ। প্রায় মাসের উপর তিনি ঘরের বাইরে বেরতে পারেননি লজ্জায়। নীলকণ্ঠ তাকে এভাবে হারিয়ে দেবে, তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। ভূষণী কি তাহলে তার চাইতেও সুন্দরী? হতে পারে। তাকে একবার চোখে দেখা দরকার। শত্রুকে অত সহজে ছেড়ে দেওয়া নয়। লোকে দুধ-কলা দিয়ে বিষধর সাপ পোষে। আবার সেই সাপের ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। হিসাব চুকিয়ে না দিলেই সুদে-আসলে বাড়বে। শহরের জলবায়ু সুবর্ণাকে এত বড়ো করেছে। তিনি হেরে যাবেন ওই অশিক্ষিত ভূষণীর কাছে? হতে পারে না, কখনো হতে পারে না। বদলা তিনি নেবেনই, যে করেই হোক। নীলকণ্ঠকে তিনি ছেড়ে দেবেন না। কত ধানে কত চাল হয় এই হিসাব তিনি বুঝিয়ে ছাড়বেন।
সুবর্ণার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন তিনি তিন দিনের ছুটি নিয়ে। মাঠের কাজে দায়িত্ব অনেক, ছুটিছাটা পাওয়া যায় না। অথচ তার ছুটি হয়ে গেল। মাসের পর মাস পেরিয়ে গেল তবু নীলকণ্ঠর দেখা নেই। ভূষণীর প্রতিক্ষারত চোখ পথ দেখতে দেখতে আমড়ার আঁটির চেয়েও কঠিন হয়ে গেল। তবু নীলকণ্ঠ শহর থেকে ফিরলেন না। গ্রামের মানুষ বলতে লাগল মানুষটাকে ওর শালারা গুন্ডা লাগিয়ে মেরে ফেলেছে। তারপর খড়ে নদীর চরে পুঁতে ফেলেছে।
কথাটার সত্যতা ভূষণী এখনও পায়নি। নীলকণ্ঠ মারা গিয়েছে কিনা সে জানে না। নীলকণ্ঠ বেঁচে আছেন এ বিষয়ে সে নিশ্চিত। তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দুলালের মধ্যে জলছবির মতো ফুটে উঠছে। দুলাল তাই ধাওড়াপাড়ার কারোর মতো দেখতে নয়। তার খাটো চেহারায় আভিজাত্য হ্যাজাকের আলোর মতো তাপ ছড়ায়। ভূষণীর দুচোখ জড়িয়ে যায় কান্নায়। ওই মানুষটা তাকে সত্যি সত্যি সুখ দিয়েছিল, কোনোদিনও সে অস্বীকার করেনি এই সম্পর্ককে। সবসময় ভূষণীকে বুকে জড়িয়ে বলেছে, তুই আর কারোর নোস। তুই আমার। শুধু আমার।
নীলকণ্ঠ নিরুদ্দেশ হওয়ার পরে সুবর্ণা আর কালীগঞ্জে থাকলেন না। কিসের মোহে এখানে পড়ে থাকবেন তিনি? পুরুষের টান সরে গেলে নারী তো ভাটার নদী। এই সত্য ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন সুবর্ণা। যত দিন গেল; তত তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। একদিন জমিজমা পুকুর এমনকী দোতলা বাড়িটা বিক্রি করে কৃষ্ণনগরে চলে গেলেন।
