ভিকনাথ একটা সমাধান চাইছিল দ্রুত। সে নিঃশাস ফেলে বলল, রঘু, এই ব্যাপারে তোর কি মত?
একটুও ভাবল না রঘুনাথ, মার যা মত আমারও তাই মত।
–তাহলে তো আর কথা নেই। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য। ভিকনাথ স্বস্তির খাস ছেড়ে এগিয়ে গেল পিটুলিগাছটার গোড়ায়। ঠিক হয়েছিল বাধের ধারের এই গাছটা কেটে দাহ করা হবে গুয়ারামকে।
কুড়ল হাতের লোকটাকে ভিকনাথ বলল, এসো গো, আর গাছ কাটার দরকার নেই। ঘরের মানুষ ঘরেই থাকুক সেই ভালো।
চুনারাম বলল, পয়সা কড়ি জমলে গুয়ার সমাধিটা আমি পাকা করে দিব।
কোপে কোপে মাটি কাটছিল দুজন। রঘুনাথের মুখে কোনো কথা নেই। সে জানে আর একটু পরে একটা মানুষ মাটি চাপা পড়ে যাবে অনন্ত সময়ের জন্য। মাস তিনেক পরে শুধু হাড়গোড় ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। মানুষ জীবনটা বড়ো আশ্চর্য মনে হল তার কাছে।
রাতের আঁধারে বুড়িগাতের দিকে তাকালে সে-ও বুঝি কিছু বলতে চায়। কি বলতে চায় সে? রাতের ভাষা বোঝা গেলেও গাঙের ভাষা বোঝা যায় না।
ভোররাতে সব যখন শান্ত হয়ে গিয়েছে তখন সদ্য খোঁড়া সমাধিটায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল রুদ্রাক্ষ। হাত মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। পাড়ার কুকুরগুলো সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। চাপা গলায় কুকুরগুলোকে সংযত হতে বলছে রুদ্রাক্ষ। ওরা কথা শোনার মন্ত্র জানে না। বিকট চিৎকারে পাড়া মাথায় তুলে চেঁচাতে লাগল।
সারা দিনের ধকলেও ঘুম আসেনি রঘুনাথের। নিঃশ্রুপ পায়ে সে বিছানা ছেড়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। আবছা আলো-আঁধারে বাঁশ গাছ থেকে ভেসে আসছে ভৌতিক শব্দ। রঘুনাথ রোজ শোনে তবু আজ তার গা কাটা দিয়ে উঠল, কে, কে ওখানে?
–আমি রে রঘু। কাঁপা কাঁপা উত্তর ভেসে এল হাওয়ায়।
–আমি কে? নিরীহ গলায় জিজ্ঞাসা করল রঘুনাথ।
–আমি রুদ্রাক্ষ।
জবাব শুনে সারা গায়ে বিদ্যুৎ-এর শিহরণ নেচে গেল রঘুনাথের। টোকে গিলে সে বলল, অসময়ে এলে যে।
-বিপ্লবীদের কোনো সময় অসময় থাকতে নেই। রুদ্রাক্ষ চোখ রগড়ে নিয়ে টিবি হয়ে যাওয়া মাটির দিকে তাকাল। ঊাই করা মাটি দেখে সে একটু অবাক হয়ে শুধোল, এখানে এত মাটি কাটা হয়েছে কেন? এভাবে উঠোন কেউ কি কাটে?
-ওখানে আজ বাবাকে কবর দেওয়া হল। রঘুনাথের চোখ জোড়া আর্দ্রতায় ভরে গেল।
রুদ্রাক্ষ ব্যথিত হয়ে বলল, ওঃ, সরি
রঘুনাথ কিছু বুঝল না, অন্ধকারে ওর চোয়াল কঠিন হয়ে উঠছিল। চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলল, আজ এই মৃত্যুর জন্য তুমার বাবা দায়ী। সে আমার বাপের বুকে জোড়া পায়ের লাথি মেরেছিল। সেই থিকে মানুষটা আর এক দিনের জন্যও হাসেনি। বড়ো অভিমান নিয়ে মানুষটা চলে গেল।
রুদ্রাক্ষ অন্ধকারেই মুখ ঢাকা দিল দুহাতের আড়ালে। কথা হারিয়ে সে মাটির চেয়েও নীরব থাকল অনেক সময়। রঘুনাথ চিৎকার করে বলল, এখুন আর মাঝরাতে যাত্রা করে কুনো লাভে নেই। তুমি যেমন এসেচো তেমন চলে যাও। হলদিপোঁতার মানুষ জাগলে তুমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে।
রুদ্রন নিজের মাথার চুল দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, মরতে আমি ভয় পাই না। এসেছি যখন একবার তোমার মায়ের সাথে দেখা করে যাব। বাবার হয়ে ক্ষমা চেয়ে তার পাপের ভাগ আমি কিছুটা কমাতে চাই।
-সে সুযোগ তুমার আর হবেনি গো। তুমি ঘুরোন যাও। আর এগিও না।
–কেন?
–আমি এর বদলা নেব।
–তুমি একা কেন, আমিও তোমার সঙ্গে থাকব। চলো।
গল্পের মতো কথাগুলো শোনাল রঘুনাথের কানে, সে অবিশ্বাসের চোখে তাকাল। রুদ্রাক্ষ বলল, তোমার বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস না হবারই কথা। এই নাও। বলেই সে কোমরে গোঁজা রিভলভারটা ছুঁড়ে দিল রঘুনাথের দিকে, লোড করা আছে। চাইলে তুমি আমাকে খতম করে দিতে পার।
রঘুনাথের হাত কাঁপছিল। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তাকে স্বপ্নেও ভাবেনি সে। রুদ্রাক্ষ পায়ে পায়ে এগিয়ে এল তার কাছে। হাত বাড়িয়ে ধরলো রঘুনাথের হাত, তুমি আমার ভাইয়ের মতো। আজ তোমার মনের কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি। বাবাকে ছোট থেকে দেখছি। তার মতো অত্যাচারী মানুষ আর হয় না। উচ্চবর্ণের মানুষ বলে গর্বে মাটিতে তার পা পড়ে না। চলো কমরেড, আজ সেই বুর্জোয়া মানুষটাকে খতম করে আসি। অমন মানুষকে বাঁচার অধিকার দিলে সমাজের আরও ক্ষতি হবে।
নিজের বাবাকে নিজে মারতে পারবে?
আমার কাছে বুর্জোয়ার কোনো সংজ্ঞা নেই। খতমের রাজনীতিতে আমরা বুর্জোয়াদের সবার আগে রেখেছি।
রঘুনাথ কথা না বাড়িয়ে পুরনো খড়গাদাটার দিকে এগিয়ে গেল। হাত ঢুকিয়ে খড়গাদার ভেতর থেকে বের করে আনল রিভলভারটা। রুদ্রাক্ষকে রিভলভারটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, তুমার এই মেসিনটার জন্যি আমি কুথাও ভোলা মনে যেতে পারতাম না। হলদিপোঁতায় বন্দি হয়েছিলাম এতকাল। আজ আমার বুকের বোঝা নেমে গেল। এবার তুমি যেতে পারো।
কোথায় যাব, আমি তো তোমার কাছে এসেছিলাম। নাহলে এত ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ঢোকার কোনো অর্থ হয় না।
আমি এত ছোট যে তুমার মতোন মানুষের সাথে থাকতে পারবো নি। রঘুনাথের হাতটা ব্যাকুল হয়ে জড়িয়ে ধরল রুদ্রাক্ষ, আমাকে ভুল বুঝো না। তোমাদের কথা ভেবে আমি অনেক কষ্ট পাই। নিজের কষ্ট দূর করার জন্য আমার এই সংগ্রাম আমৃত্য চলবে। আজ আসি ভাই। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।
অস্ত্রটা নিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল রুদ্রাক্ষ।
১১. বন্যার জল
৫১.
