-আমাকে? রঘুনাথ ভ্যালভ্যাল করে তাকাল। শুভর সামনে এমন ঘটনা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। ঝামেলার ভয়ে সামান্য বাধা দেওয়ারও চেষ্টা করল না সে। সুড়সুড় করে এগিয়ে গেল থানার পাকা ঘরটার দিকে।
বড়োবাবু রাগী মানুষ একথা রঘুনাথ অনেক আগেই শুনেছে। মাথা ঝাঁকিয়ে বড়োবাবুর সামনে দাঁড়াতেই সিগারেটের ছাই ঝেড়ে লম্বা চওড়া মানুষটি বাঘের গলায় হুঙ্কার দিয়ে বললেন, লুলারাম কোথায়?
–আজ্ঞে, জানি না বাবু।
-জানিস না মানে? আমার কাছে লুকানো হচ্ছে। এমন মার দেব পাছা দিয়ে আমরক্ত বের হবে।
-আমি কিছু জানি না বাবু, মায়ের দিব্যি।
থানায় এসেছিস কি করতে?
–আজ্ঞে জল নিতে?
–শেরপুর থেকে এসেছিস জল নিতে? আশ্চর্য।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল, না বাবু, আমাদের গায়ে কল আছে। আমি জল নিতে এয়েচি মিতেমায়ের জন্যি ।
–কে তোর মিতে-মা?
–ওরা হাসপাতালে থাকে। আমার মিতেকে ডাকব?
-না, দরকার নেই। বড়োবাবু সিগারেটের পোড়া অংশটা অ্যাশট্রেতে জোর করে খুঁজে দিলেন, তোর রিপোর্ট সব আমার কাছে আছে। দু-বার বেঁচেছিস বলে তৃতীয়বার যে বাঁচবি–এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। থানায় যদি তোর নামে কোনো কমপ্লেন আসে তাহলে মাঠে দাঁড়িয়ে গুলি করে দেব।
রঘুনাথের কলিজায় বড়োবাবুর কথাগুলো বাঘনখ ঢুকিয়ে দিল। ঢোঁক গিলে কাঁপা কাঁপা চোখে সে বড়োবাবুর দিকে তাকাল। বড়োবাবু চিৎকার করে বললেন, আমার দুটো চোখ নয়, দশটা চোখ-বুঝলি? আমার চোখকে ফাঁকি দিতে গেলে তোকে আবার দশবার জন্ম নিতে হবে। যা চোখের সামনে থেকে দূর হ।
রঘুনাথ মাথা নিচু করে বেরিয়ে এল থানা থেকে। মুখটা মেঘলা আকাশের চেয়েও থমথমে। থানা পুলিশ ঝুটঝামেলা তার ভালো লাগে না। অথচ ওরাই তার পিছু ছাড়ছে না। সে যে কি করবে, কোন পথে চলবে কোনো কথাই তার মাথায় এল না সেই সময়।
শুভর জল ভরা শেষ। সে ঘাড় তুলে হকচকানো গলায় জিজ্ঞাসা করল, হঠাৎ তোকে আবার থানায় ডাকল কেন রে?
রঘুনাথ কি উত্তর দেবে ভাবল। সত্যি কথা শুভর কাছে বলা যাবে না। ওর খুব আত্মসম্মানের ভয়। আসল ঘটনা শুনলে শুভ হয়তো আর কোনোদিন তার সঙ্গে মিশবে না। সব যদি হারিয়ে যায় যাক তবু বন্ধুত্বটা বেঁচে থাকুক। শুভর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রঘুনাথ চাপা গলায় বলল, বড়োবাবু কাকার কথা শুধোচ্ছিল।
-কেন?
কাকা ওর বন্ধু হয়।
থানার বড়োবাবু তোর কাকার বন্ধু? শুভর যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না কথাগুলো। রঘুনাথ হাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ রে বাবা, আমরা গরীব বলে কি বড়োলোকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না?
শুভ ঢোঁক গিলল, না, তা নয়। আসলে বড়োলোকরা গরীবলোককে প্রয়োজন ফুরোলে ভুলে যায়।
আমাদের বড়োবাবু অমন মানুষ নয়। রঘুনাথ জোর দিয়ে বলল, অতসীপিসি কি তোদের সাথে মেশে না বল?
শুভর মন খারাপ হয়ে গেল অতসীপিসির নাম শুনে, পিসির কথা আর বলিস না। পিসিও বোলোকদের মতো
-কেনে কি হয়েছে রে?
এড়িয়ে যেতে চাইল শুভ। রঘুনাথ ওর হাত ধরে বলল, বল, তোকে বলতেই হবে।
শুভ জড়তা ভাঙল, বাবা যে বলে–এক গাছের ছাল আরেক গাহে লাগে না–সত্যি। পিসি আমাদের ফেলে চলে গেল। যাওয়ার সময় আমাদের একবারও মুখের বলাটাও বলল না।
-ওসব কথা মনে রাখা ভুল। রঘুনাথ বিষয়টাকে হালকা করতে চাইল, ভুলে যা, সব ভুলে যা। যে কথায় বুক মোড়া মারে–সে কথা ভুলে যা।
-যে কথায় দুঃখ থাকে সে কথা কি ভোলা যায়?
–মনটাকে পাথর কর, তাহলে সব পারবি।
শুভ ঠোঁট কামড়াল। রঘুনাথের সঙ্গে সে একমত হতে পারছে না কিছুতেই। ভিতরটাতে শুরু হয়েছে তছনছ। ঝড়-বৃষ্টি রাতে ত্রিপল উড়ে যাবার ভয় ছিল। আধলা বা থান ইটের কত জোর যে হাওয়ার বিরুদ্ধে লড়বে। তবু অবনী তাকে বলল, আজ আর ঘুমানো যাবে না। ঝড়ে ত্রিপল উড়ে গেলে পুরো ভিজতে হবে।
আকাশে বিদ্যুৎ-এর সাপ ছুটে বেড়াচ্ছিল, তার সেই জ্বলন্ত রূপ দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছিল সরস্বতীর, শুভর কাছে ঘেষে সে বলেছিল, আজ রাতটা ভালোয় ভালোয় কেটে যাক। কালই ইস্কুল মাঠে চলে যাব। বড় ভয় লাগছে গো। যে ভাবে বাজ পড়ছে কিছু হয়ে গেলে শুদ্ধি মরব।
ইস্কুল মাঠে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না অবনীর। এত জিনিস নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে সে। মোকামপাড়া আর স্কুলপাড়ার ঘরহারা মানুষগুলো সেখানে জায়গা নিয়েছে। ভিড়ে গিয়ে ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। এখানে শতকষ্ট হলেও নিজের বাসা। কেউ তাড়িয়ে দেবার নেই। খেয়ে না খেয়ে এখানে মুখ বুজে পড়ে থাকা যায়। তা সত্ত্বেও চাপা অভিমানটা বুকের খোদলে চোরা হিমের মতো ঢুকে যায়। তখন কষ্ট পাওয়াটা বাড়ে, বাড়তেই থাকে।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকতে বেলা গড়ায়। রঘুনাথ ছাদের উপর থেকে মাছ ধরছিল ছিপ ফেলে। এক ঝাক বেলেমাছ ভাসতে ভাসতে চলে গেল মাঠের দিকে। গাঙতোড় মাছের লম্বা ঠোঁট জলের উপর জেগে আছে। এই মাছটাকেই রঘুনাথ বলে, কেঁকলে মাছ। এক কাঁটার মাছ এটা। বড়ো সুয়াদ। টক রাঁধলে জিভে জল এসে যাবে হড়হড়িয়ে।
এত মাছ ভেসে যায় তবু একটাও ঠোকর মেরে দেখে না। বিরক্তিতে ছিপ গুটিয়ে রঘুনাথ সরস্বতীর মুখোমুখি দাঁড়াল। অবনী মাদুরে শুয়ে কাত হয়ে বিড়ি টানছে। কথাটা কিভাবে শুরু করা যায় রঘুনাথ ভেবে নিল কিছু সময়। তারপর সহজ সরলভাবে বলল, মা, এট্টা কথা বলি। এত কষ্ট করে এখানে পড়ে থেকে কি হবে? তার চেয়ে আমার দোরে চলো। আমাদের হলদিপোঁতা উঁচু জায়গায়। ওখানে জল ওঠে না।
