নীলাক্ষ চলে যাওয়ার পরও হাঁটতে পারছিল না সূর্যাক্ষ। এলোমেলো কথাগুলো বিষাক্ত পোকার মতো দংশন করছে মাথার ভেতর। এত বয়স হল তবু মানুষটার কোনো রুচিবোধ জন্মাল না। একটা সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব তার ভেতরে ঘোলা জলের মতো বিরাজমান। কপোতাক্ষর সঙ্গে এই প্রবীণ মানুষটির কত অমিল। চিন্তাভাবনায়, মন মানসিকতায় দু’জন দুই মেরুর বাসিন্দা। কপাল টিপে দূরের বাঁধের দিকে তাকাল সূর্যাক্ষ। রঘুনাথকে আর এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। রোদের মধ্যে একলা হেঁটে যাচ্ছে রঘুনাথ। সূর্যাক্ষ ভাবল-কপোতাক্ষ কি ওদের মাথায় ছাতা হতে পারবেন?
.
০৮.
অশ্বত্থতলায় ভিড় লেগে থাকে সবসময়। পাড়ায় বউ-ঝিরা এসময় জল আনতে যায় বুড়িগাঙে। কেউ কেউ প্রাতঃকৃত্য সেরে গা ধুয়ে ঘরে ফেরে। এই বুড়িগাঙ আছে বলে অনেকের ভরসা। স্রোত থেমে গেছে, তবু তো গাঙ। বর্ষায় এর দাপট দেখলে ভয় হয়, পিলে চমকে যাবার উপক্রম। দুর্গামণি একবার ভরা বর্ষায় ভেসে যাচ্ছিল স্রোতের তোড়ে। দুলাল ডিঙা নিয়ে গিয়ে তাকে বাঁচায়। তা যদি না হত তাহলে একেবারে মানিকডিহির গাঙে গিয়ে পড়ত দুর্গামণি। ওখানে জলের স্রেত মুখে গাঁজরা নিয়ে ছোটে। বড়ো বড়ো নৌকা পারাপার হয় সব সময়। কেননা নতুনগ্রাম যেতে হলে এ জল পেরতে হবে সবসময়।
রঘুনাথ পাকুড়তলায় এসে দাঁড়াল। একটা ঘোরের মধ্যে কতগুলো ঘন্টা তার কেটে গেল। সেই আচ্ছন্নতা এখনও হেমন্তের শিশিরের মতো তাকে লেপটে আছে। ঘটনাগুলো ভিড় করে একের পর এক মনে আসছে, আর অমনি তার মনের ভেতরে এক বিরাট পরিবর্তন, বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। এসব অনুভব সে তার মাকেও বলে বোঝাতে পারবে না। দুর্গামণির এত বোঝার ক্ষমতা কোথায়? তার সরল সাদাসিধে মন তো পাকা আতার মতো, একটু চাপ দিলে ভেঙে যায়।
রঘুনাথ দুলালকে দেখতে পেয়ে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেল, কাকা, তুমার সাথে দাদুর কি দেকা হয়েছে? দাদু তুমাকে পাগলের মতোন খুঁজছিলো।
-আমি খপর পেয়েছি ভাইপো, কিন্তু এখুনো তার সাথে আমার দেখা হয়নি। মেয়েটাকে লিয়ে আমার এখুন মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলদশা। বিয়ের এত বছর পরে জামাই আবার সাইকিল চাইচে। কুথায় পাবো ভাইপো, তুই তো আমার অবস্থা লিজের চোক্ষে দেকচিস!
রঘুনাথ সমব্যথীর চোখে তাকাল। সহসা তার মনে পড়ে গেল কপোতাক্ষর কথা। ওই মানুষটা পারেন এই বিপদ থেকে দুলালকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কী ভেবে রঘুনাথ কোনো কথা বলার উৎসাহবোধ করল না। সে অস্ফুটে প্রশ্ন করল, কাকা, বাবা কেমুন আচে? তার খপর সব ভালো তো?
গুয়ারামের জন্য রঘুনাথের মনটা মাঝে মাঝে উতলা হয়ে ওঠে, ঝড়ে নুইয়ে যাওয়া ধানচারার মতো অবস্থা তখন। দুর্গামণি চুনারামের সামনে গুয়ারামের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে না, মনটা কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকে, সংকোচ হয়। একসময় তার মনে হয় মানুষটার সঙ্গে গেলে বুঝি ভালো হত। তাহলে এত চিন্তা মনটাকে খুবলে খেত না। কদিন থেকে গুয়ারামের স্বপ্ন দেখছে দুর্গামণি। না জানি কেমন আছে সে। দুলালের সঙ্গে দেখা হলে ভালো হত। দুলালের আসার সংবাদ সে পেয়েছে কিন্তু তার দর্শন সে এখনও পায়নি। দুলালকে খবর পাঠিয়েছে চুনারাম। সময় বের করে সে নিশ্চয়ই আসবে, কথাবার্তা হবে। গুয়ারাম চুনারামের একমাত্র লাঠি যা শেষ বয়েসে হাত ধরে তাকে অনেকটা পথ নিয়ে যাবে।
দুলাল একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল বাতাসে, তোর বাপের খপর ভালোই তবে সে মাঝখানে জ্বরজ্বালায় ভুগল। ওদিককার হাওয়া-বাতাস ভালো নয়রে। গায়ে সয়ে যেতে টেইম লাগবে। তাছাড়া জল বদলের সাথে সাথে মানুষের মনও বদল হয়। জলবদল মানিয়ে নিলেও মনবদল মানিয়ে নিতে সময় লাগে।
-এখুন কেমুন আচে সে? রঘুনাথের চোখে উৎকণ্ঠা গড়িয়ে পড়ল।
-বললাম তো ভালো আচে। চিন্তার কুনো কারণ নেই। দুলাল এত জোর দিয়ে কথাগুলো বলল যেন সে এই প্রশ্নে কিছুটা বিরক্ত।
-তুমি কবে যাবে গো, কাকা?
–দেকি কবে ও দেশের মাটি টানে! ফ্যাকাসে হাসি দুলালের ঠোঁটে ঝুলে রইল, মাটি না টানলে কিছু হবার নয়। মানুষের কি সাধ্যি মাটিকে এড়িয়ে চলে।
দুলাল হঠাৎ-ই যেন দার্শনিক হয়ে গেল।
রঘুনাথ বলল, কাকা, একবার সময় হলে ঘরের দিকে এসো। মা’র সাথে দেকা করে যেও। দাদুও খুব চিন্তায় আচে।
দুলাল রঘুনাথের কথাকে পাত্তা দিল না, পোড়া বিড়িটা ধুলোর ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সে বেজার মুখে বলল, আমারও মনটা ভালো নেই ভাইপো। মেয়েটার জন্যি ভারী চিন্তা হচ্চে। জামাই বাছাধনকে আমার বিশ্বেস নেই। কখন মেয়েটার কী ক্ষতি করে ফেলে! যা যুগ পড়েচে, এখুন কুনো ক্ষতি হয়ে গেলে পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই।
কাজ কামাই করে ঘর আগলে পড়ে আছে দুলাল। ইন্দুবালারও মন সায় দিচ্ছে না কাজে যাওয়ার। বিন্দু তাদের একমাত্র সন্তান। ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসলে সারা জীবন পথে বসে কাঁদতে হবে। তখন চোখের জল মুছিয়ে দিতে কেউ আসবে না। জামাই শ্রীকান্ত বিন্দুকে বড়ো জ্বালায়, খোঁটা দেয় গরীবিয়ানার। বিন্দু এসব সহ্য করতে পারে না, সে অঝোর নয়নে কাঁদে। শ্বশুরঘরে তার চোখের জল মুছিয়ে দেবার কেউ নেই। বিন্দুর এই বিবশতার সুযোগ নিতে চায় শ্রীকান্ত। সে ধাওড়াপাড়া ছেড়ে পালিয়ে যায় শহরে। ওখানে নাকি ওর বন্ধু থাকে। শ্রীকান্তর কথাবার্তা সন্দেহজনক। চালচলনও ভালো লাগছে না বিন্দুর। মানুষটা নিশ্চয়ই খারাপ মানুষের খপ্পরে পড়েছে নাহলে থানা থেকে পুলিশ কেন আসবে তার খোঁজে? পুলিশ আসার পর থেকে শ্রীকান্ত পলাতক। তার নাকি এখন প্রচুর টাকার দরকার। টাকা হলে কেস সব মিটে যাবে, সে আবার মাথা উঁচু করে গ্রামে ফিরতে পারবে, পুলিশও তার পিছু ছেড়ে দেবে।
