দ্বীপী ঘরে এসে একটা কাঠের টুল টেনে নিয়ে ওদের মুখোমুখি বসল। খাওয়া থামিয়ে রঘুনাথ বলল, একদিন আমাদের ঘরে এসোখন। আমার মার সাথে তুমার আলাপ করিয়ে দেবখন। তুমারে দেখলে মা ভেষণ খুশি হবে। মা তুমার মতন সোন্দর মেয়েছেলে কুনোদিন দেকেনি।
সুতলি দড়ি দিয়ে টাঙানো ছিল দ্বীপীর ঘরের তিনটে জানলার পর্দা। ছাপা শাড়ি কেটে বানানো পর্দাগুলোর রঙ জ্বলে গেছে রোদ-হাওয়ায়, তবু বাতাস এলে ওগুলোই ফড়ফড়িয়ে ওড়ে, ঝলকে-ঝলকে আলো ঢুকে আসে বিনা বাধায়, মন্দ লাগে না দেখতে।
শিবমন্দিরের একমাত্র পুরোহিত হিসাবে বেশ নাম ডাক আছে দেবোত্তরের। তার নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা এবং ব্যক্তিত্ব সবার নজর কাড়ে। তবে পয়সার দিক থেকে মানুষটা একেবারে নুয়ে আছেন। পরপর তিন মেয়ে তাঁর জীবনে হতাশার সৃষ্টি করেছে, সে হতাশার কথা মাঝে মাঝে চন্দ্রিকার কাছে প্রকাশ করে তিনি ধমক খান। চন্দ্রিকা ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত হয়ে বলেন, এ যুগে ছেলে-মেয়ের ফারাক দেখতে যেও না। এখন ছেলে-মেয়ে সব সমান, দু-চোখের তারার মতো।
মেয়েগুলোকে মানুষ করার চেষ্টা করেছিলেন দেবোত্তর, কিন্তু শুধু দ্বীপী ছাড়া আর দুটি মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ হতে দিল না। বড় মেয়ে লহরী স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে টেনে-টুনে। সে আর প্রি-ইউনিভার্সিটি পড়তে চাইল না নিজের ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে। একটা পাশ করেই সে স্থিতু হয়ে বসে আছে ঘরে, গ্রাম ছেড়ে বাইরে বেরতে তার তীব্র অনীহা, মাঝেমধ্যে সে দেবোত্তর সঙ্গে শিবমন্দিরে গিয়ে বিড়বিড় করে আপনমনে। দেখতে শুনতে সে মন্দ নয়, চোখ নাক মুখ আকর্ষণীয়, তাই দু-চারটে সম্বন্ধ আসছে এদিক-সেদিক থেকে। পাত্রপক্ষের মেয়ে পছন্দ হলেও বিয়ে হচ্ছে না দেনা-পাওনার জন্য।
ঊর্মি একটু কম কথা বলে, সে পড়াশোনায় ভালো ছিল কিন্তু অসুখ ওর পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়। প্রায় দিন সে শারীরিক কারণে স্কুলে যেতে পারত না, স্কুলে গেলেও বাড়িতে এসে তার পড়ার শক্তি থাকত না। ফলে সে বাধ্য হয় লেখাপড়ায় ইতি টানতে। দ্বীপী তিন বোনের মধ্যে সব চাইতে পড়াশোনায় ভালো, ওর স্মৃতিশক্তি প্রখর–একবার পড়লে সব মনে থেকে যায়। সে এবার সায়েন্স নিয়ে ক্লাস টেনে উঠেছে, সূর্যাক্ষ তার সহপাঠী। ওরা এক সঙ্গে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি পড়ে। দুজনে ঘন্টার পর ঘন্টা এক সঙ্গে অঙ্ক করে। পড়াশোনায় ওদের অমনোযোগ লক্ষ্য করেনি কেউ। দ্বীপীর খুব ইচ্ছে সে বড়ো হয়ে রিসার্চ করবে কেমিস্ট্রি নিয়ে, তা যদি না হয় তাহলে সে ব্যাঙ্কে চাকরি করতে চায়, কেন না তার মামা প্রায় বলেন, ব্যাঙ্কের মাইনে অন্যান্য সরকারি সংস্থার চাইতে ঢের বেশি। বাবার দুঃখ দূর করতে হলে দ্বীপীর অনেক টাকা দরকার। ইদানীং তার পড়ার চাপ বেড়েছে প্রচণ্ড, সে সময় পায় না তাই ভোরবেলায় উঠে মনোযোগ দিয়ে পড়তে বসে। দেবোত্তর ছোট মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
দ্বীপী লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হলে দুঃখ ঘুচবে দেবোত্তরের। চন্দ্রিকাও দ্বীপীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোট মেয়েকে নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। আর যাই হোক দ্বীপী তাদের মনে দুঃখ দেবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সে সহজভাবে মানিয়ে নেবে। সেই ক্ষমতা তার আছে।
দ্বীপীদের বাড়ি থেকে বেরতে ন’টা বেজে গেল। গাঙধারের আখ খেত থেকে হাঁক ভেসে এল পেয়াদার। এখন খটখট করছে আকাশ, কোথাও এক চিলতে মেঘের দেখা নেই। বাতাস জড়িয়ে ধুলো উড়ছে সর্বত্র। আর কতদিন প্রকৃতিতে ধুলো খেলা চলবে বুঝতে পারল না সূর্যাক্ষ। রোদ বাড়লে স্কুলে যেতে কষ্ট হয়। ছাতা নেওয়া তার পোষায় না। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ক্যারিয়ারে দ্বীপী, এই তিনের সমন্বয়ে খেলাটা বড়ো কঠিন হয়ে যায়, একটু অমনোযোগ হলে দুর্ঘটনা ঘটতে বেশি সময় লাগবে না।
দ্বীপী তার সঙ্গে থাকলে বুকে বল পায় সূর্যাক্ষ। তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি হয়ে গেলে তারা মোকামপাড়ার রাস্তাটা ধরে ফিরতে ভালোবাসে। নির্জন রাস্তা দ্বীপীর খুব পছন্দ। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ও কুটকুট করে কথা বলে। পণ্ডিত বিলের জলে গড়িয়ে যায় তার মাধুর্য-ভরা কণ্ঠস্বর। সূর্যাক্ষ তাকে তাতিয়ে দেবার জন্য বলে, জানিস তো, বিলের বালিহাঁসগুলো তোর চাইতে দেখতে সুন্দর। আমার ওদের ভালোবাসতে ভীষণ ইচ্ছে করে। দ্বীপী রাগে না, শুধু মসৃণ কাঁধটা ঝাঁকিয়ে ঠোঁট ওলটায়, জানিস তো তোর চাইতে আমবাগানের হনুমানগুলো আরও সুন্দর। ওদের পোড়ামুখ ঠিক তোর মতন। তবে ওদের ঝকঝকে দাঁতগুলো তোর মতন হলুদ আর ছাতা ধরা নয়। ওরা তোর চেয়েও ভদ্র।
–তুই এসব আমার নামে বলতে পারলি?
-কেন বলব না, তুই থুতু ছিটালে আমি কি তোকে ফুল ছিটাবো? দ্বীপী গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, আমি গান্ধীনীতিতে জীবন কাটাতে পছন্দ করি না। আমার আদর্শ সুভাষচন্দ্র। কেউ যদি আমাকে চড় মারে, আমি তাকে অবশ্যই ঘুষি মারব।
-কী মেয়েরে বাব্বা! সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল সূর্যা।
দ্বীপী তোয়াক্কাহীনভাবে বলল, মেয়ে বলে ভাবিস না চিরটাকাল তোদের কথা শুনব। তুই ঠিকই বলেছিস আমি হলাম বালিহাঁস! কেন জানিস? বালিহাঁস ভীষণ চালাক। অনেক সময় জাল ফেলেও ওদের ধরা যায় না।
