হাসব না কি কাঁদব? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সূর্যাক্ষ।
দ্বীপী সাইকেল থেকে ঝপ করে নেমে পড়ে, ধুলো ছিটিয়ে হাঁটতে থাকে রাগের ঘোরে। সূর্যাক্ষ তার সামনে গিয়ে মুখ ভেংচে বেল বাজায়। এভাবেই পাঁচ পাঁচটা বছর কেটে গেছে ওদের স্কুল যাওয়া আসায়। পাড়াপড়শিরা ভাবে ওরা দুটিতে যেন ভাই-বোন। ভাই-বোন না হলে কি তুই-তুকারি সম্পর্ক হয়।
দ্বীপী একদিন জামা ছাড়ছিল ঘরের ভেতর, সূর্যাক্ষ পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে একেবারে অবাক। দ্বীপীর ছড়ানো পিঠটা একেবারে টকটকে ফর্সা, হালকা লালচে আভা ফুটে উঠেছে ত্বকের উপর। চোখ বটআঠায় আটকে যাওয়া বনি পাখির চেয়েও অসহায়। গলা খেঁকারি দিয়ে কেশে উঠতে পারেনি সে, যদি স্বপ্নটা শেষ হয়ে যায়-ভয় একটাই। দ্বীপী টের পেয়ে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়েছিল সূর্যাক্ষকে। লজ্জায় আরক্ত তার চোখ-মুখ, কী অসভ্য রে তুই?
-কেন কী হলো? সূর্যাও কম অবাক নয়।
দ্বীপী নাকের ছিদ্র বিস্ফারিত করে বলেছিল, মেয়েরা পোশাক বদলালে সেখানে কি ছেলেদের থাকা উচিত হয়?
-মা তো শাড়ি বদলায়। আমি তো দেখি।
–মা তো কিছু বলে না।
-তখন তুই ছোট ছিলিস। ছোটদের চোখে পাপ থাকে না। শিশুদের চোখ তো ফুলের চেয়েও পবিত্র। তুই বইতে পড়িস নি? দ্বীপী কুলকুল করে হেসে উঠল, খবরদার আর কোনোদিন আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবি না। তুই বড়ো হয়েছিস। আমিও বড়ো হয়েছি। এখন এসব ভালো দেখায় না। দ্বীপী হাই ইস্কুলের দিদিমণির মতো বলল কথাগুলো।
-তাহলে তুই যে আমার সাইকেলে বসে যাস, তখন! তখন যদি লোকে কিছু কথা বলে। দ্বীপীর মুখের গোলাপী আভা চিন্তায় মিলিয়ে গেল, লোকে বলতেই পারে। লোক কিছু বললে আমাদের সমঝে চলতে হবে। লোক যা বলবে তা আমাদের মানা উচিত।
আমি লোকের কথা মানি না। আমি শুধু তোর কথা মানব। বল দ্বীপী, আমার জন্য তোর মন খারাপ করে কি না?
দ্বীপীর কানের লতি লজ্জায় জবাফুলের মতো লাল হয়ে উঠল, তার মুখে কোনো ভাষা নেই, তার বুকের ভেতর শুশনিপাতার ঢেউ উঠল, কলজেটা গুড়ল পাখির মতো ডেকে উঠল গুড়গুড়িয়ে, সাবুদানা ঘাম বিজবিজিয়ে উঠল কপাল জুড়ে, কেঁপে কেঁপে উঠল চোখের তারা, ওর সিল্কি মুখে পিছলে যেতে লাগল জীবনের প্রথম রোদ্দুর, কোনোমতে ঠোঁটের কোণটা কামড়ে সে উদাস হয়ে গেল।
সূর্যাক্ষ খপ করে তার হাতটা ধরে মুচড়ে দিল জোর করে, তুই মিথ্যুক, ভীষণ স্বার্থপর। নিউটনের সূত্র বলছে–প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। তাই যদি হয় তাহলে তোর জন্য আমার মন খারাপ করলে তোরও আমার জন্য মন খারাপ করবে। আরে, এ তো এ প্লাস বি হোলস স্কোয়ারের ফরমূলার চাইতেও সোজা। তুই এটাকে ভুল প্রমাণ করবি কি করে?
–আমার হাতটা ছেড়ে দে সূর্য, লাগছে।
–লাগুক। লাগার জন্য তো ধরেছি।
–মেয়েদের হাত আর মন নরম হয় জানিস না বুঝি?
-কথা ঘোরাস না, সোজা কথার সোজা জবাব দে। সূর্যাক্ষ রীতিমতন উত্তেজিত, তুই যদি আমাকে কোনো জবাব না দিস তাহলে আমি আর কোনোদিন তোর বাড়িতে আসব না।
-না এসে থাকতে পারবি তো? আহ্লাদী গলায় প্রশ্ন করল দ্বীপী।
–আমাকে রাগাস না, আমি সব পারি।
–আমিও সব পারি।
–পাক্কা?
-পাক্কা। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে দ্বীপী হাসছিল। ওর রক্তবর্ণ পঞ্চদশী ঠোঁট পাকা তেলাকচুর মতো আহ্বান করছিল সূর্যাক্ষকে। সূর্যাক্ষ সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে ডানে বাঁয়ে তাকাল, তারপর দ্বীপীকে পাগলের মতো নিজের কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তুই আমার সঙ্গে না মিশলে আমি মরে যাবো দ্বীপী, আমি আর একটা লাইনও পড়তে পারব না। তুই আমার পড়া, তুই আমার খেলা, তুই আমার ঘুম সব। আমাকে ভুলে যাস না দ্বীপী। তুই ভুলে গেলে দেখবি আমি ডমরু পাগলার মতো মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
-কী ভাবছিস? দ্বীপীর ডাকে হুঁস ফিরে এল সূর্যাক্ষর। এমন ছেলেমানুষী তার ভেতরে মাঝে মাঝে ভর করে। সত্যি দ্বীপী এখন তার জীবনে প্রদীপের আলোর মতো। দ্বীপীকে সে কখনো খারাপ ভাবতে পারে না। দ্বীপীও তাকে নিকট বন্ধুর মতো দেখে সব সময়।
-তোর বন্ধু এল, ওকে ঘরে নিয়ে যাবি না বুঝি? দ্বীপী হাসতে হাসতে বলল, চল, ঘরে গিয়ে বসি। আজ নারকেল মুড়ি খাওয়াব। জানিস ভোরবেলায় গাছ থেকে একটা ঝানু নারকেল পড়েছে। বাবা মন্দিরে যাওয়ার আগে ছাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে ওটা। ভালোই হল নারকেলটা তোদের খাওয়াতে পারব।
দ্বীপী ওদের ঘরে বসিয়ে চলে গেল।
চন্দ্রিকা দ্বীপীর মা। কাঁসার জামবাটি ভরে মুড়ি আর নারকেল নিয়ে এলেন তিনি। রঘুনাথকে দেখে তিনি স্মিত হাসলেন, একটা জামবাটি তিনি রঘুনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নাও বাবা, মুড়িগুলো খেয়ে নাও। আমি দুধ পাঠিয়ে দিচ্ছি দ্বীপীকে দিয়ে। দুধ মুড়ি খেলে পেটে কিছুক্ষণ থাকবে।
চন্দ্রিকা চলে গেলেন। দ্বীপী এল দুধভর্তি কাচের গ্লাস হাতে। রঘুনাথের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে সে বলল, আমাদের পোষা গোরুর দুধ। সব মিলিয়ে তিনটে আছে। তিনটেই পালা করে দুধ দেয়।
রঘুনাথ কাচের গ্লাসটা ধরে নিয়ে দ্বীপীর দিকে তাকাল। মানুষ এত সুন্দর হতে পারে তার ধারণা ছিল না। দ্বীপীর মুখের গড়ন অনেকটা বাঁশ পাতার মতন, কথা বললে, হাসলে সুন্দর টোল পড়ে গালে। ঈদের চাঁদের মতো ওর চেহারাটা মেদহীন, পিঠ ছাপানো চুলগুলো ঢেউ খেলানো, অনেকটা কালো দিঘির জলের মতো ধারাবাহিকভাবে সাজানো। কখনোই দ্বীপী রোগা নয় বরং সে সাজানো-গোছানো সোনালি বালির চর।
