মাছ ধরার প্রস্তাবটা লুফে নিল শুভ। মাটি ডুবে গিয়েছে জলে। এ সময় কেঁচো পাওয়া যাবে না। মাছ ধরতে হলে আটার টোপকে কাজে লাগাতে হবে। টোপ ছাড়া কেউ আর বঁড়শির কাছে ঘেষতে চায় না।
শুভ লম্বা ছিপ ফেলে বসে আছে জলের দিকে তাকিয়ে। বেলেমাছগুলো সাঁতরে চলে যাচ্ছে পগার-পার। মাছগুলো বোকা। একবার টোপের দিকে ওদের নজর পড়লে ভাগ্য খুলে যাবে। বেলে মাছগুলো খেতে খুব সুস্বাদু।
শুধু মাছ ভাসে না, ভেসে যায় কাঠের খাট, কাঠের সিন্দুক, দরজা। খড়ের চালাঘর ভেসে যেতে দেখে শুভ চেঁচিয়ে ডাকল, মা, দেখে যাও ঘর ভেসে যাচ্ছে।
হাতের কাজ ফেলে ছুটে এল সরস্বতী। এই বান বন্যায় কত মানুষের যে কপাল পুড়ল কে জানে। স্রোতের মুখে যে পড়বে সেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এ তো জানা কথা। জটা হালদার সব জেনেও ঝাঁপ দিয়েছে জলে। ওর দৈনন্দিন অভাব বাধ্য করেছে ওকে ঝাঁপ দিতে। বিপদে সুযোগ খোঁজে অনেকে। চরম বিপদের দিনে অনেকেই আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এসব কাজে সফলতা কম এলেও ঋকি হাজার গুণ বেশি।
জটা হালদার যদি ভেসে যাওয়া পাটের মাড় ধরতে পারত তাহলে বেশ কিছু টাকা সে পাট ছাড়িয়ে উপার্জন করে নিতে পারত। তা যখন হয় নি তার জন্য আর মনে মনে আফসোস করে লাভ নেই।
জল স্থিতু হবার পর কলার ভেলা নিয়ে হাসপাতালের দিকে গিয়েছিল অবনী। পিচ রাস্তার দিকে যতই এগোচ্ছিল ততই যেন পাক খাচ্ছিল কলার ভেলা। লগা ঠেলেও বাগে আনা যাচ্ছিল নাসেই ঘূর্ণি। তবু দক্ষ হাতে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতিকে সামাল দেয় অবনী।
পুরো হাসপাতাল চত্বর বান ঢোকার পর আর চেনা যায় না। শুধু খেজুর গাছগুলো মাজা জলে দাঁড়িয়ে আছে, ওদের ঝাঁকড়া মাথায় আশ্রয় নিয়েছে সাপ পোকামাকড়। সব চাইতে বেশি বিপদে পড়েছে পিঁপড়ের দল। ওদের বেশির ভাগই ভেসে গিয়েছে জলের স্রোতে, যারা নিজেদের কোনোমতে বাঁচিয়েছে তাদের আশ্রয় এই গাছগুলো।
ফেরার সময় অবনী শিউরে উঠেছিল খরিস সাপের ফণা তোলা মাথা দেখে। বান-বন্যায় ওরাই বা যাবে কোথায়? জলে খরিস সাপের সাঁতার কাটা এর আগে সে দেখেনি। হাসপাতালের মাঠে সেই বিরল দৃশ্য দেখতে পেয়ে মনের ভয়ে সে জড়িয়ে গেল।
খরিস সাপের গল্পটা শুভ বা সরস্বতীর কাছে করা যাবে না, ওরা তাহলে ভয়ে আর জলের দিকে তাকাবে না। বন্যার আলোচনা যেদিন থেকে শুরু হয়েছে সেদিন থেকে শুভ ভীষণ মনমরা। এই অসাম্য তার মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। মেঘলা আকাশের মতো গুম মেরে আহে সে। বোঝা যাচ্ছে নিজের ভেতর ঝড় বইছে তার। এত দিনের সাজিয়ে রাখা স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছে তার।
সবুজ যাওয়ার সময় তাকে একটা কথাও বলেনি। এই হাসপাতালে শুভর সব চাইতে কাছের মানুষ অতসী পিসি। জ্ঞান পড়ার পর থেকে এই পিসিকেই সে নিজের পিসি বলে জেনে এসেছে। অথচ কোয়ার্টার ছাড়ার সময় এই পিসিও একবার মুখে জিজ্ঞেস করল না। এত দিনের আগলে রাখা সম্পর্ক এভাবে টলে উঠবে হঠাৎ ভাবতে পারেনি শুভ। মানুষ কি তাহলে এরকম স্বার্থপর হয়? কেন হয়? আত্মরক্ষার জন্য মানুষের এই বেহায়া স্বার্থপরতা মন থেকে মেনে নিতে পারে না শুভ। অথচ সবাই যে একই ছাঁচে গড়া তা নয়। নোনা আতা আর মিষ্টি আতার ফারাক নিয়ে যে যার মতো বেঁচে আছে।
শুভর মন খারাপ লক্ষ্য করে অবনী বলল, জল চিরকাল একভাবে থাকবে না। যত দিন যাবে ধীরে ধীরে জল কমবে। জল কমলে তুই বাজারের দিকে যেতে পারবি, তখন তোর এত মন খারাপ করবে না।
শুভ কিছু না বলে অবনীর মুখের দিকে তাকাল। চারদিকের জল তার মনে কোনো শাস্তি দিতে পারছিল না এটা সত্যি কথা। তবু সবুজ আর রঘুনাথের কথা মনে পড়ে তার মনটা কেমন বিষাদে ছেয়ে গেল। বিপদের দিনে ওরা যদি পাশে থাকত তাহলে মনের জোর কত বেড়ে যেত। ঢোঁক গিলে সে বলল, এত জল জীবনে আমি প্রথম দেখলাম। সবাইকে হারানো যাবে কিন্তু জলকে হারানো অত সহজ নয়।
খুশিতে ঘাড় নেড়ে অবনী বলল, ঠিক কথা। বন্যা আমি জীবনে ঢের দেখেছি। তবে এবারে বন্যা বেশ জমকাল। এবার বন্যা আঁটঘাট বেঁধে এসেছে।
-বৃষ্টি কমে গেলে বন্যার খোঁতা মুখ ভোতা হয়ে যাবে। সরস্বতী মুখ বেজার করে বলল।
অবনী তার কথায় সায় দিল, ঠিকই বলেছো। বৃষ্টি হল গোদের উপর বিষফোঁড়া। ফোঁড়া ফেটে যতক্ষণ না পুঁজ বেরচ্ছে ততক্ষণ আর রেহাই নেই।
শুভ উশখুশ করছিল কিছু বলার জন্য। সরসবতী তাকে বলল, বৃষ্টি হোক, বানবন্যা যাই হোক তবু এর মধ্যে তোক পড়তে হবে। ইস্কুল খুললে তোর পরীক্ষা। এবার আরও ভালো করে পাশ করতে হবে ।
সরস্বতীর মুখের দিকে তাকিয়ে শুভ অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সব বইখাতা নিয়ে ছাদে ওঠা সম্ভব হয়নি। কাপড়ে বইগুলো বেঁধে রেখে এসেছে তক্তপোষে। জল আর না বাড়লে ওগুলোর আর কোনো ঝুঁকি নেই। মাধুরী বলেছে এবার একসাথে পড়বে। ফিজিক্স কেমিস্ট্রি আর অঙ্কটা দেখিয়ে দেবেন ডাক্তারবাবু। এছাড়া টিউশনির মাস্টার তো আছেন।
মাধুরী এত বড়ো বিপদেও তাদের কথা ভোলেনি। সবুজের চাইতে মাধুরীর মন ঢের ভালো। সে তার বাবার সঙ্গে তর্ক করে গেছে সমানে। জোর দিয়ে বলেছে, শুভদের আমাদের সঙ্গে শিবনাথবাবুর বাড়িতে নিয়ে চলো। আমরা না নিয়ে গেলে ওদের কেউ থাকার কথা বলবে না। এটা গ্রাম। আমি সব বুঝে গিয়েচি।
