দ্বীপীর কথা ভাবলে আমার শরীর খারাপ করে না। ও আমার শ্বাস-প্রশ্বাস। জোর গলায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল সূর্যাক্ষ, ওর মুখটা একবার না দেখলে বইয়ের সব পড়া কেমন গুলিয়ে যায়। দ্বীপী আমার সবটা জুড়ে বসে আছে। ও আমার সমুদ্র। কিন্তু ও আমাকে কি ভাবে কি চোখে দেখে তা আমার আজও জানা হয়নি।
আবেগের ধারা বিবরণী চলে ক্রমাগত। রাত্রির বয়স বাড়ার সংকেত বুঝতে পারে না কেউ। নীচের ঘরগুলো থেকে নীরবতা ছাড়া কোনো শব্দ ওঠে না। কপোতাক্ষ ঘরে একা আসেন নি, সঙ্গে করে দু-জন অতিথিকে এনেছেন। ওরা রাতে খাবেন। মীনাক্ষী কপালের ফুটে ওঠা বিরক্তির রেখাগুলোকে যথাসম্ভব লুকিয়ে ফেলে আবার ভাতের জল চড়িয়েছেন উনুনে। কপোতাক্ষর এই স্বভাব বহু পুরনো ব্যাধির মতো, শতবার নিষেধ করেও মীনাক্ষী এর কোনো সুফল পান নি। মানুষটার এই জনহিত করার প্রবণতা বুঝি কোনোদিন অবলুপ্ত হবে না। মীনাক্ষীর বড়ো আশ্চর্য লাগে। কপোতাক্ষকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত রাত করে এলে যে?
রাত হয়ে গেল মীনু। আসলে কী জান, পার্টির কাজ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চেয়েও ঝামেলার। ঘড়ি ধরে এসব কাজ হয় না। কপোতাক্ষ বোঝাবার চেষ্টা করলেন, দেখি কাল থেকে যাতে আর দেরি না হয় সেই চেষ্টাই করব।
এরা কি খাবেন? সংশয় দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন মীনাক্ষী। খুব হালকা মেজাজে হেসে উঠলেন কপোতাক্ষ, জানি এত রাতে তোমার খুব অসুবিধা হবে তবু তুমি আছো বলেই আমি ভদ্রলোকদের সঙ্গে আনতে সাহস পেলাম। তাছাড়া এত রাতে ওরা গোয়াড়ী ফিরে যেতে পারবে না। বাস নেই। কাল সকালে ওঁরা চলে যাবেন।
-খাবেই যখন তখন একটা খবর পাঠাতে পারতে। মীনাক্ষীর গলা থেকে চুঁইয়ে নামল বিরক্তি।
–বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছে।
–এই ভুল তোমার মজ্জাগত। এই ভুল তুমি বারবার করো। কপোতাক্ষ কোনো প্রতিবাদ করলেন না, তিনি জানেন অনেক সময় নীরবতাই সান্ত্বনার মলম।
মীনাক্ষী চলে যাচ্ছিলেন, কী মনে করে ফিরে এলেন, শোন, সূর্যর বন্ধু এসেছে। পারলে রাতেই একবার ছেলেটার সঙ্গে দেখা করে নিও। বড়ো ভালো ছেলে। হলদেপোঁতা ধাওড়ায় থাকে। খাওয়ার সময় ওর মায়ের কথা মনে পড়ছিল বলে ঠিক মতো খেতেই পারল না।
-কী নাম বল তো? কপোতাক্ষ উৎসাহিত হলেন।
–রঘুনাথ রাজোয়ার।
– হ্যাঁ-হ্যাঁ বুঝেছি। ছেলেটার মুখ দেখলে নিশ্চয়ই চিনব। তবে আমি ওর বাবা আর দাদুকে চিনি। ওরা বড্ড গরীব তবে সৎ। কপোতাক্ষ আনমনা হয়ে গেলেন, ওদের নিয়ে তো আমার সংগ্রাম। জানি না এই অসম লড়াই আমি কতদুর টেনে নিয়ে যেতে পারব। তবে আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। আমার এই লড়াইয়ে আমি তোমাকেও পাশে পেতে চাই।
আমি পাশে না থাকলে তোমাকে না খেয়ে শুকাতে হোত। মীনাক্ষী সাদা ঝকঝকে দাঁত বের করে হাসলেন, হাসতে-হাসতে একসময় গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি, মানুষের জন্য কাজ করো এতে আমি তোমাকে কোনোদিন বাধা দেব না। তবে তোমার কাছে আমার একটাই নিবেদন–পর-উপকার করতে গিয়ে নিজের শরীরটাকে যেন ভেঙে ফেল না। মনে রেখো-শরীরও নদীর পাড়ের মতো, একবার ভেঙে গেলে, ধস নামলে আর মেরামত করা যায় না।
– হ্যাঁ-হ্যাঁ, এতো লাখ কথার এক কথা। কপোতাক্ষ মাথা নাড়লেন।
মীনাক্ষীর মনের মেঘ কেটে গিয়েছে, আমি যাই। তুমি একটু ওদের সঙ্গে গল্প করো। রান্না হয়ে গেলে ডাকব।
মীনাক্ষী চলে যাবার পরও একা অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন কপোতাক্ষ। সূর্যাক্ষর সঙ্গে কাল রাতেও তার দেখা হয়নি। তিনি যখন ফেরেন তখন সূর্যাক্ষ ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি ওর। সূর্যাক্ষর অভ্যাস রাত বারোটার মধ্যে শুয়ে পড়া। রাত বারোটাতে শুলেও ও সকাল পাঁচটার মধ্যে উঠবেই। পেছনের বাঁশবাগানটাতে পাখির মেলা বসে যায় তখন, বিশেষ করে এক দল কাক বাঁশগাছে বসে দলবদ্ধভাবে ডাকতে থাকে, ওরা বুঝি সকালের আলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে পৃথিবীতে। আর আশ্চর্য, সকালবেলায় কাকের কা-কা ডাকও শুনতে মন্দ লাগে না সূর্যাক্ষর। পাখিগুলো বুঝি তার ঘুম ভাঙানোর জন্য প্রতিদিন প্রস্তুত হয়ে থাকে। কাক ছাড়াও বাঁশবাগানের ডোবাটায় এক জোড়া ডাহুক আসে প্রতিদিন সকালে। ওদের ডাকটা বড়ো অদ্ভুত। সব সময় ওদের যেন কেউ তাড়া করছে এমন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ওদের ক ক ক ক ডাকে স্পষ্ট। সূর্যাক্ষ বুঝতে পারে ডাহুক হল সব চাইতে ভীতু পাখি। সুন্দর পাখি। একমাত্র ডাহুকই গলায় সাদা মোতির মালা পরে ঘুরে বেড়ায়, ওদের পালকের বিন্যাস, সজ্জা কোনো শিল্পীর দক্ষ হাতের অঙ্কন নয়, স্বয়ং প্রকৃতির, সৃষ্টিকর্তা বহু যত্ন নিয়ে ওদের পালকে রঙ ভরেছেন, তিল তিল করে ওদের তিলোত্তমা করে তুলেছেন।
কী মনে করে কপোতাক্ষ দোতলার সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গেলেন, কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, সূর্যাক্ষর গলা পাওয়া যাচ্ছে। গল্প আর বন্ধু পেলে ছেলেটার চোখের ঘুম পেয়াদাদের মতো উধাও হয়ে যায়। কপোতাক্ষর তবু সংশয় ছিল যাবে কি যাব না বলে। কিন্তু বাইরে ঠিকরে পড়া হ্যারিকেনের আলো তার সংকোচকে দূরে সরিয়ে দিল। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে তিনি উঠে এলেন দোতলার বারান্দায়। ঘরে না ঢুকেই তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, সূর্য, ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি?
