-তুই চুপ কর। যা হচ্ছে হতে দে।
–তার মানে? সবাই অন্যায় করছে তুমি তাকে সাপোর্ট করবে?
–যেখানকার যা কালচার। আমি কি করব বল? আমি রামমোহন হতে পারব না।
-বাবা, তোমার মুখে এমন কথা মানায় না। অভিমানে চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল মাধুরীর। অভিমানের দাম বেশির ভাগ সময় পাওয়া যায় না। মুখ ফুলিয়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল মাধুরী।বাবার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেতাই গরিয়ে গেল তার।সবাই গড়পড়তা, কেউ আর ব্যতিক্রমী হওয়ার দুঃসাহস দেখাল না। নিজের বাবাকে নিয়ে মাধুরীর গর্ব ছিল মনে। সে ভাবত তার বাবা অসাধারণ। এ গ্রামের কারোর সঙ্গে তার বাবার তুলনাই চলে না।
ভুল। তার ভাবনাটা সম্পূর্ণ ভুল। সব মানুষের ভিতরে বাঘ আর বেড়াল ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ওরা সময় আর সুযোগ বুঝে বাইরে আসে। সচরাচর ওদের থাবায় নখ লুকানো থাকে, সাধারণ ছা-পোষা মানুষ সেই নখগুলো দেখতে পায় না।
চারদিনের মাথায় প্রায় বিশটা কলাগাছ হুমড়ে পড়ল জলে। সব চাইতে আশ্চর্য ডুমুর গাছটাও বাদ গেল না বানের জলের কামড় থেকে। গোড়ার মাটি কী ভাবে যেন আলগা হয়ে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে গাছটাকে। ডুমুরের খসখসে পাতা ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে জল। উপরের জল ধরলেও মাঠের জল ঠায় দাঁড়িযে। চড়া রোদ উঠলে জল মরবে একথা বলছে মুরুব্বিরা। সবার কথা মন দিয়ে গিলছে শুভ। এই জলে ঘেরা জীবনকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে সে।
টানা ছদিনের পর জল কমতে লাগল বন্যার। ডুবে যাওয়া ঝোপ ঝাড়ের পাতা পচে গন্ধ ছাড়ছে চারধারে। এই গন্ধটাই ভয়ের কারণ। পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে ছাড়ে। ডুবো ঘাস খেয়ে গলা ফুলেছে ছাগলের। গোরুগুলো ছেরানী রোগের প্রকোপে প্রায় শেষ হয়ে গেল। মাঠের ফসল হারিয়ে চাষীর মাথায় হাত।
সন্ধের আগে পাকা রাস্তায় জটা হালদারকে ভান-বিকশা থেকে নামতে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল অবনী। দেশলাই আর বিড়ি কিনতে সে ব্ৰহ্মাণীতলায় গিয়েছিল। জটা হালদারকে দেখে বুকের ভেতরটা ধড়মড় করে উঠল তার। বাঁধ ভাঙার দিন মাছ ধবতে গিয়ে জলে ভেসে গেল জটা হালদার। তার বউ আদুরী কাঁদতে কাঁদতে গ্রামে ফিরেছে এ পথ দিয়ে। বউটার সেই কান্না এখনও কানে লেগে আছে অবনীর। স্বামী হাবানোর শোক সেদিন তার চোখেমুখে লক্ষ্য কবেছিল সে। মনে মনে ব্যথা পেয়েছিল সে নিজেও।
হঠাৎ কোথা থেকে ফিরে এল জটা হালদার? এই প্রশ্নটা যখন অবনীর মাথায় ঘোঁট পাকাচ্ছে তখন থুতনি চুলকাতে চুলকাতে এগিয়ে এল জটা হালদার। বত্রিশ পাটি দাঁত দেখিয়ে বলল, অবনীদা ভালো আছো তো?
–হ্যাঁ ভাই সব ভালো। তা তোমার খবর কি?
–আমার কথা বাদ দাও। মা বুড়োমার দয়ার কোনোমতে আমি প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এলাম।
–বাঁধ ভাঙার দিন ঠিক কি হয়ে ছিল তোমার? অবনী কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারল না।
কী আর বলব দাদা। কপাল মন্দ হলে যা হয়। বিমূঢ় স্বরে কথাগুলো আউড়ে আকাশের দিকে তাকাল জটা হালদার, খ্যাপলা জাল নিয়ে মাছ ধরছিলাম বাঁধের গোড়ায়। বাঁধ যে ভেঙেছে সে খবর আমার কানে এসেছে যথাসময়ে। কুমোর খাদ যেই না জাল ফেলেছি এমনি শরীরের ভারে বাঁধের কোনার মাটি খসে আমি একেবারে ঠিকরে পড়লাম জলে। বানের জল তখন বোঁ-বো করে ঘুরছে। সেই ঘূর্ণি জলে বেশ কয়েকবার পাক খেয়ে আমি তলিয়ে গেলাম। স্রোতের টানে আবার ভেসে উঠলাম দশ হাত তফাৎ-এ গিয়ে। তখন আর ডাঙায় ফেরার কোনো উপায় নেই। জল হুড়মুড়িয়ে ছুটছে চাপড়ার বিলের দিকে। প্রাণের দায়ে গা ভাসিয়ে দিলাম সেই জলে। মনে মনে ভেবে নিলাম সাঁতার জানি যখন ডুবব না। দেখি জল আমাকে ঠেলতে ঠেলতে কর নিয়ে যায়। মুখ ফাঁক করে শ্বাস নিল জটা হালদার। অবনীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে কথা হাতড়াল অনেকক্ষণ।
-তারপর? অবনীর তর সইছিল না। মনটা চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
জটা হালদার অবনীর মনের ভাব বুঝতে পেরে মুচকি হাসল, তারপর চলো চিবকে আলতো হাত বুলিয়ে বলল, দাদা গো ভাসতে-ভাসতে পড়ে গেলাম একেবার পাগলা চণ্ডীর দহে। কী কালো জল, আর কী ঠাণ্ডা! মনে হল জল নয়, কিলবিল করছে সাপ। সেই যে ভাসার শুরু তার আর শেষ নেই। শেষে কি না উঠলাম নবদ্বীপেব গঙ্গায়। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে জল ভেঙে আসছি। দেবগ্রামে ভ্যান পেলাম। এটুকু রাস্তা আর হাঁটতে হয়নি।
অবনী জটা হালদারের ভেসে যাওয়ার , শুনে বিস্মিত না হয়ে পারল না, অবশেষে বিড়বিড়িয়ে সে বলল, একে বলে রাখে হরি তো মারে কে? যাও, ঘর যাও। তোমার বউতো কেঁদে কেঁদে মুচ্ছা যাচ্ছে। তার তো পাগলের দশা।
-বউয়ের কথা না শুনলে এমন বিপদ হয় গো। আফসোস ঝরে পড়ল জটা হালদারের গলায়, যাই গো, জানি না আদুরী আমার কেমন আছে। বেচে পাড়ের মাটি যখন প্রথম ছুঁলাম, তার মুখটাই আমার মনে পড়ছিল। হাঁটুডোবা জলে জটা হালদার ছোটার মতো করে হাঁটছিল। ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভর্তি মুখটা কালচে হয়ে গিয়েছে বানবন্যায়।
হাসপাতালের মাঠ অনেক নামলা। হাঁটুডোবা জল এখনও আড়াল করে বেখেছে ঘাসের সংসার। ঝোপঝাড়ের ডুবে থাকা সংসার এখন হাঁটু জলে ঝাঁকড়া মাথা তুলে শ্বাস নিতে চাইছে। কদিনের জমা জলে গাছের পাতায় ভরে গিয়েছে পলি। রোদ পড়লে বদলে যাবে পাতার বরন। পলিমাটি শুকিয়ে ঝুরঝুবে বাতাসে ঝরে পড়বে নীচে।
