বাবার বুকে মাথা দিয়ে রঘুনাথ শুনতে চাইল জীবনের পদাবলি। কোনো ছন্দ নেই, ঢেউ নেই–শুধু নিথর একটা দেহ আঁকড়ে কান্নায় ডুবে গেল এক আগুন যুবক।
সবাই মাটি পায় না, সবার ভাগ্যে শ্মশান জোটে না।
মানিকডিহির শ্মশান গিলে খেয়েছে বড়ো গঙ্গা। ঘোলা জল পাগলা ষাঁড়ের মতন দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুরো সাহেবমাঠ। কবে যে তার রাগ পড়বে কে জানে। মানুষ এখন ভয়ে এদিকে আসে না। জলের সাথে আর যাই হোক বন্ধুত্ব করা যায় না।
গুয়ারামকে দাহ করা হবে কোথায় এই নিয়ে চুনারাম আর মুনিরামের নিচু গলার আলোচনা আর থামছে না। রঘুনাথ পাগলের মতো ঘুরছে এদিক সেদিক, তারও মাথার কোনো ঠিক নেই। বুক ভরে গেছে একরাশ শূন্যতায়। মাঝ পথ থেকে ফিরে এসেছে অ্যাম্বুলেন্স। ভিকনাথ চোখের জলে কাতর হয়ে বলল, ফিরে চলল গো ড্রাইভারদা। যে মন্দিরে ঠাকুর নেই সেই মন্দিরের আর কি দাম? দুর্গামণি কাঠ হয়ে গিয়েছে শোকে। কেঁদে কেঁদে তার আর এখন শব্দ করে কাদার কোনো ক্ষমতা নেই। রঘুনাথের দিকে পাথর চোখে তাকিয়ে সে যেন কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো ভাষা বেরল না, শুধু অস্পষ্ট গোভানীর শব্দ বেরিয়ে এল। আর রঘুনাথও চাইছিল না দুর্গামণির মুখোমুখি দাঁড়াতে। মার কাছে গেলে সেই একই কথা উগলে দেবে সে।
-নীলুবাবুকে হাড়বিনে, ও তোর বাপকে খুন করেছে। আমার বুকের দুধ যদি তুই খেয়ে থাকিস তাহলে আমার সিদুরের হিসাব চুকিয়ে নিবি। কথা দে।
.
শ্লেটের মতো মেঘ করেছে আকাশে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় শীত গন্ধ। পাতা আর ঘাস পচার গন্ধগুলো নাক সয়ে নিয়েছে এতদিনে।
দুলাল গিয়েছিল বড়ো গঙ্গার ধার। সে ফিরে এসে হতাশ হয়ে বলল, হরদার সাথে দেখা হল। গোরা সাধুর মতো এটা গাছে চড়ে বসে আছে। নামতে বলতেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর মুখে শুনলাম–এখন আর মড়া পুড়ছে না শ্মশানে। মা গঙ্গার নাম নিয়ে গাভের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে লাশ। আসলে কি জানিস ডাঙা কুথায় যে মানুষ পুড়বে।
গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়ানো মানুষগুলো হাঁ হয়ে কথা শুনছিল ওর। শীতল হাওয়ায় নড়ে চড়ে উঠতেই রঘুনাথ ঠাণ্ডা গলায় বলল, একটা কিছু তো করতে হবে। তুমরা সবাই মিলে যে রায় দেবে আমি তা মেনে নেব।
এবার ভিড়টা একে অন্যের দিকে চকচকে চোখে তাকাল। কেউ আবার স্তব্ধ হয়ে রইল কিছু সময়। ভিকনাথ ওদের ভেতর থেকে ঠেলে উঠল। গলা চড়িয়ে বলল, পোড়াব যে তেমন ভাঙা নেই। অথচ গুয়াদা ভেষণ মাটি ভালোবাসত। জীবনের বেশির ভাগ সময় মাঠের কাজে তার চলে গেল। আমার মনে হয় বাসি না করে লাশ ভাসিয়ে দিলে ভালো হবে।
পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসেছিল দুর্গামণি। আলোচনার সব কথা তার কানে ঢুকছিল। মানুষটাকে ভাসিয়ে দেবে, কেন? শরীর রিরি করে উঠল দুর্গামণির। নীরবতা ভেঙে সে চেঁচিয়ে উঠল সজোরে, না-আ-আ। ওরে তুমরা ভাসাবে না।
তাহলে কি করতে চাও বৌদি? দুলাল গলা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল। রঘুনাথ কাঁপাকাঁপা শরীরে এগিয়ে এল দুর্গামণির সামনে, মা, তাহলি পরে তুমি কি চাইচো খোলস করে বলল। আর দেরি করা যাবে না। বেলা ফুরলো বলে।
দুর্গামণি কি খেয়ালে নিজের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল। চিন্তায় তার মাথা বনবন করছিল। কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে গেছে গালে। এলোমলো চুলগুলোয় তাকে বড় অস্বাভাবিক দেখায়। ভিনাথ সাহস করে তার সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, গাঙে ভাসালে তুমার আপত্তি কেন, বউদি?
সাপের ফণা আছড়ানোর মতো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়াল দুর্গামণি, রঘুর বাপকে কি সাপে কামড়েছে যে মানুষটাকে গাঙের জলে ভাসিয়ে দেবে? তুমরা কেমন মানুষ, এমন কথা বলছো কি করে?
হতচকিত শোক কাতর মুখগুলো সাদা হয়ে গেল নিমেষে। চুনারাম মাটিতে ভর দিয়ে উঠে। দাঁড়াল কোনোমতে। পুত্রশোক তার চোখের জল শুকিয়ে দিয়েছে। এই বয়সে কাঁদলে মনে হয় এক্ষুনি আকাশ ভেঙে পড়বে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, বউমা, মাথা ঠাণ্ডা রাখো। দশে যা বলছে তাই মেনে নাও।
-না, আমি মানতে পারব না।
–তাহলে কি করতে চাও তুমি? বাসি মড়া ঘরে আগলে রাখবে? চুনারামের বুকের গভীরে পাথরের স্তব্ধতা ছেয়ে গেল। ঘাড় ঝুঁকিয়ে একবার সে সবার দিকে তাকিয়ে নিয়ে শরীরের ভারে ঝুপ করে বসে পড়ল মাটিতে। কান্না ঠেলে উঠল তার গলায়। কান্নর ভাষা বোঝা গেল না, শুধু ক্ষীণ একটা গোঙানী আছড়ে পড়ল বাতাসে।
দুর্গামণির বুকের ভেতরটা টনটন করছিল শোকে-দুঃখে। না সামলাতে পেরে সে অবোধ স্বরে কাতর হয়ে বলল, ঘরের মানুষকে জলে না ভাসিয়ে ঘরের উঠোনে মাটি দাও। এতে তার সদগতি হবে। আমাদের চোখে চোখে থাকবে মানুষটা।
–কি করে সম্ভব? কেউ কিছু বলার আগে চুনারামই গলা ফাটাল। দুর্গামণি বিচলিত হল না, শুধু আহত চোখে তাকাল, ধাওড়াদের এমন চল অনেক বস্তিতে আচে। বামুনরা যদি সমাধি দেয় তাহলে আমাদের দিলে দোষ কুথায়? কামারী, দোয়েমের লোকেরা মরা মানুষকে করে নিয়ে যায়। মাটির শরীর মাটিতে মিশে গেলে আত্মা নাকি পাখি হয়ে ওড়ে।
সবাই হাঁ হয়ে শুনল দুর্গামণির যুক্তিগুলো। রঘুনাথ ভাবছিল তার মায়ের বুদ্ধির কথা। দেখে মনে হয় হাবাগোবা, অথচ সময়ে জ্বলে উঠতে জানে। মায়ের এই যুক্তিকে একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না।
