সূর্য সাড়া দিল, না বাবা, জেগেই আছি।
রঘুর হাত থেকে দ্বীপীর ফটোটা কেড়ে নিয়ে সে চকিতে বিছানার তলায় লুকিয়ে ফেলল, তারপর রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা আসছে।
রঘুনাথও নিমেষে শরীরটাকে টানটান করে উঠে দাঁড়াল। সূর্যাক্ষর বাবার সঙ্গে তার আলাপ নেই। আলাপ করার প্রয়োজনও হয়নি। তবে কপোতাক্ষ রোজ শেরপুরের বাঁধ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কালীগঞ্জের বাজারে যান, ওখানেই তাঁর আসল আড্ডা। প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরেন। এ অঞ্চলের ডাকাত-চোর-বদমাশ-লুটেরা-ধান্দাবাজ সব তার চেনা জানা। ফলে রাত করে বাড়ি ফিরলেও কেউ তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায় না, বরং চোখাচোখি হলে মুখ নামিয়ে নিয়ে চলে যায়। এই সম্মানটুকু আছে বলেই এখনও কপোতাক্ষ সারাদিন লড়াই করার শক্তি পান।
ঘরে ঢুকেই সবার আগে কপোতাক্ষ রঘুর দিকে তাকালেন, তোমাকে আমি দেখেছি, কিন্তু কথা হয়নি। তোমার বাবার নাম কি গুয়ারাম?
রঘুনাথ ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলেই মাজা নীচু করে হাত বাড়িয়ে দিল কপোতাক্ষর পায়ের দিকে। পা ছোঁয়ার আগেই কপোতাক্ষ রঘুনাথের হাত দুটো ধরে ফেললেন, না-না থাক। প্রণাম করার দরকার নেই। তুমি মনে মনে আমাকে শ্রদ্ধা করলেই প্রণাম করার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শ্রদ্ধা জানানো হয়। আর একটা কথা। চট করে লোকের পায়ে হাত দিতে যাবে কেন? মাথা নত করার স্বভাবটা বন্ধ করতে হবে আমাদের। বাবা-মা আর তোমার শিক্ষক ছাড়া কারোর কাছে মাথা নত করবে না।
কপোতাক্ষর কথায় যেন চাপা আগুন উসকে উঠল। একটা তেজ তার কথার মধ্যে ঠিকরে বেরচ্ছিল।
-ঠিক আছে। তোমরা বসো। রাত হল। কাল সকালে আবার কথা হবে। তিনি সূর্যাক্ষর দিকে তাকালেন, মশারি টাঙ্গিয়ে ঘুমাবি। বাঁশ বাগানের মশারা কিন্তু দৈত্য হয়। আমি আসি।
কপোতাক্ষ চলে গেলেন। সূর্যাক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, আমার বাবাকে কেমন দেখলি। রঘু?
–তুর বাবা বেশ ভালো মানুষ। অমন মানুষ আজকালকার দিনে পাওয়া ভার। রঘুনাথের কথায় খুশি হল সূর্যাক্ষ, প্রসঙ্গ বদল করল সে, কাল তোকে দ্বীপীদের বাড়িতে নিয়ে যাবো।
–আমার লাজ লাগবে, আমি যাব না।
-যাবি না মানে? তোকে যেতেই হবে। জেদ ফুটে উঠল সূর্যাক্ষর গলায়। রঘু বলল, আগে সকাল হতে দে, তারপর দেখা হবেখন।
সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল রঘুর, জানালা টপকানো রোদ এসে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। চোখ ডলে নিয়ে সে দেখল চারিদিকে ফুটফুটে আলো হাসির নমনীয় রঙ মেখে নিজেকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। সূর্যাক্ষ কখন উঠেছে তা সে সঠিক জানে না। তবে সূর্যাক্ষ ঘরের এক কোণে হ্যারিকেন নিয়ে মনযোগ সহকারে পড়ছিল। ওর ভোরে ওঠা অভ্যাস, যত রাতে ঘুমাক না কেন তোর ভোর ঘুম ভাঙবেই। এই অভ্যাসটা মীনাক্ষীই তাকে পাইয়ে দিয়েছেন, ভোর ভোর না উঠলে দিনটা বড়ো ছোট হয়ে আসে। মীনাক্ষী প্রায় দিনই আবৃত্তি করার মতো করে বলেন, আরলি টু রাইজ এন্ড আরলি টু বেড মেকস আ ম্যান হেলদি অ্যান্ড ওয়াইস। বুঝলি-অনুগত ঘাড় নাড়ে সূর্যাক্ষ। কপোতাক্ষ ঘুমের ব্যাপারে আপোষহীন। দেরি করে ঘুমালে দেরিতে ওঠা তার স্বভাব। বিশেষ দরকারেও সে বিছানা ছেড়ে উঠবে না। আর যদি কোন কারণে উঠতে হয় তাহলে বিরক্ত হয় প্রচণ্ড, দিলে তা ঘুমটা ভাঙিয়ে, ঘুমে কত দাম জানো?
–আমার আর জেনে দরকার নেই। তুমি আগে বাজারে যাও তো। ঘরে কিছু নেই। ছেলেটা কী খেয়ে ইস্কুলে যাবে? মীনাক্ষীর কণ্ঠস্বরে বাতাস-খেদানো ঢেউয়ের ব্যস্ততা।
কপোতাক্ষ মীনাক্ষীর মুখের উপর কোনো কথা বলতে পারেন না। অস্বস্তি হয়। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন গোয়াড়ী শহরে মীনাক্ষীদের বাস চলে। আর একটা বাস কৃষ্ণনগর-করিমপুর রুটে। দুটো বাস ছাড়াও ওদের আছে কাপড়ের দোকান। ভাব-ভালোবাসার বিয়ে নাহলে কি মীনাক্ষী কোনোদিন এই অজ পাড়াগাঁয়ে এসে বসবাস করত। বিবাহ শব্দটা তাই ভাগ্যঘেঁষা।
পিতৃদেব ক্ষীরমোহনের মৃত্যুর ছ মাসের মধ্যেই নীলাক্ষ জমিজমা, বাস্তুভিটে, পুকুর বিল এমনকী বাসনপত্র সব চোখ উলটে ভাগ করে নিলেন। এমনকী ভাগ হয়ে গেল গোয়ালের গোরু-মোষ। নীলাক্ষ যাওয়ার আগে গায়ে চিমটি কাটার মতো কথা বলল, তোর সাথে ইচ্ছে থাকলেও আর থাকা যাবে না। গাঁয়ের মানুষ খেপিয়ে তুই যে কারবার শুরু করেছিস–তা কখনও সমর্থনযোগ্য নয়। ভাবছিস সস্তা রাজনীতি করে চারদিক মাত করে দিবি–তা কিন্তু হবার নয়। মানুষ ফাঁকিটা ধরতে পারে। আর যেদিন ফাঁকিটা ধরতে পারবে তোদের কিন্তু গাঙের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। সময় আসলে আমার কথাটা মিলিয়ে নিস।
–তা বলে তুই ঘর ছেড়ে চলে যাবি? ভ্রূ তুলে জিজ্ঞাসা করল কপোতাক্ষ।
-না গিয়ে উপায় নেই। আমি চোরের সাথে ঘর করব তবু তোর সাথে নয়। মুখ বেঁকে উঠল নীলাক্ষর, তোর সাথে থেকে আমার নিন্দে হচ্ছে। ফলে ঘরের খেয়ে আমি বনের মোষ তাড়াতে পারব না। তাছাড়া তোর ছায়ায় নিজেকে ঢাকলে হাসাহাসি করবে লোকে।
–আর একবার শেষ বারের মতো ভেবে দেখ। কপোতাক্ষ বোঝাতে চাইল, দশের লাঠি একের বোঝা। কথাটা মানিস তো?
নীলাক্ষ চলে যাওয়ার পর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল কপোতাক্ষর। সে এখনও বুঝতে পারেনি কী তার অপরাধ? কেন দাদা তার সাহচর্য ছেড়ে গেল। তবে নতুন জায়গায় নতুন বাড়িতে নীলাক্ষ বেশ সুখে আছে। জমিদারের মতো মেজাজ সে এখনো ধরে রেখেছে নিজের ভেতর।
