-তোমার তো হয়ে এল দাদা, আমারটা যে কি করবে কে জানে।
–শুভ তো পড়াশোনায় ভালো। অত চিন্তা করছ কেন?
চিন্তা কাউকে ছাড়ে না। মৃত্যুঞ্জয় বেজার মুখে বলল, বান চলে যাওয়ার পর এট্টা খদ্দেরও আসেনি বাবা। কি করে সংসার চলবে ভেবে পাচ্ছি নে। শিবনাথবাবু বলেছিল, মন্ত্রী আসবে। হেলিক্যাপ্টার চক্কর কাটবে। বস্তা বস্তা চাল গম চিড়া কেউ তার কিছু পেল না! এখন ঘর খরচের পয়সা জুগাতে মনে হচ্ছে বুকের হাড় বাঁধা দিতে হবে।
অভাব একটা আগুন। অভাব সব খায়। মৃত্যুঞ্জয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শুভর মনে হল অভাবের লেলিহান শিখায় মানুষটা বুঝি ঝলসে গেছে।
মৃত্যুঞ্জয় ঢোক গিলে নিয়ে শুভকে বলল, বানে তোমরা বড় কষ্টে ছিলে এ সংবাদ আমি লোকের মুখে শুনেছি। কিন্তু কাছে গিয়ে তোমাদের কোনো কাজে লাগতে পারিনি। বাজারের ভেতর দিয়ে যা জলের সোরত, ঘাস ফেললে নিমেষে তা দু টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। তবু সঞ্জয় বলছিল সে গিয়ে তোমাদের সাথে করে নিয়ে আসবে। আমি তাকে যেতে দিইনি বাবা। আসলে কি জানো? জলকে আমার বরাবরের ভয়। জল নিজের কথা ছাড়া কারোর কথা শোনে না।
এ প্রসঙ্গে শুভর আর কথা বলার ইচ্ছে ছিল না, সে অলসভাবে অন্য কথায় চলে গেল, · আমি এখন আসি কাকা। ঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে। লিটনদাকে বলল আমি ওর সঙ্গে পরে দেখা করে নেব।
লিটন সঞ্জয়ের ডাক নাম। ইস্কুলের সবাই ওই নামে তাকে বেশি চেনে। লিটন চরিত্রটি কারোর সঙ্গে মেলে না। তার ভেতরে একটা সবজান্তা গোছের ভাব আছে। মহাকাশ থেকে নিয়ে পাতাল অবধি তার জ্ঞানের পরিধি। কোনো বিষয়ে সে মন্তব্যহীন থাকা পছন্দ করে না। সব বিষয়ে তার জ্ঞান ফলানো চাই-ই-চাই। সেই কারণে হেডমাস্টারমশাই তার উপর ভীষণ বিরক্ত। অমলকান্তি স্যারও মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে ওঠেন লিটনের ব্যবহারে
কেউ হাঁপিয়ে উঠল কিংবা বিরক্ত হল তাতে লিটনের কোনো কিছু যায় আসে না। সে তার গলার চড়া ঘরে প্রভুত্ব করতে অভ্যস্ত। ভর টিনের এসব গুণ ভালো লাগে না, সে ভালোবাসে লিটনের প্রতিবাদী সত্তটাকে। শিবনাথবাবুর মুখের উপর গলা চড়িয়ে কথা বলার স্পর্ধা রাখে এই ইস্কুলের একমাত্র লিটন। সে নির্ধিধায় বলবে, যান, যান, আপনার মতো সেঁকা রুটি মানুষকে আমার জানা আছে। ক্ষমতার লোভে আপনারা সব করতে পারেন। যারা ভাইপোকে ছেলে সাজিয়ে ইস্কুলের সেঁকা রুটি হয় তাদের মন যে কত বড়ো হিমালয় তা আমার জানা আছে।
শিবনাথবাবু অবিবাহিত। ইস্কুলের সেক্রেটারি হতে গেলে প্রাথমিক শর্ত হল ওই ব্যক্তির ছেলে-মেয়েকে এই ইস্কুলে পড়তে হবে। ছেলে-মেয়ে না থাকলেও তিনি যে কারোর লিখিত অভিভাবক এমন সত্যতা অবশ্যই থাকতে হবে। প্রথমটা সম্ভব না হওয়ায় ক্ষমতার লোভে দ্বিতীয় পটাই অনায়াসে বেছে নিয়েছেন শিবনাথবাবু। এতে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না।
মানুষকে বোকা ভাববার এত কারণ নেই। জেগে ঘুমানো মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে। মৃত্যুঞ্জয় হালদারের ছেলের মতো অনেকেই ঘুম ভেঙে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। তারা ক্ষমতার স্বচ্ছতা এবং বিকেন্দ্রিকরণ পছন্দ করে। লিটনও তাদের মধ্যে একজন। সে নিজে গরিব বলে বিদুর আর লাবণি রাজোয়ারের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। কিছু শব্দকে বিকৃত করে লিটন নিজের মতো করে বলতে ভালোবাসে। যেমন সেক্রেটারি শব্দটাকে সে সবসময় সেঁকা রুটি বলে বলতে ভালোবাসে। শব্দকে বিকৃত করতে তার মতো ওস্তাদ আর কেউ নেই। লিটনের এসব ভাষণ মৃত্যুঞ্জয়কে মোহিত করে দেয়। আগামী দিনের স্বপ্নে তার চোখ কামরাঙার মতো রঙিন হয়ে ওঠে। সত্যিই লিটন কোনো বাঁশের পলকা লাঠি নয়, সে একেবারে ইস্পাত। এই বয়সে ছেলেটা যে জ্ঞানের অধিকারী হয়েছে হালদার বংশে এর আগে কেউ তা অর্জন করতে পারেনি।
অন্ধকার নেমে এলে মন খারাপের পোকাগুলো ঝিঁঝি পোকার মতো কানের পর্দায় ভাসতে থাকে। বিরক্তিকর টানা সেই শব্দ। কদবেলতলার কাছে এসে হাঁপিয়ে উঠল শুভ। বাঁ-পাশের টালি কারখানাটা কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে ধুকছে। যত অন্ধকার সব যেন বুকের খোদলে ঢুকিয়ে নিয়েছে কারখানাটা। এক ঝলক হাওয়া আসতেই পাকা কদবেলের গন্ধটা আছড়ে পড়ল শুভর নাকের উপর। পাতার ঘোমটায় ঢাকা পড়া পুরুষ্ট কদবেলগুলো নতুন বউয়ের দৃশ্যমান ফরসা মুখের মতো।
এই কদবেল গাছটার গোড়ায় দাঁড়ালে আকাশ দেখা যায় সম্পূর্ণ। বাঁশঝাড় কারখানা পরিত্যক্ত-পোড়ে কোথায় যেন একটা শ্বেতখরিস আত্মগোপন করে আছে। অনেকেই তাকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে।
এতদিন, এত বছর হল তবু শুভ কোনোদিন দেখতে পায়নি সাপটাকে। শুধু গল্পকথায় জীবন্ত হয়ে আছে খেতখরিসের ফণা তোলা মাথা। শুভ হাসাপাতালের গেট দিয়ে নামতে গেলে একটা চাপা মেয়েলী কণ্ঠস্বর তার কানে এসে বিধল। বাঁকা, হেলে পড়া খেজুরগাছটার আড়ালে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুজন। মেয়েটা তার সমস্যার কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছে। যার সারমর্মবান বন্যায় মরে আচি গো। এট্টা ছাগল ছিল, তাও বেচে দিলাম জলের দরে। ছেলেটারে নিয়ে সার আর চলতে চায় না। বানে আমার কারবার সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। এখন আর কেউ আমার কাছে মদের জন্যি আসে না। জল যতদিন না টানবে ততদিন এই দুর্ভোগ।
