ফি-বছর গাঁয়ে গাছপুজো করে বুনোপাড়ার মেয়েরা। ভাইফোঁটার সময় ফোঁটা দেওয়া হয় গাছকে। এই গাছ ঝড়-দুর্যোগ থেকে বাঁচায় তাদের। প্রকৃতির ক্রোধ সহজে মেটে না। এখনকার ঝড়-বৃষ্টি বাঁধনহারা। ফি-বছর ঝড়ে কত ঘর ভাঙে, ধসে পড়ে দেওয়াল, এমন কি উড়ে যায় ঘরের চাল। বুড়িগাঙ ফুঁসতে ফুঁসতে ঢুকে যায় উঠোনে। বুড়িগাঙের পাড়ে বাস করে এসব আনুগত্য না মানলেও চলে না। ভূষণীবুড়ি এই পুজো পাঠ নিয়ে মেতে আছে। গায়ের মঙ্গল সে-ও চায়। তার ভেতরেও অসহায় দহন ছারখার করে।
শুধু গাছপুজো করেও মন ভরে না। এত বড়ো নদী, তারও তো খাতির দরকার। গঙ্গাপুজোর সাথে সাথে তারা দল বেঁধে শুরু করেছে নদীপুজো। নদীর কাছে করজোড়ে বলা, মাগো,দয়া করো। এবছর আর বানবন্যা দিও না। গেল বছর ফসল খেল, তার আগের বছর চাষ হল না, এবছর মাগো যেন উঠোনে ধানের বিড়া আসে।
শাঁখ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে গাছ আর নদীর পুজো সারে ওরা। এ পুজো চলে আসছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। আগে মেয়েরা সাফ-সুতরো শাড়ি পরে নৈবেদ্য সাজিয়ে নিয়ে যেত গঙ্গার ধারে। এখন পুরনো শাড়িতে মন ভরে না, নতুন শাড়ি চাই।
এ পুজোয় কোনো পুরোহিত নেই, নিজেরাই নিজেদের বামুন ঠাকুর। ঝারি হাসতে হাসতে বলে, এ বছর আর বাঁধ ভাঙবে নি। মানুষের দশা ভেষণ শোচনীয়। ভালো করে পুজো না করলে কপালে বিপদ আচে।
অবনী পিচ রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভাবল, শাঁখা পরা হাত, সবাই একসাথে গাছের গোড়ায় হাত দিয়ে প্রার্থনা করছে গ্রামবাসীর মঙ্গল। এত কিছুর পরেও বাঁধ ভাঙল কিভাবে, কিভাবে ভেসে গেল জটা হালদার? তাহলে প্রকৃতি কি রুষ্ট মানুষের উপর?
রাস্তার ধারে জলে ডুবে থাকা আপাংগাছের মরমর দশা। অবনী এই গাছটাকে অন্য নামে চেনে। গ্রামের প্রায় মানুষ একে বলে চচ্চড়ি গাছ। হাতে ধরে টানলে ব্যথা লাগে তালুতে। ছদিন ছরাত্রি জলে ডুবে গাছটা তবু মরেনি। হোট হয়েও সে যেভাবে বেঁচে আছে–তা বড়োর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
জল কমতে মাঝে রঘুনাথ একদিন এসেছিল। অভিমানে তার সঙ্গে কথা বলেছে শুভ। আক্ষেপ করে সে বলেছে, রঘু, তুই যে অমন বদলে যাবি–আমি স্বপ্নেও তা ভাবিনি।
রঘুনাথের সারা শরীর কেঁপে উঠেছে কথা শুনে। শুভর কাছে তার মুখ দেখাবার জো নেই। শুভই তাকে বলেছিল, প্রথম আগুন ধরানোর গল্প। গল্প করতে করতে হারিয়ে যাওয়া। আর দাসত্ব নয়, পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে, নতুন আলো এসে পড়ছে হাসপাতালের মাঠে। সেই আলোকরশ্মি ছুঁয়ে যাচ্ছে মেহনতী মানুষের স্বপ্ন।
রঘুনাথ খুব অবাক হয়ে শুনছিল শুভর কথাগুলো। শুভ তার চাইতে বয়সে ছোট কিন্তু কথাবার্তায় ধানিলঙ্কার ঝাঁঝ। ওর কথা শুনে রঘুনাথ ভিতরে ভিতরে তেতে ওঠে। শুভ অকপটে বলে, মারের বদলে ইকুই করে লেজ নাড়লে হবে না। যে হাত দিয়ে ওরা আঘাত করবে ওদের সেই হাত ভেঙে দিতে হবে। তবে যদি উচিত শিক্ষা হয়।
এসব কথা বলার পরে শুভ হাসপাতালের সবার ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে। তাদের ফেলে সবাই যে যার নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছে এই যাওয়াটাই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। শুভ। অথচ এদের নিয়ে এক সমাজে বাস করার কোনো অর্থ হয় না। তার আদর্শ বিদুর রাজোয়ার, লাবনি রাজোয়ার। ওদের কথাবার্তায় থাকে আগুনের হল। ওরা নিজেরাই যেন একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ আগুনের কুণ্ড। ওই অভাবী মানুষ দুটিকে মন থেকে শ্রদ্ধা করে শুভ। বিদুর কাকা প্রায়ই হাসপাতালে আসে রোগী নিয়ে। প্রায়ই বড় ডাক্তারবাবুর সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয়। ডাক্তারবাবুর মনটাও খুব যে সংস্কারমুক্ত তা নয়। তিনি বিদুরকে শুনিয়ে বলেন, ওভাবে কৌটো নাড়িয়ে বিপ্লব আসবে না। চীনের চেয়ারম্যান যেমন আমাদের চেয়ারম্যান হতে পারেন না, তেমনি ভারতবর্ষের মাটিতে আপনাদের কমিউনিস্টের পতাকা কোনোদিনও উড়বে না। কেন উড়বে না জানেন? আরে মশাই, দীঘার বালিয়াড়িতে কাজুবাদামের চাষ ভালো হয়, তা বলে সেখানে পাটচাষ করলে ভালো হবে না। মাকর্সইজিমের চাষ আবাদ করতে গেলে ভালো মাটি দরকার। সেই মাটি ভারতবর্ষের কোনো প্রান্তে পাবেন না।
বিদুর সেদিন ডাক্তারবাবুর কথা শুনে উত্তেজিত হয়নি, শান্ত নম্র ভঙ্গিতে সে প্রতিবাদ করল শুধু, সময়ই বলে দেবে চাষ-আবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা। আপনি-আমি আগাম ভবিষ্যৎবাণী করার কে? আমাদের সেই অধিকার বা ক্ষমতা নেই। আঠারো শ শতাব্দীতেও মানুষ ক্রীতদাস প্রথার অবলুপ্তির কথা ভাবতে পারত না। কালো মানুষদের ঘৃণা করা হত। অথচ দেখুন দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার কত পরিবর্তন ঘটল। আসলে কি জানেন ডাক্তারবাবু, পরিবর্তনটা ভূমিকম্পের মতো হুড়মুড়িয়ে আসে না, পরিবর্তন হয় ধীরে ধীরে। সময়ের হাত ধরে পথ চলে বিপ্লব। প্রতিবাদ তার দর্শন। আমরা এগুলো অস্বীকার করতে পারব না।
রঘুনাথ শেরপুর ধাওড়া থেকে জলপথে এসেছে। তার পরণে একটা হাঁটুকাটা খাকি প্যান্ট। পায়জামা আর সাদা গেঞ্জিটা সে বেঁধে নিয়েছে মাথায়। তাকে অনেকটাই সাহেবমাঠের পেয়াদার মতো দেখতে লাগছে। রঘুনাথ এতটা পথ হেঁটে এলেও হাঁপিয়ে ওঠেনি।
সরস্বতী ছাদের উপর বাটি ভর্তি মুড়ি দিয়ে বলল, এগুলো খেয়ে নাও। আজ এখানে সেদ্ধভাত খেয়ে যাবে। রঘুনাথ না করতেই সরস্বতী কেমন মনমরা চোখে তাকাল, আমি তোমার মা হই না, মায়ের কথা শুনতে হয়। আর একটা কথা। খাওয়ার জল ফুরিয়ে গিয়েছে। ভেলা নিয়ে থানার কল থেকে দু-ঘড়া জল এনে দিও। শুনেছি–থানার চাপাকলটা কোনো বন্যাতেও নাকি ডোবে না।
