-বন্যার পরে মাটি নরম হয় অথচ তুই তোর মনটাকে শক্ত করলি কি ভাবে? মাধুরীর জিজ্ঞাসায় প্রচ্ছন্ন খোঁচা ছিল, তা গায়ে মেখে নিয়ে শুভ বলল, আমাকে বাজারে যেতে হবে চাল কিনতে। তুই যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেল।
–আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস? আহত চোখে তাকাল মাধুরী।
শুভ কিছুটা ঘাবড়ে গেল তার কথার স্বরে, তোকে কেন তাড়িয়ে দেব। আমি শুধু আমার দরকারের কথাটা বললাম।
-আগে তো তুই এত হিসাব করে কথা বলতিস না? মাধুরীর কথার তীক্ষ্ণতায় হকচকিয়ে গেল শুভ।
মাধুরী নিজেকে শোনানোর মতো করে বলল, ঠিক আছে, আমাকে যখন পছন্দ নয় তখন আমি চলে যাচ্ছি। আর যদি কিছু মোনানোর থাকে তাহলে ভালো করে শুনিয়ে দে। আজ আমি গায়ের চামড়া মোটা করে তোদের কোয়ার্টারে এসেছি। জানি এসব কথা আমার পাওনা। তবে একটা কথা, আমি মরে গেলে তো তুই আমাকে এসব কথা শোনাতে পারবি না?
ধ্বক করে উঠল শুভর বুকটা। হাড়-পাঁজরা সব কেঁপে উঠল শব্দের ঝাঁকুনিতে। কিছু বলতে গিয়ে মুহর্তে তার কথাগুলো বরফ হয়ে গেল। সে বিস্মিত দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল মাধুরীর মুখের দিকে।
মাধুরী ক’পা সরে এসে ক্লান্ত, বিধবস্তু চোখে তাকাল, এখন আমি যাই। তবে একটা কথা শুনে রাখ। আমি শিবনাথবাবুদের ছাদের তলায় থাকলেও তোর জন্য রোজ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কাদতাম। এখন বৃষ্টিও নেই, জলও নেই। চোখের জলের দাগও মিলিয়ে গেছে। তুই প্রমাণ চাইলে আমি মিথ্যেবাদী হয়ে যাব। মাধুরী আর দাঁড়াল না, আগুনে পোড়া পাখির যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে গেল।
.
ফিল্ড থেকে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল টিকেদারবাবুর। কুমোর খাদে জলপাখিদের আওয়াজ থেমে গেছে। বাতাসে জলীয় কশার অতর্কিত হামলা। আঁধার দেখলেই মশারা উড়ে আসে কলাবাগানের ভেতর থেকে। অবনী এখনও ঘরে ফেরেনি। সরস্বতী সন্ধ্যা দেখিয়ে হ্যারিকেনের পোড়া সলতে কাটতে বসে গেল। আর একটু পরেই এরফান আসবে, এসে গল্প শুরু করবে রাজ্যের। হা করে তার সেই আবোল তাবোল গল্প শুনতে হবে তাকে।
সবুজের সঙ্গে গত দু-দিনে একবারও দেখা হয়নি শুভর। হয়ত টিকেদারবাবু মানা করেছেন তার সাথে মিশতে। বড়ো মানুষদের বড়ো চিন্তা। আসলে টিকেদারবাবু চান না সবুজ তার সঙ্গে মিশুক। মেলামেশাটাও একটা ছোঁয়াচে রোগের মতন। একটা পচা আলুর কাছে একটা ভালো আলু থাকলে সেই ভালো আলুটাও নাকি পচে যায়।
টিকেদারবাবুর এই চিন্তা ভাবনা শুভকে মনমরা করে রাখে সব সময়। অথচ সবুজের সঙ্গ তার ভালো লাগে। সবুজ বুড়িগাঙের হাওয়া। তাকে আটকে রাখা যায় না। তবু কিভাবে যেন আটকে আছে সবুজের স্বাভাবিকতা। টিকেদারবাবুর কড়া শাসন পাঁচিল তুলেছে এই মেলামেশায়। অথচ সবুজের মা অন্য মানুষ। তিনি কম কথা বলেন। কিন্তু যেটুকু বলেন কাজের কথা। তার মধ্যে বিভেদ নেই। তাঁর ধর্ম জলের ধর্ম। তিনি বিশ্বাস করেন–মানুষই ভগবান, ঈশ্বর। অথচ টিকেদারবাবু ধমক দিয়ে বলেন, তুমি থামো তো। যা বোঝ না তা নিয়ে বেশি কথা বলো না। সবাই যদি এক হবে তাহলে ভালো, মন্দ কথা দুটো সৃষ্টি হত না। বাজার থেকে ফিরে শুভ হাত-পা ধোওয়ার জন্য টিউবওয়েলটার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে পুরো এলাকার চেহারাটা বুঝি বদলে যায়। কালীগঞ্জ বাজারের আগের শ্রী এখনও ফেরেনি। জলকাদায় প্যাঁচপ্যাঁচ করছে চারধার। বড়ো ড্রেনগুলো ভরে আছে জলে। সেখানেও মশা-মাছির চাষ-আবাদ। সব চাইতে করুণ দশা হয়েছে বারোয়ারিতলার। ঠাকুরথানটা জল সরে যাওয়ার পর কেউ পরিষ্কার করেনি। জলের দাগ, সেই সঙ্গে পা জড়িয়ে যাওয়া পলি ছড়িয়ে আছে ইতস্তত। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ফেরার সময় মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে বই দোকানটার সামনে দেখা হল শুভর। তাকে দেখতে পেয়ে মনে খেদ চেপে রেখে মৃত্যুঞ্জয় শুধালো, কেমন আছো বাবা?
শুভ দাঁড়িয়ে পড়ল, ভালো আছি কাকা। তোমরা সব ভালো তো?
মৃত্যুঞ্জয় হাসতে গিয়েও যেন হাসতে পারছে না, এই কোনোরকমে গড়িয়ে সড়িয়ে চলে যাচ্ছে বাবা। বান-বন্যায় কি আর ভালো থাকব? ঘরে অন্ন না থাকলে মন তো হমছাড়া হবেই।
মৃত্যুয়ের দুঃখটা অন্তর দিয়ে বুঝতে পারল শুভ। কালীগঞ্জ বাজারে তার ইটপাতা সেলুন আছে। সেখানে পেছনে ইট দিয়ে চুলদাড়ি কাটে অনেকে। পয়সা আর জায়গার অভাবে বাজারে ঘরভাড়া নিতে পারেনি মৃত্যুঞ্জয়। একটা সেলুনের স্বপ্ন দেখে সে। বড় আয়নায় গ্রাহকরা মুখ দেখবে, সরু চিরুনি নিয়ে চুলের টেরি কাটবে-এ স্বপ্ন বুঝি তার পূরণ হবার নয়। মাছ ধরা ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে তাই সে এখন ভ্রাম্যমাণ শুর-কাচি নিয়ে পড়েছে। মৃত্যুঞ্জয়ের ইটালি-সেলুনে নামমাত্র মূল্যে চুলদাড়ি কাটা হয়। তবে গাঁয়ের লোকে বিবাহ-শ্রাদ্ধে তাকে কোরকর্মে নেয় না। ঠাট্টা করে বলে, জাল ফেলে যে সুর-কাচি ধরে সে আবার প্রামাণিক হল কবে থেকে? কথাটা সত্যি। এর জন্য মৃত্যুঞ্জয়ের মনে কোনো দুঃখ নেই। তার সব সুখ জুড়ে আছে তার একমাত্র ছেলে সঞ্জয়। সঞ্জয় এবার আর্টস নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে। হালদার বংশের সে হবে একমাত্র ইলেভেনের টেস্ট দেওয়া ছেলে।
ইটালি সেলুনের শ্যাওলা পড়া ইটে বসে মৃত্যুঞ্জয় মা-মরা ছেলে সঞ্জয়ের কথা ভাবে। ছেলে বড়ো হয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করবে। ইটালি সেলুনের ইট নিয়ে গিয়ে সে ঘর গাঁথবে। সে ঘরে মাথার উপর ঢালাই ছাদ থাকবে, দেওয়ালে থাকবে বড়ো আয়না। মৃত্যুঞ্জয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষটার স্বপ্নের কথা বহুবার শুনেছে শুভ। অবনীর সঙ্গে তার এত কেন খাতির বুঝতে পারে সে। এক অভাবী আরেক অভাবীর দুঃখ বোঝে। ওদের দুজনের দেখা হলে কথা আর শেষ হতে চায় না। মুখোমুখি বসে ওরা দুটিতে ভসভসিয়ে বিড়ি টানে। কখনও মন হলে অবনী গিয়ে মুড়ি আর চপ কিনে আনে দু ঠোঙ্গা। তেল জড়ানো ঠোঙ্গায় পৃথিবীর সব সুখ বুঝি চুঁইয়ে নামে। মৃত্যুঞ্জয় বলে, ছেলেটার একটা পাশ হয়ে গেলে বাঁচি। শিবনাথবাবুর হাতে পায়ে ধরে ইস্কুলের লেখা-পড়া কাজে লাগিয়ে দেব।
