এত টাকা কোথা থেকে আসবে দুলাল ভেবে পেল না। তার ভাগ্যটাই ছোট থেকে পোকায় কাটা। ভূষণী তার জন্মদাত্রী মা কিন্তু এই মাকে সে কি কোনোদিন ক্ষমা করতে পেরেছে? নাকি ক্ষমা করা যায়?
ধাওড়াপাড়ার সবাই জানে দুলালের বাপ দয়াল কেমন মাটির মানুষ ছিল। তার ভালোমানুষীর পুরস্কার সে পেয়ে গিয়েছে। ভূষণীকে মন দেওয়ার পর থেকে সে পাগল হয়ে গিয়েছিল ড্যাং-ডেঙে বাস্তুতলার মেয়েটার জন্য। ভাদু পরবে ভূষণী নজর কেড়েছিল তার, ডুরে শাড়ি পরে ঝকঝকে আলোয় ভূষণী যেন বিয়ে বাড়ির ঝাড়বাতি। ভাদু পরবের মেলায় ওদের আলাপ হল, সেই আলাপ গড়িয়ে গেল পুতুলনাচের আসর অবধি। লায়লা-মজুনর পালা দেখে মজনুর জন্য চোখের জল ফেলেছিল ভূষণী, তার কাঁচা মনের পরিচয় দিয়ে বলেছিল, আমারে লিয়ে পেলিয়ে চলো, তুমারে ছাড়া আমি আর থাকতে পারচি নে। এর চেয়ে বেশি ব্যথা দিলে মরে যাবো গো। ভাদুপরবে আলাপ, তার দু-মাস পরে ভূষণীর হাত ধরে গাঁয়ে ঢুকেছিল দয়াল। মেয়েমানুষের রূপ দেখে সেদিন হাঁ হয়ে গিয়েছিল গাঁয়ের মানুষ, কেউ কোনো বিরুদ্ধ রা কাড়ার সাহস দেখাল না। সবাই আড়ালে আবডালে বলল, দয়ালটার বউভাগ্য চকচকে তবে দেখো কতদিন এই সোনা গরিবের ঘরে চকচকায়। মেয়েমানুষ বুড়িগাঙের জলের মতোন, আজ এখানে কাল সিখানে। এরা কোকিলা পাখির মতোন স্থিতু হতে জানে না, শুধু এ-ডালে সে-ডালে উড়ে বেড়ায়। বিয়ের হলুদ ফিকে হতেই দয়াল সকাল হলেই ছুটে যেত জনমজুর খাটার জন্য। না খাটলে পয়সা দেবে কে? মুখ দেখে তো কামাই হয় না। এভাবেই অভাবের সংসার চলছিল গড়িয়ে গড়িয়ে। তিন বছর পেরিয়ে গেল বিয়ের তবু ভূষণীর গতর ভারী হল না। পাড়ার বউরা তাকে পাকুড়তলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে বোঝাল, কিরে ভূষণী, এক বেছানায় নিদ যাস তো? তোর বরটা কেমুন রে, এখনও কুনো ফল দিল না। ফুল হবে না, ফল হবে না শুধু শুখাগাছ নিয়ে কী লাভ?
সেই থেকে চিন্তাটা মাথায় ফুট কাটছিল ভূষণীর। কত রাত যে ভোর হল তবু সেই রাতের ফসল শরীরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করল না। তাহলে কি তার শরীরটা খরার মাটি, দানা ছড়ালেও ফসল ফলে না? কপালে চিন্তার ভাঁজ, ভূষণী রাতে ঘুমাতে পারে না। নাগরা বাজিয়ে দয়াল ফেরে অনেক রাতে, ফিরেই সে ভূষণীর উষ্ণতা চায়। ভূষণী মুখ ঝামটায়, যাও গান-বাজনা নিয়ে মেতে থাকো গে, আমাকে দেখার তুমার সময় কুথায়। ভাবছি-কাল থিকে আমি তুমার সাথে কাজে যাব। ঘরে আমার মন ধরে না। সময় শিল-নোড়ার মতো বুকের উপর চেপে বসে।
সাহেব মাঠে তখন কাজ চলছে, আখ ঝোরার কাজ। আখ কেটে আলসে সাফসুতরো করে আঁটি বাঁধা। মিল কোম্পানীর ট্রাক্টর এসে নিয়ে যাবে। মিলবাবু নীলকণ্ঠ কাজ দেখাশোনা করে মন দিয়ে। মুনিষ যাতে কাজে ফাঁকি না দেয় সেইজন্য তিনি আলের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কালীগঞ্জ বাজারে তার কোঠাদালান, ঘরে রূপসী বউ সুবর্ণা। বউ রূপসী বলে সংসারে খিটিমিটি লেগে আছে। নীলকণ্ঠবাবুকে সুবর্ণা পাত্তা দিতে চান না, জুতোর শুকতলা বানিয়ে রাখতে চান। নীলকণ্ঠবাবু মেনে নিতে পারেন না এই অত্যাচার। সুবর্ণাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে বলেন, তোমার মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। যাও না কদিন বাবার কাছ থেকে ঘুরে আসো।
সুবর্ণা ভ্রূ-কুঁচকে তাকাল, আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো? যদি যাই তাহলে আর আসব না। পায়ে ধরে ডাকলেও আসব না। আমার বাবা-দাদার সাধ্য আছে আমাকে বসে খাওয়ানোর।
সুবর্ণা মনের জ্বালা মেটাতে চলে গেলেন। বড়ো একা হয়ে গেলেন নীলকণ্ঠ। ঘরে মদ খেতেন গলা পর্যন্ত। সুবর্ণার অনুপস্থিতি রুক্ষ করে তুলত তার মেজাজ। যত দিন গেল শরীরের ক্ষিদেটা পদ্মানদীর জলের মতো ফুঁসতে লাগল। সুবর্ণাকে চিঠি লিখলেন তিনি, ফিরে এসো। যা হবার হয়েছে। আমি আর পারছি না।
সুবর্ণা এলেন না, জেদ ধবে থাকলেন শহরের মাটিতে।
মিল কোম্পানীর কাজে কামাই করা পছন্দ করেন না নীলকণ্ঠবাবু। রোজ সাইকেল নিয়ে তিনি মাঠে যাবেনই যাবেন। সেদিন কাজ হচ্ছিল পশ্চিমধারের আখক্ষেতে। দয়াল আসেনি, কোন গাঁয়ে তার কীর্তন আছে, সেখানে তাকে ঝাল করতাল বাজাতে হবে। খোলওয়ালা না এলে গলায় ঝুলিয়ে নিতে হবে পোড়ামাটির খোল। সব বাদ্যযন্ত্র দয়ালের হাতে পড়লে পোষা বেড়াল। দয়ালও বাজায় খুব নিষ্ঠা সহকারে। শরীর নিংড়ে সুর বের করে।
ভূষণী আখের ভূঁইয়ে কাজ করছিল। আলের উপর দাঁড়িয়ে ভূষণীর যৌবন দেখছিল নীলকণ্ঠ। একটু আগে সে নেশা করেছে, ফলে ঘোর ঘোর দৃষ্টি। ভূষণীর শরীরের বাঁধন গঙ্গামাটির মতন ঢিলেঢালা নয়, বরং ওর শরীরের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে পুরুষের নোঙর করা মন। সুবর্ণার এত অহঙ্কার কিসের? ওর গায়ের চামড়া ফর্সা বলেই কি? যতই ফর্সা হোক সুবর্ণা, ভূষণীর কাছে সেই রঙ চুনকাম করা দেওয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। ভূষণীর মাজা রঙে লালিত্য মাগুরমাছের ত্বককেও হারিয়ে দিচ্ছে। ও হাসলে বাবলাগাছে ঝুমা ঝুমা ফুল ফুটে ওঠে অজস্র। আর সেই হলুদফুল বাড়িয়ে দিচ্ছে রোদের নম্রতা। নীলকণ্ঠ ভূষণীর দিকে কাঁপা চোখে তাকিয়ে ধরা পড়ে গেল। ভূষণী হাসতে হাসতে বলল, বাবু, তুমার লিখা হয়েছে গো। যাও, ঝটপট ঘর চলি যাও। ঘর গিয়ে মাথায় ঠাণ্ডা তেল জেবড়ে আরামে নিদ যাও। আর রোদে রোদে ঘুরোনি।
