কপোতাক্ষ হারুকে বারকতক সতর্ক করেছেন, সুদের টাকা থাকে না হারু। তোমার তো অভাব নেই তবু তুমি কেন সুদের কারবার করবে? মানুষের অভিশাপ কুড়িয়ে জীবন কোনোদিন সুখের মুখ দেখে না। তাই বলছিলাম কী হারু, তুমি এসব ছেড়ে দাও। শুধু ভুষিমালের দোকানটা চালাও। ওতেই তোমার মঙ্গল।
হারু সুখী না হলেও ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। সে জানে কপোতাক্ষর রাগের বাহার। মানুষটা ভালোর ভালো কিন্তু রেগে গেলে মাথায় খুন চড়ে যায়, তখন সাত বুঝিয়েও তাকে সামলানো যায় না।
নীলাক্ষর কাছে হারু খোঁড়া কাঁচুমাচু হয়ে অভিযোগ করেছে কপোতাক্ষর বিরুদ্ধে। সব শুনে দৃঢ় অথচ চাপা কণ্ঠে নীলাক্ষ আউড়েছেন, কপোতের কথা আমার কাছে বলো না। বাবার মৃত্যুর পর আমরা ভিনো হয়ে গিয়েছি। আমাদের হাঁড়ি আলাদা, ঘর আলাদা। এমনকী চিন্তা-ভাবনাগুলোও আলাদা। ওই অমানুষটাকে আমি কিছু বোঝালে বুঝবে না। ও নিজেকে কমরেড মনে করে।
হারু খোঁড়া একথা শোনার পরে দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সাহস পায়নি। আপোষের ঢোঁক গিলে সে মন দিয়েছে নিজের কাজে।
এ সময় নিমগাছের ছায়া বড়ো মধুর হয়। নিম হাওয়ায় রোগ-জ্বালা ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। সূর্যাঙ্ক জ্ঞান বাড়ার পর থেকে এই গাছটাকে দেখছে। এর বুঝি বয়স বাড়ে না, গতর বৃদ্ধি হয় না, এ যেন জরা নিরোধক ছাল পড়ে কালের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সূর্যাক্ষ রঘুনাথের দিকে তাৎপর্যপূর্ণ চোখে তাকাল, কি রে যাবি নাকি দ্বীপীদের ঘরে? মন চাইলে বল এখুনি নিয়ে যাবো তোকে।
রঘুনাথ সংকোচ আড়ষ্টতায় ভুগছিল, না, আজ থাক। পরে কুনোদিন আসবখন।
পরের কথা পরে হবে, এখুনি যাই। সূর্যাক্ষ কাতর হয়ে উঠল, জানিস কাল রাতে দ্বীপীর স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন দেখতে-দেখতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। সেই থেকে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। চল মাইরি। সূর্যাক্ষ রঘুনাথের হাত ধরে টানল।
.
০৭.
দ্বীপীদের বাড়িখানা পোড়ো বাড়ির মতোন, কতদিন যে চুনকাম হয়নি সময়ই তা জানে। বাড়ির সামনে দু’পাল্লা কাঠের দরজা, তাতে আলকারীর রঙ বর্ণ হারিয়ে সাদা জামা ঝুলকালিতে বোঝাই হয়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে। ঘরের সীমানার পাচিলটাও নোনা ধরা, বয়স্ক। ফ্যাকাসে লাল রঙের ইটগুলো দাঁত বের করে হাসছে। সূর্যাক্ষ দ্বিধাহীন হাতে বার কতক শেকলের বাড়ি দরজায় মারতেই কে যেন দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিল। সূর্যাক্ষর মন প্রজাপতি হয়ে উড়তে লাগল দ্বীপীকে দেখতে পেয়ে। কিছু বলার আগেই দ্বীপী কেমন নরম চোখে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে উঠল, কাল যে এলি না বড়ো, জানিস আমি কি ভাবছিলাম। ভাবছিলাম তোর সাথে কথা বলব না, রাগ করে থাকব।
সূর্যাক্ষর চোখ দুটো পোষা বেড়ালের চেয়েও অনুগত দেখাল, রাগ করিস না। দেখ আজ আমি কাকে সঙ্গে করে এনেছি।
দ্বীপী ভীতু চোখে লজ্জা মিশিয়ে তাকাল। রঘুনাথের চোখে সে চোখ ফেলতে পারল না। চোখ নিমেষে নামিয়ে নিয়ে ঠাকুর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
সূর্যাক্ষ কৌতুক হেসে বলল, ওকে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। ওর নাম রঘু, রঘুনাথ। ভীষণ ভালো ফুটবল খেলে। বাঁশি বাজায়। সময়-সুযোগ হলে তোকে একদিন বাঁশি বাজিয়ে শুনিয়ে যাবে। কি রে রঘু, বাজাবি তো?
রঘুও নিরুত্তর, দম না দেওয়া ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো স্থির হয়ে আছে। নট নড়ন চড়ন। সূর্যাক্ষ ওর পিঠে থাবড়া মারল, কি রে কথা বলছিস না কেন? বোবা হয়ে গেলি বুঝি?
বিরক্তির সঙ্গে তাকাল রঘুনাথ, কথা থাকলে তো বলব? আমার কুনো কথা নাই। সব কথা মুখে এটকে গেছে।
–কেন রে?
–সামনে যে দাঁড়িয়ে আচে তার জন্য। রঘুনাথ এবার সংযমের বেড়া ভেঙে হেসে উঠল।
দ্বীপী বলল, তোর বন্ধু তো বেশ রগড় জানে। কোথায় বাড়ি রে ওর?
সূর্যাক্ষ কিছু বলার আগেই রঘুনাথ বলল, বাঁধের ধারে বুনোপাড়ায়। হলদিপোঁতা ধাওড়ার নাম শুনেচ?
ঘাড় নাড়ল দ্বীপী, আমরা তো রোজ ওই বাঁধ ধরে ইস্কুলে যাই! স্কুলে যাবার সময়টা আনন্দের চামর বুলিয়ে দেয় দ্বীপীর চোখে-মুখে। বিরক্তি নয় বেশ মজা হয় তার। মজার পাশাপাশি এক বিমল আনন্দ ছুঁয়ে থাকে তাদের। গ্রাম থেকে ওরা এক সাথে বেরয়। বাঁধের গোড়ায় এসে সূর্যাক্ষ বলবে, দ্বীপী, এবার তুই ক্যারিয়ারের পেছনে ঝপাৎ করে বসে পড়। কত আর হাঁটবি।
প্রথম প্রথম দ্বীপীর লজ্জা লাগত, এখন সেই লজ্জা শরত শিউলির মতো ঝরে গেছে। সাইকেল গড়ালে শুরু হয় ওদের কথামালা। দ্বীপী মুখ তুলে শুধোবে, হ্যাঁরে সূর্য, তোর কষ্ট হয় না আমাকে নিতে?
-ধ্যুৎ তোকে নিতে আমার কষ্ট কি। তুই যা রোগা। বোঝাই যায় না বসে আছিস।
-হ্যাঁরে, আমি কি এতই রোগা? বল তো আমি কার মতো রোগা? দ্বীপীর চকচকে চোখে দুঃশ্চিন্তা, আমি কি ডমরু ক্ষ্যাপার চেয়েও রোগা নাকি?
ডমরু বিয়ে পাগলা, রোগা খিটখিটে ওর চেহারা, মেয়ে দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে যেন ঠাকুর দেখছে। ওর নামে পাড়ায় পাড়ায় একটা ছড়া ঘোরে।
ডমরু ক্ষ্যাপা, বউয়ের বাবা,/বউ আনতে কবে যাবা।/ বউ গিয়েছে বাপের ঘর। এঁড়ে গোরুর লেজ তুলে ধর।
ডমরুর চেহারাটা মনে পড়তেই হেসে ফেলল সূর্যাক্ষ। দ্বীপীর স্ফুরিত অধরোষ্ঠ কেঁপে উঠল, হাসছিস যে! একদম হাসবি নে। তুই হাসলে আমার একদম ভালো লাগে না।
