রঘুনাথকে দেখে বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকা দুলাল এগিয়ে এল সামনে, গলা খেঁকারি দিয়ে বলল, হা রে রঘু, সকাল থিকে কুথায় গেছিলিস?
-মিতের ঘরে গেছিলাম।
–তা কখুন ফিলি? তুর সাথে কিছু দরকারি কথা ছিল।
-বলে ফেল। রঘুনাথ গুরুত্ব দিতে চাইল না দুলালের কথাকে। ও দুলাৰ ঘনিষ্ট হয়ে সরে এল, তোর বাপের অবস্থা কিন্তু ভালো বুঝচি নে। আমার মনে হয় গুয়াদাকে বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।
রঘুনাথ ঝিম মেরে শুনল কথাগুলো, একই কথা মা-ও বলছিল।
বলবে তো। ঘরের মানুষ বলে কথা। তবে এখন বান বন্যায় কুথায় যাবি? চারদিকে তো জল থৈ থৈ করচে। ডাঙা দেখা যায় না।
-হ্যাঁ, তা যা বলেচো।
–যা করার তাড়াতাড়ি করিস। তোদের সময় বড়ো খারাপ চলচে। তোর কাকাও তো। গোপাল থেমে গেল, যা বলতে চেয়েছিল সেটা বলা শোভন হবে কিনা ভাবল। তারপর গলা ছেড়ে নিয়ে সে দেবদারু গাছের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল, এখুন কুথায় যাচ্ছিস? আঁধার নামছে। ঘর যা
-কাকা? রঘুনাথের ডাকে চমকে উঠল দুলাল, ব্যাকুল গলায় সে বলল, কিছু বলবি?
–শুনছিলাম পঞ্চায়েত থেকে রিলিফ দেবে-সত্যি?
-সত্যি-মিথ্যে জানি না, তবে কথাটা শুনে এসেছি। দুলাল অবজ্ঞায় ঠোঁট উল্টাল, শুধু চাপাকলের জল ছাড়া ঘরে আর কিছু নেই রে। বসে খেলে রাজভাণ্ডারও শেষ হয়ে যায়। ভাবচি জল কমে গেলে টেউনের দিকে পেলিয়ে যাবো।
-পেলিয়ে কতদিন আর বাঁচবা?
যতদিন বাঁচা যায়। তোর কাকির শরীরটা ভেঙে গেছে না খেয়ে-খেয়ে। মার শরীরও ভালো নেই। আসলে বয়স হচ্ছে তো। দুলালের স্বর জড়িয়ে এল। দম নিয়ে সে বলল, তোর ঘরে কে এসেছিল রে? দেখে মনে হল বাবুঘরের ছেলে।
–তুমি চিনতে পারোনি।
-সামনা সামনি তো দেখিনি, পেচন থেকে দেখেচি। দেখে কুনো আন্দাজ করতে পারিনি। কপালে ভাঁজ ফেলে কথাগুলো বলল দুলাল। বলে সুখ পেল সে। কোমরের খুঁটে গোঁজা বিড়ি-দেশলাই বের করে সে রঘুনাথকে বলল, বিড়ি খাবি?
প্রস্তাবটা ঝামেলায় ফেলে দিল রঘুনাথকে, ইতস্ততভাব সরিয়ে সে বলল, থাকলে দাও। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে।
বিড়ি ধরিয়ে কাকা-ভাইপো দুজনে চেয়ে আছে বুড়িগাঙের দিকে। বিড়ির ধোঁয়া উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে মাঠ পেরিয়ে। দুলাল আক্ষেপ করে বলল, এত জমিন অথচ আমাদের আর কিছু নেই! বাবুরা কায়দা করে চরের খাস জমি সব নিজের নামে করে নিয়েছে। সেখানে ফি-বছর আখ হচ্চে। সুগার মিল চলছে। আমাদের কি লাভ হচ্ছে বল?
-এ তো সাহেব জামানা থিকে হচ্চে। এখুন সাহেব নেই, সাহেবের মতুন কিছু মানুষ আচে। রঘুনাথের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, এ সব ব্যাপারে আমাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। বিদুর কাকা বলছিল লড়াই হবে। চরের জমি জোর করে দখল নেবে ওরা। শুনেচি-কামারশালে লুকিয়ে তীর বানাচ্ছে খাদু কামার। সেই তীরে দেখ আমাদের মরণ হয় কিনা।
-মরার আগে কাউকে সাথে নিয়ে মরব। ছাড়ব না, দেখে নিস। দুলালও তেতে উঠল কথায় কথায়।
ব্রিটিশ আমলে সাহেবরা এ তাটে দাপিয়ে বেড়াত। থানার কাছে মালী পাড়ায় জাহাজ ঘাট ছিল। আর একটু এগিয়ে গেলে হরিনাথপুর ধাওড়ায় ছিল সাহেবকুঠী। এগুলো এখন আর কোননা গল্পকথা নয়, বুড়োগুড়োদের মুখে এ গল্প প্রায়ই শোনে রঘুনাথ।
বনমালী মালাকারের বয়স হয়েছে, তার মাথার একটা চুল কালো নেই। সেই মানুষটা স্মৃতিতে ডুবে গেলে কথার খেই হারিয়ে ফেলে, শ্লেষ্ম উগলে বলবে, তখুন মালীপাড়ার ঠাকঠমক ছিল আলাদা। জাহাজ বোঝাই হয়ে শোলার টুপি যেত কাটোয়া-নবদ্বীপ হয়ে কোলকাতায়। সাহেবরা শোলার বড়ো বড়ো টুপি ছাড়া আর কিছু পরত না। এই লাখুরে- কলীগঞ্জের টুপি চালান যেত বিদেশে।
শুধু টুপি নয় গঙ্গার পাড়ে গঞ্জের বাজার ছিল রমরমা। তিন জেলার ব্যবসায়ীরা আসত এই গঞ্জের হাটে। মুর্শিদাবাদ আর বর্ধমান–সবাই চাইত সবাইকে টেক্কা দিতে। কমসে কম হাজার মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে। এছাড়া ছিল নানা পুজোপার্বন। কার্তিক মাসের কালীপুজো ছিল অন্যতম। সেই কালীঠাকুরের নাম মহিমায় জায়গার নাম হয়ে গেল কালীগঞ্জ। এসব গল্প চুনারামের মন ভালো থাকলে রঘুনাথকে শোনায়। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকিয়ে মুখ হা হয়ে যায় রঘুনাথের, দুলালকে নাড়া দিয়ে সে বলে, কাকা, চারধারে এত জমিন অথচ আমাদের এক কাঠা চাষের জমিন নেই গো। সব জমিন বাবুরা দখল করে নিয়েছে। আমাদের জমিতে আমরা এখুন দিনমজুর। আমাদের দু-বেলা মাড়ভাত জোটে না।
–তা যা বলেছিস। দুলাল দুঃখী মুখ করে তাকাল, দীর্ঘশ্বাস নেমে এল তার বুক ছুঁয়ে, এত বড়ো এট্টা বন্যা তবু দেখ কারোর কুনো সাড়া নেই। মানুষ খেল কি মরল এ খোঁজে কারোর গা নেই। দেশ-দুনিয়া বড়ো স্বার্থপর হয়ে যাচ্চেরে। আমাদের দিনটা হয়ত কোনোমতে কেটে যাবে, তোরা বাঁচবি কি করে?
প্রতিটা দিন পাল্টে যায়। আমরাও পাল্টে যাব। রঘুনাথের কণ্ঠস্বর কঠিন শোনাল।
দুলাল চাপা গলায় বলল, নিজেদের বদলে নিতে তোরা পারবি তো? সবার ভেতরে আগুন আচে রে। আগুনটা উসকে নিয়ে ভালো করে ফুঁ দিয়ে জ্বালতে হয়। না হলে পুড়ে পুড়ে সেই আগুন একদিন ছাই হয়ে যায়। দুলালের কথাগুলো মনে ধরল রঘুনাথের, তুমি ঠিক কথা বলেচ কাকা। আগুন সবার ভেতরেই আচে। বিদুরকাকা বলেছিল–আগুনের ব্যবহার জানতে হয়। আগুনও কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থাকে। তার ঘুম ভাঙাতে হয়। কথায় কথায় ওরা পাড়ার ভেতর পৌঁছে গেল। টিমটিম করে আলো জ্বলছে প্রায় ঘরে। সেই সীমিত আলোয় অন্ধকার দূর হয় না। ভিকনাথের ঘরের সামনে এসে কি মনে করে দাঁড়িয়ে পড়ল রঘুনাথ। কাকার নিখোঁজ হওয়ার পিছনে এই ঘরটার ভূমিকা কম নেই। ঝারি রহস্যময়ী চরিত্র। তাকে বোঝার সাধ্য লুলারামের হয়নি। সে শুধু আগুন পোকার মতো না বুঝেশুনে ঝাঁপ দিয়েছে রূপের টানে। রূপ তো মরণকূপ–একথা জানত না লুলারাম। শরীরের নেশাটা তার কাল হল। যখন নেশা ভাঙল তখন আর মানুষটা গাঁয়ে থাকল না। হয়ত অনুশোচনায় পুড়ছিল তার মন। মনের জ্বালা হলদিপোঁতায় মেটেনি। হলদিপোঁতার আগুন সে কোথায় গিয়ে নেভাবে?
