রঘুনাথ মুড়ি চিবাতে চিবাতে ঘাড় নাড়ল।
সরস্বতী বলল, একটু সরষের তেল দেব? কাঁচা সরষে তেলের টা আমার ভালো লাগে। রঘুনাথের মতামত না নিয়েই ছোট চামচের আধ চামচ তেল মুড়ির বাটিতে পরিমাণ মতো ছড়িয়ে দিল।
কলার ভেলায় থানার পথটা দীর্ঘ নয়। কুমোর ডোবা পেরলেই পালপাড়ার ডাঙা। বাঁশঝাড়ে ভেলাটা তুলে রেখে ওইটুকু পথ অনায়াসেই পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়।
কলার ভেলা বলে বেশি ঝুঁকি নিতে চাইল না রঘুনাথ, শুভকে বলল, তুই ঘরে থাক। আমি ঘুরে আসি। থানা থেকে দুঘড়া জল আনতে আর কত সময় লাগবে?
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে একরকম বন্দী হয়ে দিন কাটছে শুভর। ফলে এ সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চাইল না। তাছাড়া কুমোর ডোবা ভেলায় করে পেরনোর আনন্দটাই আলাদা যদি সঙ্গে রঘুনাথের মতো বন্ধু থাকে। লগা ঠেলে কুমোর ডোবার মাঝখানে আসতেই একটা মাছ ঘাই দিয়ে কাঁপিয়ে দিল জল। ঢেউগুলো ছড়িয়ে যেতে লাগল চারদিকে। শুভকে অবাক করে দিয়ে রঘুনাথ বলল, যে মাছটা ঘাই দিল সেটা কম করে সের তিনেকের তো হবেই। জানিস শুভ, এই বন্যায় পণ্ডিত বিলের মাছ সব ভেসে গিয়েছে।
-কি করে বুঝলি?
শুভর পাল্টা প্রশ্নে রঘুনাথ বলল, আখের খেতে ভিকনাথ কাকা এট্টা কাতলা মাছ ধরেছিল যার মাথাটা এট্টা বাছুরের মাথার চেয়েও বড়। আঁশগুলো এট্টা কাঁচা টাকার চেয়ে বড়ো আর মোটা। ধাওড়া পাড়ায় মাছটারে পাট মাপার কাটায় ওজন করা হল। পাক্কা সাড়ে পাঁচসের। কাকা একা খায়নি মাছটা। সবাইকে দিয়ে তারপর খেল।
শুভ বলল, এখানেও একটা ঘটনা ঘটেছে। জটা কাকা মাছ ধরতে গিয়ে ভেসে গিয়েছে। তার খবর কেউ জানে না। লোকে যে খোঁজ খবর নেবে জলের জন্য তা পারছে না। আর একটা কথা। বানের প্রথম দিনে পোদ্দারদের ফাইভে পড়া ছেলেটা বাজারের বড়ো ড্রেনটাতে পড়ে গিয়েছিল। তাকে শেষে পাওয়া গেল হাজরাপাড়ার নালাটায়। জল খেয়ে পেট ঢোল হয়ে গিয়েছিল ছেলেটার। পরে সে বেঁচে যায়।
বাঁশ ঝাড়ের কাছে ভেলা থামিয়ে শুভ বলল, এই বানবন্যায় সুফল ওঝার বাজার এখুন ভাল চলছে। সাপখোপ, পোকামাকড়ের উৎপাত বেড়েছে। শুনেছি কাজের চাপে সুফল ওঝা নাকি নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছে। শালা ধাপ্পাবাজটা আর এটু হলে আমার গলায় শ্বশুর হয়ে এটকে যেত! অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েচি মাইরি! ঝটকা মেরে কলার ভেলা থেকে ডাঙায় লাফিয়ে পড়ল রঘুনাথ। তার দেখাদেখি শুভও ঝাঁপ দিল ডাঙায়। ভেলাটা সামান্য হেলে গিয়ে আবার ঢেউয়ের ধাক্কায় ফিরে এল ডাভায়।
রঘুনাথ হশিয়ার হয়ে বলল, ভেলাটা না বাঁধলে ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে দূরে চলে যাবে তখন আর ফেরা যাবে না। কি দিয়ে বাঁধা যায় বলদিনি?
শুভ কপালে ভাঁজ ফেলল, জলের লতা নিয়ে বাঁধবি? বলেই সে গা জড়াজড়ি কলমীলতার ঝোপটার দিকে তাকাল।
ভ্রূ কুঁচকে রঘুনাথ বলল, জলের যা শ্ৰেত কলমীলতা ছিঁড়ে যাবে।
-তাহলে কাঁচা দিয়ে বেঁধে রাখলে কেমন হয়।
–মন্দ হয় না। তবে রঘুনাথের আধভাঙা গলায় সংশয় ধরা পড়ল।
কঞ্চি যদি ঢেউয়ে-ঢেউয়ে খুলে যায়?
–তাহলে চল ওটাকে ডাঙায় তুলে দিই। শুভ নিরীহ চোখে তাকাল।
বাঁশবাগানে বুঝি আলো আঁধারের খেলা চলে সর্বদা। দুটো ঘুঘু বাঁশের ডালে বসে করুন চোখে চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে। ওদের দৃষ্টিতে স্বাচ্ছন্দ্য বা সুখ কোনোটাই নেই। মানুষের মতো গভীর এক বিপন্নতা ওদের যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
অন্যসময় হলে রঘুনাথ নিদেন পক্ষে একটা ঢেলা ছুঁড়ে মারত তাক করে। আজ আর সেই মনটাকে খুঁজে পেল না সে। পরিস্থিতি এবং পরিবেশের সঙ্গে মনও বুঝি পাল্টে নেয় নিজেকে।
কলার ভেলাটা ডাঙায় তুলে ওরা দুজনে নিশ্চিন্ত হল। থানায় পথটা পালপাড়ার ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গিয়েছে, পালপাড়ার অবস্থান বেশ উঁচুতে। দেশ গাঁ নামলা ভুঁই সব ডুবে গেলেও এখানে জল উঠবে না কোনোদিনও। তাই এখানে যারা বসবাস করে তাদের মনে মৃদু একটা গর্ব আছে।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে শুভ বলল, থানায় যেতে পোর ভয় করে না?
-ভয়? ভয় করলে কেন? কথাগুলো বললেও রঘুনাথের বুকটা ধকধকিয়ে উঠল।
লুলারামের খোঁজে থানায় দুজন পুলিশ এসেছিল পাড়ায়। পুলিশের ড্রেস পরে এলে পাড়ার মানুষের কৌতূহল বাড়ে। কেউ কেউ ভয়ও পায়। রঘুনাথ ভয় পায়নি। সে এগিয়ে গিয়ে শুধিয়েছিল, কি ব্যাপার অসময়ে এলেন যে?
-তোমার কাকা কোথায়? থানায় অনেক দিন তার হাজিরা নেই। বড়োবাবু পাঠালেন।
-ওঃ, এই কথা! তারপর রঘুনাথ সবিস্তারে লুলারামের নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা বলেছিল। কাকা চলে যাওয়ার পর তার মাথার উপর দুবোনের দায়-দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নূপুর আর নোলকের জন্য কষ্ট হয়। ওরা যে কোনো দোষ করেনি।
নোলক পুলিশ দুটোর সামনে কথা বলতে গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। তার সেই কান্না এত ছোঁয়াচে ছিল যে নূপুরও চোখের জল আটকে রাখতে পারল না। বাবা ছিল তাদের কাছে ছাতার মতো। সেই ছাতাটা ফুটো হয়নি, ভাঙেনি, শুধু কোথায় যেন হারিয়ে গেল ছাতাটা! মাঝে মাঝে তার মনে হয় বাবা বেঁচে নেই। যদি বেঁচে থাকত–সে কি একবার আসত না?
থানার কলে জল নেওয়ার লম্বা লাইন। শুভ গিয়ে সেই লাইনে দাঁড়াতেই একজন পুলিশ এসে খপ করে হাত চেপে ধরল রঘুনাথের, চল, বড়োবাবু তোকে ডাকছে।
