সরস্বতী আড়চোখে অবনীর দিকে তাকাল। আগুন মুখো বিড়িটায় টান দিয়ে অবনী বলল, যেতে পারলে ভালো হত বাবা কিন্তু যাওয়া যাবে না।
-কেনে যাওয়া যাবে না?
–পুরা হাসপাতাল খালি। বান-বন্যায় চুরি চামারি বাড়ে। হাসপাতাল ফেলে আমি কোথাও যাব না।
সবাই যে তুমাকে ফেলে চলে গেল? তখন?
–সে যারা গিয়েছে–যাক। আমি কাউকে বাধা দেব না। আমার ধর্ম আমাকেই মানতে হবে।
–ধর্ম রাখতে গিয়ে জীবন বেরিয়ে গেলে সেটা কি ভালো হবে?
-ভালো-মন্দের হিসেব রাখি নে বাবা। আমার অতো হিসেব ক্যার সময় নেই। অবনী হাল ছেড়ে দেওয়া ভঙ্গিতে বলল, যে পেটের ভাতের মোগান দেয় তাকে অবহেলা করা পাপ। কিছু মনে করো না। এ হাসপাতাল ছেড়ে এখন আমি কোথাও এক পা নড়তে পারব না।
হাল ছেড়ে দিল রঘুনাথ। অবনীর এই আত্মঘাতী জেদ তার ভালো লাগল না। নিমেষে কঠিন হয়ে উঠল তার ঠোঁট। থিরথির করে কাঁপছে চোখের তারা। জলের দিকে তাকিয়ে সে ভাবল-এই ধর্মটাই গরিবের ঘোড় রোগ। এই রোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই জাতটার মুক্তি নেই।
.
৪৯.
হলদিপোঁতায় মন খারাপ করে ফিরে এল রঘুনাথ।
দুর্গামণি তাকে দেখতে পেয়ে বলল, কুথায় ছিলিরে রঘু এতক্ষণ? তোরে খুঁজতে একজন বাবুপারা লোক এসেছিল। দেখে মনে হল আগে একে দেখেছি। রঘুনাথ স্মৃতি হাতড়ে খুঁজতে থাকে পরিচিত মুখগুলো। সব মুখ ভিড় করে এল একে একে। শত চেষ্টা করেও সেই সব মুখের মিছিল থাকে আলাদা করে কোনো একটা মুখকে সে চিহ্নিত করতে পারল না।
দুর্গামণি ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে বলল, অত ভাবার কি আচে। যে এসেছিল সে তোর চেনা জানা। আমি বসতে বললাম, সে বসল না। বলল–আবার আসবে।
–কখুন আসবে বলেচে? উৎসাহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল রঘুনাথ।
দুর্গামণির অভিব্যক্তিহীন মুখ, কখুন আসবে সেই টেইমটা আমাকে বলে যায় নি। তবে সে মাঝের গাঁয়ের দিকে চলে গেল। তুই ঘরে চ তো। মিলা কাজ আছে।
কি কাজ?
–ভিকনাথ এসে বলে গেল দুলুর সঙ্গে তোরে দেখা করতে।
–কেনে সে আসতে পারল না?
–আমি তার কি জানি।
-তুমি জানো না কিন্তু আমি জানি। রঘুনাথ অস্থির হয়ে উঠেছিল মনে মনে, দুটা কাঁচা পয়সার মুখ দেখে ধরাকে সরা ভাবছে মানুষটা। ঠিক আছে, আমার যখন দরকার তখুন আমিই যাব দেখা করতে।
এখুন আর ঘরের বাইরে যাস না। আগে বান যাক তারপর। দুর্গামণির কথা শেষ না হতেই ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল কাশির খ্যাসখেসে শব্দ। ভয় পাওয়ার মতো শব্দগুলো আছড়ে পড়ছিল ঘরের দাওয়ায়। দুর্গামণি কথা থামিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘাড় তুলে তাকাল, আমি যাইরে। তুর বাবা ঘুম থিকে উঠেছে। এবার চা বসাব। মানুষটার যে ভেষণ চায়ের নেশা।
রঘুনাথ কোনো কথা না বলে নিথর হয়ে দাঁড়াল। দুর্গামণি তাকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে বলল, কি ভাবছিস রে?
-কিছু না।
–মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতো সস্তা নয়।
যেন ধরা পড়ে গেল রঘুনাথ, গলা খাদে নামিয়ে সে শুধোল, সত্যি করে বলদিনি-বাবার কাশিটা কমেছে কিনা।
দুর্গমণি-হা-করে তাকাল, এ জন্মের কাশি কি কমে রে বাপ? এ হল বুড়ো শিবের ধার। একেবারে সাথে যাবে।
–এসব কথা বলতে তুমার একবারও মুখে বাঁধিল না? রঘুনাথের মুখ বিরক্তিতে বেঁকেচুরে গেল।
দুর্গামণি চাপা গলায় আগুন ঝরিয়ে বলল, সত্যি কথা বলতে দোষ কুথায়?
-নীলুবাবুর জোড়া পায়ের লাথিটা ওর বুকের কলকজা সব নড়িয়ে দিয়েছে। আমি আর কত দেখব। এ সব দেখার আগে আমার মরণ হলে ভালো হত। আঁচলে মুখ ঢেকে গিয়ে উঠল দুর্গামণি।
রঘুনাথ মহা সংকটে পড়েছে, কাছ কেনে? চুপ করো।
-চুপ করা যায়, বল? আজ দুপুরেও তোর বাপের মুখ দিয়ে চাপ চাপ অক্ত উঠেছে। মনে হচে- দুর্গামণি পুরো কথা বলল না। থামল।
রঘুনাথ বিপদের সংকেত পেয়ে বলল, নীলুবাবুর যা সর্বনাশ করার তা আমি করে দিয়েছি। বড়োগাছ বলে ঝড়টা সামলে নিয়েছে।
–সে সামলে নিলেও তোর বাপ তা পারেনি। আজও বিড় বিড় করে নীলুবাবুকে গাল দিচ্ছিল।
–তুমি কি চাও আমি নীলুবাবুকে শেষ করে দিই?
আঁতকে উঠে মরা ভ্যাদভেদে চোখে তাকাল দুর্গামণি, মা হয়ে তুর অমঙ্গল হোক এ আমি কি করে চাই বাপ? তুই তোর মতো থাক। তোর বাপ যতদিন শ্বাস নেয় নিক। এত মার খেলে কোন মানুষটা বাঁচে বল।
রঘুনাথ চুপ করে গেলে দুর্গামণি বলল, তোর দাদুও কেমন নেসকে গিয়েছে। তারে আমি কত বুঝিয়েচি। সে কিছুতে বুঝবে না। সে ঠোঁট কামড়ে আফসোসের সঙ্গে মায়ের দিকে তাকাল। দুর্গামণি নিরাসক্তভাবে বলল, ছেলে বড়ো হলে বাপ-মা তার উপর অনেক কিছু আশা করে। আমিও তোর কাছে কিছু চাই রঘু। তোকে তা দিতে হবে।
রঘুনাথ ঢোঁক গিলল, আমার চেষ্টার কুনো খামতি থাকবে না মা।
-তাহলে তুই কথা দে তুই তোর বাপের বদলা আমি বেঁচে থাকতি নিবি। কথা দে। মানুষের চোখ যে চুলার আগুনের চেয়েও তীব্র হয় সেই প্রথম মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে টের পেল রঘুনাথ। এ কোন মাকে দেখছে সে। এতো মা নয়–আগুনের ঢিপি।
রঘুনাথ ধীরস্থির ভাবে বলল, বাবুদের সাথে মিশলেও বাবুরা আমাকে আপন করে নেয়নি। ওরা আমাকে ভাবে বুনো, রাজোয়ার। হ্যাঁ, বুনো হয়েই আমি দেখিয়ে দেব-আমিও কারোর চাইতে কম নই। আমোর শরীলেও রাগ আচে।
সন্ধে নেমে এল হলদিপোঁতার উপর। সাঁঝ নামলে কালো হয়ে যায় বুড়িগাঙের জল। ডি ভি সির ছাড়া জলে তার রূপ খোলতাই হয়েছে দশগুণ। এখন চোখ ফেরালে চেনা যায় না তাকে। যুবতীর ঠাটবাট নিয়ে সে এখন অনন্যা। রঘুননাথ হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল পাকুড়তলায়। সেখানে গামছা গায়ে জড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল দুলাল। বেশ কদিন হল তার হাতে কোনো কাজ নেই। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর মুনিষ খাটার সব আশা ধুয়ে গিয়েছে। এভাবে বেকম্মা হয়ে ঘরে জুতে গেলে ভাত জুটবে না। সকালে ইন্দু তাকে পঞ্চায়েত অফিসে পাঠিয়ে ছিল রিলিফের জন্য। হরিনাথপুর থেকে দুলাল শুনে এসেছে ত্রাণবন্টন আগামীকাল থেকে শুরু হবে। শুকনো খাবার চাল-ত্রিপল দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। দেবগ্রাম থেকে টিন বোঝাই হয়ে ওঁড়ো দুধ এসেছে। সেই গুড়ো দুধও দেওয়া হবে সবাইকে।
