বন্যার জল সরে গেলেও দাগ সরে না।
হাসপাতালের দেওয়ালের পলির দাগ নারকেল ছোবড়া দিয়ে ঘষে ঘষে তুলহিল অবনী। সেই সকাল থেকে কাজে লেগেছে, দম নেবারও ফুরসত পায় নি। মাঝে শুভ এসে তার জলখাবার দিয়ে গিয়েছে। কুমড়োর তরকারি আর তিনখানা রুটি। বাটিতে খবরের কাগজ ঢাকা দেওয়া। এসময় মাহি ভয়ানক উপাত করে, মোগ ছড়ায়। ডুবো ঘাস খেয়ে গোরু-ছাগলের অবস্থা খারাপ। পেট ছাড়ছে অনেকের।
খবর এসেছে দোয়েম আর চরসুজাপুরে বমি আর পাতলা বাহ্যি শুরু হয়েছে পাড়া জুড়ে। কারোর আবার গলা ফুলে ব্যামো, কারোর চুলকানি আর দাদ হাজা। সেই সঙ্গে জ্বরজালার কোনো ঘাটতি নেই। এত স্টাফ নেই যে ডাক্তারবাবু সব জায়গায় লোক পাঠাবেন। সাইকেল ঠেলে দোয়েম গিয়েছেন টিকেদারবাবু, সেই সকালে গিয়েছেন, এখনও তিনি ফেরেননি। তিনি না ফেরা পর্যন্ত রীতিমতন চিন্তায় আছেন ডাক্তারবাবু।
অবনী দেয়াল ঘষতে ঘষতে থামল, চেয়ারে বসা ডাক্তারবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে অকপটে জিজ্ঞাসা করল,বাবু, কি ভাবছেন তখন থেকে? কোয়ার্টারে চলে যান, আর মনে হয় রুগী আসবে না।
সেই সকাল থেকে আউটডোর খুলে বসে আছেন তিনি। জ্বরজ্বালার দু-দশজন যা ওষুধ নিয়েছে, এর বেশি কেউ আর আসেনি। কাদাজল ঠেলে হাসপাতালে আসা এখন ঝক্কির।
হাই তুলে ডাক্তারবাবু বললেন, বাসায় গিয়ে আর কি হবে? ওখানে গেলে হাসপাতালের চিন্তা হয়। আমাদের চাকরিটায় শুধু চিন্তা ছাড়া আর কিছু নেই।
অবনীর কণ্ঠস্বরে আনুগত্য ঝরে পড়ল, তা যা বলেছেন বাবু। আমার বাবা বলত-বড়োগাছে ঝড় বেশি লাগে। তা বাবু, আপনি হলেন বড়া গাছ। আমাদের বাপ- মা। আপনার তো চিন্তা হবেই।
চেয়ারে মাথা দিয়ে স্বস্তির সন্ধান করছিলেন ডাক্তারবাবু। দুজায়গায় কলেরার খবর তার সেই স্বস্তি-শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আজ বিকেলে থানায় যাওয়া দরকার। ওয়ারলেসে সি. এম. ও. এইচ-কে খবর দেওয়া দরকার। ওপরওয়ালাকে না জানিয়ে রাখলে পুরো দায়টা পরে তার ঘাড়ে চলে আসবে। চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টা সবার আগে তাকে ভাবতে হবে।
অবনী ভাবছিল ডাক্তারবাবু চলে গেলে হাত ধুয়ে এসে সে টিফিনটা আরামে খেতে পারত। ডাক্তারবাবুর সামনে তার খেতে কেমন সংকোচ হয়। হাজার হোক এই হাসপাতালের মাথা বলে কথা। তার কলমের দু খোঁচায় অবনীর বদলি অবধারিত।
এর আগে নগরউখড়ায় থাকার সময় এক পেসেন্ট পার্টির সঙ্গে তার ঝুটঝামেলা হয়েছিল। যার সাথে ঝামেলা সে দলবল জুটিয়ে অবনীকে মারার জন্য তৈরি ছিল। অবনীও ছেড়ে কথা বলত না। রাগ তার শরীরেও আছে। বিপদের আঁচ পেয়ে ডাক্তারবাবু মিটমাট করে দিলেন সেবার। হাতে হাত মিলিয়ে শান্ত হল ওরা।
সেদিনের সেই ঘটনাটা প্রায়ই মনে পড়ে অবনীর। নগরউখড়ার অনেক স্মৃতি সে এখনও মন থেকে মুছতে পারেনি। চাকরির প্রথম জীবনটা জন্মদাগের মতো, কিছুতেই মেলায় না। স্মৃতি কাতরতায় ডুবে থাকে।
ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার পর ঝটপট টিফিন করে নিল অবনী। এতগুলো ঘরের সাফ-সুতরো করার দায়িত্ব তার। বন্যা চলে গেছে কিন্তু পচা ভ্যাপসা গন্ধটা রেখে গেছে। আশপাশে ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়েও কোনো লাভ হয়নি। মশা মাছি পচা জলের ঘ্রাণে ধেয়ে আসছে। চড়া রোদ না উঠলে এসব আর দূর হবে না।
ছ-সাতটা দিন ছাদে কাটানোর অভিজ্ঞতায় বেশ ঝানু হয়ে গিয়েছে অবনী। চোখের পর্দা সরে গিয়ে মানুষের আসল রূপ চিনতে পেরেছে সে। বিপদের দিনে কেউ কারোর নয়–এ কথাটা আর একবার তার কাছে প্রমাণ হল। একটা চাপা দুঃখ তার ভেতরে পচা পাকমাটির মতো বিছিয়ে আছে। এই দুঃখটা ধীরে ধীরে শুভর মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে। সেও ভীষণ মনমরা আর বিষয়। শুধু রঘুনাথ ছাড়া আর কেউ তার খোঁজ নেয়নি। খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। কেন করেনি? এ প্রশ্ন কোনোদিনও শুভ মুখ ফুটিয়ে করেনি। শুধু সরস্বতী আক্ষেপ করে বলল, যাদের আপন ভাবতাম তারা চোখ সরিয়ে নিল। শুধু ভগবান ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।
অভিমানের কথায় মনের ভীষণ অসুখ করে। সেই অসুখ সারতে সময়ও লাগে। মাধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে শুভর এই কথাগুলোই মনে পড়ল বারবার করে। মাধুরী কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, দেখ শুভ, আমার কিছু করার ছিল না। তুই আমাকে ভুল বুঝিস না।
শুভ কি বলবে? কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় সে ছিল না। শুধু তার ঠোঁট কেঁপে উঠল, অভিমানে ভার হয়ে এল গলা, না রে, মনে করার কি আছে, যা স্বাভাবিক,যা হবার তাই হয়েছে।
-এ তোর রাগের কথা।
মাধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে শুভর কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল, পুরনো কথা ভুলে যা। বল কি জন্য এসেছিস?
-আমাকে বসতে বলবি নে?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ বস না। শুভ পেতে রাখা খাটটা দেখিয়ে দিল।
উশখুশিয়ে মাধুরী বলল, স্কুল খুললেই পরীক্ষা। কিছু পড়া হয়নি। কী যে করব।
-পাকা বাড়িতে ছিলিস অথচ পড়িসনি কেন?
–সত্যি কথা বলব?
–হ্যাঁ, বলতে পারিস।
-তোর কথা ভেবে আমার খুব মন খারাপ করত। অনেকবার বই নিয়ে বসেছি, কিন্তু পড়ায় মন বসাতে পারিনি। আচ্ছা, তুই কি একবারের জন্য আমার কথা ভেবেছিলিস? খুব নিচু গলায় কথাগুলো বলে তাকাল মাধুরী।
এসব কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া হল না শুভর। মৃদু হেসে সে বলল, মন থাকলে তা খারাপ করে। এ আর নতুন কি?
