দুলাল আর ভিকনাথ ভয় পেয়ে ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে এল, হাঁপাতে হাঁপাতে দুলাল শুধাল, কি হল আবার?
-বাবা আর দেড়তে পারছে না।
–খাওয়া-দাওয়া না থাকলে মানুষ কি দেড়তে পারে রে! হাওয়ায় তো গায়ের জোর বাড়ে ।
ভিকনাথ শুনছিল। রঘুনাথকে সাহস দেওয়ার জন্য সে বলল, সামান্য জ্বরজ্বালা হলে মানুষ হাঁটতে চলতে পারে না। আর এতে হল কাশরোগ! তবে আজকালকার দিনে এরোগ কোন রোগ নয়।
গুয়ারামের হাঁটাচলা করার ক্ষমতা নেই, তাকে খাটিয়া অবধি কোলোজা করে নিয়ে যেতে হবে। অত বড়ো মানুষটাকে কোলপাজা করে খাটিয়া অবধি নিয়ে যাওয়া মুখের কথা নয়। রঘুনাথকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল দুলাল আর ভিকনাথ। ধরার সময় বুকের কাছটাতে চাপ লাগতেই অব্যক্ত যন্ত্রণায় গুমরে উঠল গুয়ারাম। এবার সে আর তার বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না, তোরা যা তো ইবার। মরা মানুষটাকে নিয়ে আর টানহিঁচড়ে করিস নে। আমার শরীলে আর সে বল নেই। অসুখের উইপোকাটা আমাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।
বাঁধে বাঁধে গিয়ে পুরাতন বাজারের ঢালু পথটায় নেমে গেল ওরা। ওখানে চারটে খাম্বা পুঁতেছে ইলেকট্রিক অফিসের লোকে। শোনা যাচ্ছে ট্রান্সফরমার বসবে। কাজ পুরো হয়নি। কাজ শেষ হলে বাতি জ্বলবে বাজারে। গমকলগুলো আর ডায়নামোতে চলবে না, সুইচ-টেপা কারেন্টে চলবে।
ওদের দেখে অত রাতে এগিয়ে এল হারাধন চৌকিদার। তার হাতের লাঠিটা তার চাইতে লম্বা। রোগা খিটখিটে মানুষটার গোঁফ দুটো দেখার মতো। ইলো মুখে গোঁফ দুটো তার আসল সম্পদ।
লাঠি ঠুকে শুধোল,কারা গো তুমরা?
–আজ্ঞে, আমরা হলদিপোঁতা ধাওড়ার।
–কি হয়েছে? খাটিয়ায় কে আছে?
–উগী আচে গো, উগী।
-আগে নামাও। তারপর অন্য কথা। হারাধন চৌকিদার গলা চড়াল। পাশেই থানা। থানার সঙ্গে তার বেশ দহরম মহরম।
অবশেষে খাটিয়া নামাল ভিকনাথ আর দুলাল। কাঁধ রগড়ে নিয়ে তারা একটু আরাম করার জন্য দেহটাকে আলগা করে দিল। তিন ব্যাটারির টর্চ জ্বেলে হারাধন চৌকিদার ঝুঁকে পড়ে বলল, শুয়ে আছে যে, কি হয়েছে ওর? সাপে কেটেছে বুঝি?
বান বন্যায় এছাড়া আর বিপদের কোনো কারণ খুঁজে পেল না হারাধন চৌকিদার। এ পথ দিয়ে রাত-বেরাতে যে কটা রুগী গিয়েছে প্রায় সব কটাই তো সাপে কাটার কেস। রাতে সাপে কাটলে জান চটকে ছেড়ে দেয়।
রঘুনাথের হাতে হ্যারিকেন টিমটিম করে জ্বলছিল,সে কপা এগিয়ে এসে বলল, সাপে কাটেনি গো, এর কাশব্যামো। বুকে বেদনা হয়। কাশলে মুখ দিয়ে অক্ত বেরয়। এবার কপাল কুঁচকে ভয়ে তিনহাত পিছিয়ে গেল হারাধন চৌকিদার, রোগটাতো ভালো নয়, বড্ড ছোঁয়াচে! কালীগঞ্জের লোক এ রোগটাকে টি.বি বলে।
হারাধন চৌকিদার আধুনিক হতে চাইল, তাহলে এমন কঠিন অসুখ নিয়ে তোমরা কোথায় যাবে ভাবছ?
হাসপাতালে যাবো গো।
-হাসাপাতাল তো সেই কবে থেকে বন্ধ। বাঁধ যেদিন ভাঙল সেদিন থেকে শিবনাথ বাবুর বাড়িতে বড় ডাক্তার আশ্রয় নিয়েছেন।
-তাহলে এখন উপায়? দুলাল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল।
–উপায় একটা আচে। ষষ্ঠীতলার শিবনাথবাবুর কাছে নিচতলায় দিনমানে অনেক লোক আসে ওষুধ নিতে। তোমরা ওখানেই চলে যাও। আমার মন বলচে ওখানে গেলে কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
অন্ধকারের মধ্যে সামান্য আলোর চিহ্ন বদলে দিল ওদের গতিপথ। রঘুনাথ আগে আগে হাঁটছিল। তার হাতে দুলছে হ্যারিকেন। মাঝে মাঝে দপদপ করছে আলোর শিস।
আমি শিবনাথবাবুর ঘরটা চিনি। তোমরা আমার পেছন পেছন আসো। রঘুনাথের কথায় আবার খাটিয়াটা ঘাড়ে চাগিয়ে নিল ভিকনাথ আর দুলাল। বাজারে জল বেশি নেই তবু মাঝে মাঝে হাঁটু ডুবে যায়, কোথাও আবার চেটো ডোবা জল চিকচিক করছে আলো আঁধারির খেলায়।
ডাক্তারবাবু গুয়ারামকে পরীক্ষা করে দেখলেন, তারপর মুখ শুকিয়ে বললেন, অনেক দেরি করে এনেছেন, এখানে কিছু করা যাবে না। ইমিডিয়েট চেস্টের একটা এক্স-রে দরকার। কৃষ্ণনগর ছাড়া এ কেসের প্রপার ট্রিটমেন্ট হবে না। আমি একটা কাজ করতে পারি। কাল সকাল হলে একে অ্যাম্বুলেন্সে করে আমি সদরে পাঠিয়ে দিতে পারি।
–তাই করুন ডাক্তারবাবু, আমরা তৈরি হয়ে এসেছি। কখন সকাল হবে এই ভাবনায় অস্থির হয়ে পড়ছিল ভিকনাথ। বারবার সে ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল। বিপদের রাত বুৰি তাড়াতাড়ি ফুরোয় না।
কথাগুলো আচ্ছন্ন ওয়ারামের কানে ঢুকেছে কিনা বোঝা গেল না। শুধু হাই তুলে রঘুনাথ বলল, কাকা ভোর হতে এখন ঢের বাকি। চলো, বারোয়ারি তলায় গিয়ে বসি। ওখান কমসে কম মাথার উপর ছাদ আচে।
.
৫০.
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটা খরগোসের মতো ছুটছিল। চৌত্রিশ নাম্বার জাতীয় সড়কে তখনও বন্যার জল গড়িয়ে নামছিল খেতের দিকে। ভাগা পেরতেই কাশির বেগটা ঝাঁকিয়ে দিল গুয়ারামকে, বাবা গো বলে বুকে হাত দিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি সহযোগে কেঁপে উঠল। দলা দলা কাঁচা মাংসের মতো রক্ত উঠে এল মুখ দিয়ে। কাশিটা এত টানা আর দীর্ঘ কেউ তাকে আটকে রাখতে পারল না। পেতে রাখা কাঁথা কানি ভেসে যাচ্ছিল রক্তে।
ভয় পেয়ে চোখ হোট করে রঘুনাথ বলল, ও কাকু, গাড়ি থামাও।
অ্যাম্বুলেন্স রাস্তার এক পাশে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। তখনই স্তব্ধ হয়ে গেল গুয়ারামের জীবন। রঘুনাথের দেওয়া জলটুকুও তার গলা দিয়ে নামল না। দু কোয়াশের পাশ দিয়ে গড়িয়ে গেল বিছানায়।
