রঘুনাথের দীর্ঘশ্বাস অন্ধকারে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
.
রাতে বুকের ব্যথায় পাড়া জাগিয়ে চেঁচিয়ে উঠল গুয়ারাম। বানের জল তখন কমতে শুরু করেছে। পণ্ডিতবিল কানায় কানায় ভরে গিয়ে রাজা মহারাজাদের মতো গম্ভীর। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় জলের সাথে মায়াবী চাঁদের কথা হয় রাতভর।
চুনারাম কঁকিয়ে উঠে বলল, যা রে রঘু, তোর বাপের অবস্থা ভালো বুবচিনে, যা করার অপখপ কর।
দুয়ার গোড়ায় কপালে হাত দিয়ে বসেছিল দুর্গামণি, পাথরের মতো মুখ, চোখ দুটো নিরেট হয়ে আছে দুঃখে। রঘুনাথ কোনোমতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, মা, তুমি কি বলছো?
মুখ তুলে বিষণ্ণ গলায় দুর্গামণি বলল, আমি কিছু বলব না, যা ভালো বুঝিস তোরা তা কর। মানুষটার শরীল কদিন থেকে ভালো যাচ্ছিল না–সেটা আমি টের পেয়েছি। তুই ঘরে থাকলি কতক্ষণ যে তোকে আমি বলব।
কথাটায় সাফাই নয়, ছিল রঘুনাথের উপর অনুযোগ। তর্ক বাঁধানো এসময় উচিত নয় তাই চুপ করে রইল রঘুনাথ। একে একে ওই অত রাতে তাদের উঠোনে হাজির হল দুলাল, ডিকনাথ, বিশু আর পাড়ার কজন। সবার চোখে-মুখে উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা। বুকে তারা যেন আগুনের গোলা নিয়ে ঘুরছে। ভালো মানুষটা নীলাক্ষবাবুর জোড়া পায়ের লাথ খেয়ে নেসকে গেল। এ তো তৈরি করা অসুখ, এর বিহিত দরকার। বাবু বুকের ছাতি ফুলিয়ে ঘুরছে। তার বুকে কে মারবে জোড়া পায়ের লাথি।
ভিকনাথ ফুঁসছিল। রঘুনাথকে বেড়ার ধারে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, টাকার জন্যি ভাবিস নে, তোর কাকিমা এগুলান খুলে দিয়েছে। আগে মানুষটা বাঁচুক। পরে এসব নিয়ে ভাবা যাবে।
আবছা আলো আঁধারে রঘুনাথ দেখতে পেল সোনার গয়নাগুলো। এগুলো সে হাত পেতে নেবে কি করে? পরের সোনা নিলে ফেরত দেবে কিভাবে? তার সে যোগ্যতা কোথায়?
-না কাকা, এ আমি নিতে পারবো নি। রঘুনাথ অসহায়ভাবে ডানে-বাঁয়ে ঘাড় নাড়ল।
–আমি তো দিচ্ছি, তুই নে। পারলে দিবি, না পারলে দিবি না। গয়নার বিনিময়ে মানুষটার জীবনটা যদি বাঁচে-তাহলে এর চাইতে সুখের আর কি হবে। ভিকনাথ মনে প্রাণে চাইছিল গয়নাগুলো দিয়ে দিতে, তোর কাকা থাকলে কি আজ আমাকে এভাবে আসতে হত। তখন সে নিজের কাঁধে দায়-দায়িত্ব তুলে নিত। তাছাড়া গুয়াদা তো আমার আপনজন। আমার নিজের কুনো দাদা নেই। ওই মানুষটাকে আমি জ্ঞানপড়ার পর থেকে দাদার মতো দেখে এসেছি।
রঘুনাথের আর না বলার হিম্মোত হল না। ভিকনাথ কাপড়ে বাঁধা গয়নাগুলো ওর হাতে তুলে দিয়ে বলল, ভালো কাজে ভালো জিনিস লাগলে তবে তা সার্থক হয়। তোর বিপদ তো আমার বিপদ। এই ভাবনাটা যদি মানুষ হয়ে না থাকে তাহলে আর কিসের মানুষ।
রঘুনাথ যত শুনছিল ততই যেন মুগ্ধতা তাকে শুষে নিচ্ছিল। এই মানুষগুলোর উপর কোনোদিন তার আস্থা পূর্ণমাত্রায় ছিল না, আজ সেইসব সংস্কারের বেড়া ভেঙে ওরা যেন হৃদয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে।
রঘুনাথ ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল, দুর্গামণির ফেঁপানীর শব্দে তার সম্বিত ফিরে এল, তুমি কানচো কেনে, মা? বাবার তো কিছু হয়নি। এ কাশি তো মাস দুয়েকের পুরনা।
–সেই জন্যিই তো ভয় বাপ। দুর্গামণি সজোরে ডুকরে উঠল, জল জোলোরা কাশি সেরে যায়, লাথের কাশি কি সারে রে? কাশব্যামোর অক্ত দাবাইয়ে জল হয়–কিন্তু চোট-খাওয়া অক্তের রঙ সহজে ফিকে হয় না। ভয়টা তো ইখানে।
দুর্গামণির জোড়া চোখে টলটল করে জল। চুনারামও সেই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়। ময়লা ধুতির খুঁটে চোখ রগড়ে নিয়ে সে ধরা গলায় বলল, চৌপায়া বার করে দিয়েছি। গুয়ারে নিয়ে সত্বর হাসপাতালে যা। বড়ি আর ইনজিসিন দিলে ছেলে আমার ঠিক হয়ে যাবে।
গুয়ারাম নেতিয়ে পড়েছিল মেঝেতে পেতে রাখা বিছানায়। সবার কথা কানে আসছিল তার। রাতকালে এত মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করা তার ধাতে নেই। চিরদিন অভাব নিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সে। আজ তার বিপদে সবাই এসেছে দেখে সে খুশি। রঘুনাথকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে সে বলল, কাশিটা এখুন কমের দিকে। আমার মন চাইছে না হাসপাতালে যেতে। এই বানন্যায় ডাঙা খেয়ে নিয়েছে জল। যা হয় ঘরেই হোক। তোরা যে যার মতো শুয়ে পড়।
-তা কি হয়। ধকধকিয়ে উঠল রঘুনাথের চোখ, শুধু তো কাশি নয়, কাশির সাথে খুন বেরচ্ছে। এ তো ভালো লক্ষণ নয়, বাবা?
চিঁ-চিঁ স্বরে গুয়ারাম বোতে চাইল, খুন তো সেই চোট পাওয়ার পর থিকে হচ্ছে। এসব নিয়ে আমি আর ভাবিনে। যা হবার হোক। হয় ঘরের খাট নইলে শ্মশান ঘাট। মরতে আমার আর কুনো ভয় লাগে না।
ভিকনাথ উঠোনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকল, কই রে রঘু, দেরি হচ্ছে কেনে? গুয়াদারে ধরে ধরে নিয়ে আয়। অতটা পথ আবার যেতি হবে–
শুয়ারামের মাথার কাছে বসে রঘুনাথ নিচু গলায় বলল, বাবা, এবার দুহাতে ভর দিয়ে উঠে বসো। আমি তুমাকে ধরে ধরে, চৌপায়া অবধি নিয়ে যাবো।
গুয়ারাম কেমন বিপন্ন স্বরে বলল, আমি কি অতটা যেতে পারব?
-কেনে পারবে না, চিষ্টা করো, ঠিক পারবে। কথাগুলো রঘুনাথ জোর দিয়ে বললেও মনের জোর খুঁজে পেল না গুয়ারাম। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে তার শরীর গোবর লাঠির মতো ভেঙে পড়ল।
দেখে শুনে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল রঘুনাথের, কপালে ভাঁজ ফেলে সে ভাঙা ভাঙা স্বরে ডাক, কাকা গো, খপখপ আসো….।
