মীনাক্ষী এসে সকালের চা দিয়ে গেলেন। প্রতিটি সকাল তার কাছে নতুন মাত্রা নিয়ে ধরা দেয়। একটা ভয় পেঁচিয়ে ওঠে বুকের ভেতর। রামনগর সুগার মিলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন কপোতাক্ষ। মিল-কোম্পানীর সঙ্গে তার পটল না। শ্রমিক আর চাষিদের দাবী নিয়ে যত অশান্তি। অগ্রভাগে কপোতাক্ষ ঝান্ডা হাতে–জবাব চাই, জবাব দাও। সমস্যা একটা নয়। সাহেবমাঠের আখ বিক্রির সমস্যা ছিল বহু দিনের, সেই সঙ্গে যুক্ত হল পেয়াদাদের সমস্যা। ওরা নূন্যতম বেতনে কাজ করতে আগ্রহী নয়। বেতন বৃদ্ধির জন্য অসন্তোষ দানা বাঁধছিল ওদের ভেতর। মনে অশান্তি নিয়ে মাঠ পাহারার কাজ হয় না। এ কাজে বিপদ সব সময় মাথার উপর খাড়ার মতো ঝোলে। মিলের কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মিল প্রশাসন উদাসীন। ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থার আশাপ্রদ নয়, তাছাড়া যাতায়াতের পথঘাট খানাখন্দে ভরা। এসব সমস্যার কথা ভেবে কপোতাক্ষর রাতে ভালো ঘুম হয় না। বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার আগে ঘর সামলে নেবার বড়ো প্রয়োজন। শ্রমিকরা এবার পুজোর বোনাসের জন্য সংঘবদ্ধ হবে। ওদের নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষ কোথায়? কপোতাক্ষই চাকরির ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গেলেন। আলোচনার মধ্য দিয়ে মীমাংসাসূত্র বেরিয়ে আসার কথা ছিল কিন্তু বাস্তবে তা হল না একপক্ষের অনড় মনোভাবের জন্য। কপোতাক্ষর উপর রুষ্ট হলেন কর্তৃপক্ষ। তাকে আত্মসংশোধনের সুযোগ দিলেন ওরা। কিন্তু কপোতাক্ষর মন আতাগাছের ডালের মতো ভঙ্গুর নয়, তিনি পাকা বাঁশের কঞ্চি, মচকাবেন তবু ভাঙবেন না। ফলে একদিন ছাঁটাইয়ের চিঠিটা ধরিয়ে দিলেন অফিসের বড়বাবু। এরকম কোনো অঘটন ঘটবে আগে থেকে আঁচ পেয়েছিলেন কপোতাক্ষ। মীনাক্ষী সব শুনে নিরাপত্তাহীনতায় ডুকরে উঠলেন, এ কী শোনালে গো, এখন আমাদের কী ভাবে চলবে?
-তুমি ভয় পেও না। তিনটে পেট ঠিক চলে যাবে। আমি ক্ষীরমোহন চক্রবর্তীর ছেলে। আশা রাখি আমার মাথার উপর যতদিন দাদা আছে আমার খাওয়া পরার কোনো অসুবিধা হবে না। কপোতাক্ষর কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা এবং সহনশীলতার সহাবস্থান, একটা কথা মনে রেখো মীনা, জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি। ভগবানে আমার কোনো আস্থা নেই। আমার দেবতার নাম মানুষ-দেবতা।
-তুমি কি পাগল হলে? দাদা কেন তোমার সংসার টানতে যাবেন? মীনাক্ষীর চোখ জোড়ায় অশান্তি চিকুর কাটে, তোমার দাদা দেখো কোনদিন আবার পৃথক না হয়ে যান।
যায় যদি তো যাবে, তাতে আমার কি? কপোতাক্ষর কণ্ঠস্বরে হালকা সুর, এ পৃথিবীতে কেউ কারোর অনুগত নয়। যে যার কর্মের দ্বারা খায়। আসলে প্রতিটি দানায় যে খাবে তার নাম লেখা থাকে। তাছাড়া আমার চাকরি আমার দোষের জন্য যায়নি। বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে আমি ক্ষুদ্রতর স্বার্থ ত্যাগ করেছি।
মীনাক্ষী সংসারের দাবীর কথা কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারেন না। উল্টে কপোতাক্ষ বোঝান, আমার যদি ডাল ভাত জোটে তোমারও জুটবে। আর তা যদি না জোটাতে পারি তোমাকে কৃষ্ণনগরে রেখে আসব। তুমি খোড়ে নদীর উন্মুক্ত হাওয়া খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা রেখো। যদি সম্ভব হয় ভবিষ্যৎ-এর বিপ্লবের জন্য নিজেকে তৈরি রেখো।
-কী পাগলের মতো বকছো! সূর্যর ভবিষ্যৎ-এর কথা ভাববে না? মীনাক্ষী রাগ জ্বালা লুকিয়ে রাখতে পারল না? হতাশায় ডুবে গেল তার সুন্দর মুখশ্রী।
সকালের চা-টা সুন্দর বানিয়েছিলেন মীনাক্ষী। কপোতাক্ষ তার সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে বসেছেন বাইরের বারান্দায়। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে আলোচনা চলছে পূর্ণমাত্রায়। তাদের কথা শোনার কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না সূর্যাক্ষ। সে মীনাক্ষীর মুখোমুখি দাঁড়াল, মা, আমি রঘুকে এগিয়ে দিয়ে আসি। আজ আমার স্কুল আছে। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পর টিউশানি সেরে ফিরব।
রঘুনাথ বিদায়বেলায় কেমন করুণ মুখ করে তাকিয়ে ছিল মীনাক্ষীর দিকে। সূর্যাক্ষর মা যেন কুমোরপাড়ায় গড়া মা দুর্গা। যেমন ব্যবহার, তেমন কথা-বার্তা, আন্তরিকতা। রঘুনাথের মন ভরে গিয়েছে। মানুষের প্রতি তার ভুল ধারণা অনেকটাই পাল্টে গেছে। ঘরে ফিরে সব কিছু গুছিয়ে বলতে হবে দুর্গামণিকে, যদিও এসব কথা সে আদৌ বিশ্বাস করবে না। রঘুনাথ তক্তাপোষে ঘুমিয়েছে সূর্যাক্ষের পাশে একই বিছানায়। একথা গ্রাম- সমাজে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার পরিবেশ এখন ডিমের ভেতর ভ্রুণের মতো লুকিয়ে আছে। বিশ্বাস না করলেও সে দুর্গামণিকে গল্প বলবে সব। এ গল্প শুনে চুনারামের কী প্রতিক্রিয়া হবে তা মনে মনে সব যেন দেখতে পাচ্ছিল রঘুনাথ।
মীনাক্ষী স্নেহের চোখে রঘুনাথের দিকে তাকালেন, আবার এসো বাবা। সংকোচ করো না, এ বাড়ি তো তোমার। যখন মন চায় চলে আসবে।
রঘুনাথের ঠোঁট কেঁপে উঠল, থরথরিয়ে উঠল দৃষ্টি। সে বুঝতে পারল আর একটা শব্দও যদি মীনাক্ষী উচ্চারণ করেন তার প্রতি তাহলে সে উগত কান্নার বেগকে সামাল দিতে পারবে না, বাঁধ ভেঙে গিয়ে আবেগের বন্যা আসবে শরীরের নদীতে।
সকালবেলায় নিমতলা ঝাট দেয় খোঁড়া হারু। ওর ভুষিমালের দোকান মাত্র বিশ হাত দূরে। শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও হারু একাজটা নিজের হাতে করতে পছন্দ করে। হারু শুধু খোঁড়া নয়, তার উচ্চতা মাত্র তিন ফুট দুই ইঞ্চি। সে তার যৌবনে সার্কাস দলে নাম লিখিয়েছিল, সেখানে সে জোকার সাজত, মুখে রঙচঙ মেখে হাসি-আনন্দ বিলোত দর্শকদের। সার্কাসের জীবন হারুর পছন্দ হয়নি কোনোকালে। সে ম্যানেজারের ক্যাশ ভেঙে পালিয়ে এল তিন বছর পরে। গাঁয়ে এসে ভয়ে ভয়ে সময় কাটাত সে। ছ’মাস পরেও যখন সার্কাসের লোক এল না তার খোঁজে তখন সে সাহস করে নিমতলায় ভূষিমালের দোকান খুলল। হারুর দোকান এ তল্লাটে বিখ্যাত, গাঁ বলে সে দাম গলা কেটে নেয় না, সামান্য লাভ রেখেই সে ব্যবসা করতে পছন্দ করে। এখন কাঁচা টাকার মুখ দেখেছে হারু। সে এখন গরিব দুঃখীদের মহাজন, সুদে টাকা ধার দেয়, গোপনে বন্ধকের কারবার করে।
