বিলের জল সোজা কোমর দুলিয়ে নাচের মুদ্রায় চলে গিয়েছে জগৎখালি বাঁধ বরাবর। একটা সুইচ-গেট আছে জল এদিক-ওদিক যাবার জন্য। বর্ষায় বিল ভরে গেলে বাঁধের পাহারাদার চাবি ঘুরিয়ে গেট খুলে দেয়। জল তখন ছুটতে থাকে কমলাবেড়িয়ার দিকে। এখন রোদ গায়ে মেখে জলো শ্যাওলা বুকে নিয়ে জল চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আকাশমুখো। নাকছাবির চেয়েও সুন্দর ঘেসো ফুল জড়িয়ে ধরেছে জলের কোমর। কনে সাজানোর মতো যেন সেজে উঠেছে পুরো পণ্ডিত বিল। একবার দেখলে তার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় না।
বেশির ভাগ দিন এ পথ দিয়ে গেলে সাইকেলে বসতে চায় না দ্বীপী। সূর্যাক্ষ কিছু বললে ভ্রূ তুলে তাকায়, এত জল এ তল্লাটে এ সময় আর কোথাও নেই। জলের পাশে হাঁটতে আমার ভালো লাগে, যদিও মা বলে আমার নাকি জলে ফাড়া।
সূর্যাক্ষ সকৌতুক হাসে, তুই এসব বিশ্বেস করিস? অমলকান্তি স্যার বলছিলেন গ্রামে বিজ্ঞান সচেতনতার উপর ঘরোয়া একটা অনুষ্ঠান করবেন। আমি বললাম হলদিপোঁতায় করলে কেমন হয়? স্যার ভেবে দেখছেন।
–অমলকান্তি স্যার মনে হয় খুব রাগী। দ্বীপী মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করল, স্যার বলছিলেন আমাদের ভারতবর্ষের অনেক মানুষই নাকি এখনও পেট পুরে খেতে পায় না।
তোর কোনো সন্দেহ আছে? সূর্যাক্ষ দ্বীপীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। বাঁধের কাছে এসে সূর্যাক্ষ মন খারাপ করে বলল, এবার আমাকে ঘরে ফিরতে হবে রঘু, তুই এবার একা চলে যা। যদি সময় পাই বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করব। আর হ্যাঁ, শোন কোনো দরকার হলে তুই আমাকে অবশ্যই বলবি। সবসময় ভাববি আমি তোর পাশে আছি।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই সূর্যাক্ষ ফিরে যাচ্ছিল সাইকেল নিয়ে। সেই সময় হঠাৎ মাঠ থেকে ধুতি পরা অবস্থায় উঠে এলেন নীলাক্ষ। রঘুনাথের দিকে তর্জনী উঠিয়ে বললেন, ওই বুনোদের ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো? জানো কি ওর স্বভাব-চরিত্র ভালো নয়। কাল আমার মুখে মুখে তর্ক করছিল পুকুরপাড়ে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, পেটে কালির আঁচড় নেই, কত আর ভদ্র হবে। সূর্যাক্ষ কি জবাব দেবে ভাবছিল। নীলাক্ষ তড়িঘড়ি করে বললেন, ওর সাথে মিশবে না। ওদের সঙ্গে যদি সম্পর্ক রাখতে হয় তাহলে দূর থেকে রাখবে। উপর উপর হ্যাঁ-হুঁ বলে ছেড়ে দেবে। তোমার বাবার মতো আবার গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ো না।
সূর্যাক্ষ বিরক্তি হজম করে তাকাল। কপোতাক্ষর অপমান তার গায়ে ফোসকা ফেলে। অমলকান্তি স্যার তার বাবাকে দেবতার চোখে দেখেন। অথচ তার নিজের দাদা ছোটভাইকে হেয় করছে। এদের যে কী বিচার সঠিক বুঝতে পারে না সূর্যাক্ষ। সে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ততা তৈরি করল, জেঠু, আমি এখন যাই। আমাকে আবার স্কুল যেতে হবে। সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল সূর্যাক্ষ, আর তখনই নীলাক্ষর গলা ফাঁকা জায়গায় গমগমিয়ে উঠল, শোন তোমার এবার কোন ক্লাস হলো?
ঘাড় ঘুরিয়ে পাংশু মুখে সূর্যাক্ষ জবাব দিল, ক্লাস টেন।
–বেশ, বেশ। মাথা দোলালেন নীলাক্ষ, কপালে অবাঞ্ছিত ভাঁজ, শোন, যে কথা বলার জন্য তোমাকে আটকে দিলাম। ওই যে শিব মন্দিরের পুরোহিতটা, কী যেন নাম, ওঃ মনে পড়েছে দেবোত্তর ঠাকুর, ওর মেয়েটার সাথে বেশি মিশবে না। আমি শুনেছি তোমার নাকি ওদের বাড়িতে যাতায়াত বেড়েছে। এটা ভালো কথা নয়। গ্রামে থাকি। সব কথা আমার কানে আসে। তুমি আমাদের বংশের ছেলে। আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়।
খুব অসহায়ভাবে সূর্যাক্ষ বলল, দ্বীপী আমার সঙ্গে পড়ে। ও তো সায়েন্স নিয়েছে। আমার চাইতে পড়াশোনায় ভালো। আমরা দুজনে একসঙ্গে অঙ্ক করি।
-কেন তোমার বাবা কি তোমাকে মাস্টার দিতে পারেনি? ঝাঁঝালো গলায় অবজ্ঞা মিশল নীলাক্ষর।
সূর্যাক্ষ পরিস্থিতিকে সামাল দেবার জন্য বলল, না তা নয়। বাবা টিউশনি দিতে চেয়েছিল আমারই সময় হয় না। এতদূর থেকে কালীগঞ্জে গিয়ে টিউশানি পড়া পোষায় না। যাওয়া-আসায় অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।
-তা ঠিক তবে পড়াশোনার প্রতি আরও যত্নশীল হও। তোমার দাদা রুদ্র সেন্ট পল’এ ভর্তি হয়েছে একথা কি তুমি জানো? সন্তান গর্বে নীলাক্ষর চোখ-মুখ ঝকঝকিয়ে উঠল, রুদ্রের মতো ছেলে এ গ্রামে আর একটিও নেই। তুমি চেষ্টা করো দাদাকে ছাপিয়ে যাওয়ার।
–আমার স্মৃতিশক্তি কম।
-বেশি ঘোরাঘুরি না করলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে। মনটাকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করো। দেখবে তাহলে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। নীলাক্ষ জ্ঞান দেবার ভঙ্গিতে বললেন কথাগুলো। অসহিষ্ণু সূর্যাক্ষ অস্থির হয়ে বলল, জেঠু, এবার আমি যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
যাও, তবে ওই পুরোহিতের মেয়েটাকে সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে যাবে না। মনে রাখবে তুমি ওর সহপাঠী, ওর চাকর নও।
মুখটায় হঠাৎ কেউ বুঝি ছিটিয়ে দিল দোয়াত ভর্তি কালি, সূর্যাক্ষ কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল নিজের কালিমায় ভরা মুখের কথা চিন্তা করে।
নীলাক্ষর আরও কিছু বলার ছিল। তিনি এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন সূর্যাক্ষের কাছে। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তিতির বেলডাঙা কলেজে পড়তে যায়। ওর কলেজ যেতে খুব আগ্রহ। আমি শুনেছি কালীগঞ্জের একটা ছেলে ওর পেছনে লেগেছে। ও তোমার দিদি হয়। একটু খেয়াল রেখো। কোনো খবর থাকলে আমার কাছে গোপন করবে না। থানার ও.সি. আমার বন্ধু। আমি ভাবছি বেণীমাধবকে দিয়ে ছেলেটাকে একটু টাইট দিতে হবে। ঘি আর আগুনের কারবার। বলা যায় না তো কখন বিপদ ঘটে যায়!
