-ধীরে ধীরে কানে সব সয়ে যাবে।
–সয়ে যাওয়ার আগে যেন কালা না হয়ে যাই।
কষ্টের মধ্যেই হাসল অবনী, কপালে যা লেখা আছে তা তো হবেই। এ কেউ খণ্ডাতে পারবে না।
কপাল ধরে বসে থাকলে কি দিন চলবে?
–দিন চলুক না চলুক কপালই সঙ্গে যাবে। অবনী জোর খাটাল কিন্তু তার কথাকে কোনো পাত্তা দিল না সরস্বতী।
শুভ অবাক চোখে দেখছিল জলের যাতায়াত। মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই হাঁটু ভোবা জল খলবলানো মাঠে। কত কি যে ভেসে গেল তার চোখের সামনে। ঘর গুছিয়ে যারা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেল তার আর কোনোদিন দেখতে পাবে না এমন ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্য!
সরস্বতী ইটের চুলা বানাচ্ছে যত্ন নিয়ে। সেদিকে অলস চোখে তাকিয়ে আছে অবনী। পেটের মতো অগ্নিকুণ্ড আর হয় না। চুলা না বানালে ভাত ফুটবে না। ভাত না ফুটলে পোটের গর্ত ভর্তি হবে কি করে? ভাগ্যিস চাল আটা আনিয়ে রেখেছে বেশি করে! কেউ তো এন না আগাম, জল কবে নামবে?
বেলা মরে এলে জলের গভীরতা আরও প্রকট হয়। ঘোলা জলের রঙ বদলে সে তখন রূপ বদলান মায়াবী। এই জলে নাকি বিষ থাকে। ছোঁয়া লাগালে কুটকুটায় গা-গর। জল বসে গেলে জ্বরজালা এড়ানো বড়ো মুশকিল।
ঝমঝমানো বৃষ্টি নয়, বুক সমান জলে তীক্ষ্ণ কাচের মতো টুকে যাচ্ছে বৃষ্টির ফলা। আর একটু পরে অন্ধকার নেমে আসবে, আকাশের গুড়গুড় শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস জানিয়ে দিচ্ছিল তার পূর্বাভাস। ধেয়ে আসা অন্ধকারের দিকে ধেয়ে আসছিল ফেনামুখো জল। চাপড়ার বিল পেরিয়ে এই জল সটান চলে যাবে পাগলাচণ্ডীর দহে।
বানের জলে মাছ ধরতে গিয়ে তোড়ের মাথায় ভেসে গিয়েছে জটা হালদার। তার বউ আদুরী বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে গাঁয়ে ফিরছে। হাসপাতালের ভাঙা পাঁচিলের পাশ দিয়ে পাড়ায় ঢোকার পথ। পথের পাশে কামারডোবা। গোড়া মোটা তেঁতুল গাছটার শেকড় সদা ছুঁয়ে আছে ডোবার-হৃদয়। একটু এদিক হলে গলা জল থেকে ডু জলে পৌঁছে যাবে মানুষ। সাঁতার না জানলে ওখানেই একবারে সাঙ্গ হবে ভবলীলা।
আদুরীর মাথার কোনো ঠিক নেই, তাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরও তিনজন। ওদের সান্ত্বনা বাক্যে মন ভুলছে না আদুরীর, থেকে থেকে হিক্কা মেরে উঠছে। তার কাঁধ থেকে খসে গিয়েছে শাড়ির আঁচল। মানকচুর মতো ফর্সা শরীর বলে দিচ্ছে তার শরীর ত্রিশও পেরোয়নি। এই বয়সে স্বামী হারালে সে যে খোটা উপড়ানো গোরুর মতো চরাবে। সমাজ লোকলজ্জাকে তার খুব ভয়। দাদ হলে সারানো যায়। কিন্তু শরীরে ঘা হলে সারাবে কিসে।
পাশের মেয়েটি আদুরীর চেয়ে ছোট, লজ্জায় চোখ কুঁকড়ে সে বলল, দিদি গো, সব বেরিয়ে গেছে বুকটা ঢাকো।
জলের আড়াল কোনো আড়াল নয়। জল বড়োজোর আশ্রয়।
আদুরী কাঁদতে কাঁদতে বুক ঢাকা দিয়ে বলল, কত করে মানা করলাম তবু কথা শুনল না। মাছ ধরার নেশাই ওর কাল হল। ওকে কালে খেল, এখন আমাকে যে কে খাবে হে ভগবান বলে দাও।
সুরেলা কান্না আর্দ্র বাতাসের বুক ভার করে দেয়। পাশের মেয়েটি আদুরীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, কেঁদো না, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। জটাদা ভালো সাঁতার জানে। সে ভেসে গেলেও ডুবে যাবে না।
ঘূর্ণি জল ফুটরসের চেয়েও প্রাণঘাতী। ওরে বুন, আগুন জল আমার মানুষটাকে কি ছেড়ে দেবে? নাকের সকড়ি মুছে বড়ো করে শ্বাসটান দিল আদুরী। আবার বুকের শাড়ি তার খসে পড়ল নাভি ডোবা জলে। কেমন ভায়ে-চিন্তায় ছোট হয়ে গিয়েছে আদুরির বুক দুটো। জলীয় হাওয়ায় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছিল তার কান্নার গতি।
বৃষ্টির তোড়ে সারারাত দু-চোখের পাতা এক হল না সরস্বতীর। ভোরের দিকে শুভ ওই স্যাঁতসেঁতে বিছানায় দেহ এলিয়ে দিল। তখনও বজ্র-বিদ্যুত এৎ খেলা চলছে আকাশে। গালে হাত দিয়ে ঠায় বসে আছে অবনী। হাওয়াতে তাবু উড়ে গেলে সে চেপে ধরবে খুঁট। সরস্বতীও সতর্ক। মাথা বাঁচানোর জন্য ছাউনিটাকে বাঁচাতে হবে। আকাশ যখন মাথা বাঁচাতে অপারগ তখন একটা মানুষ অন্য মানুষের ছায়া হয়ে বেঁচে থাকে।
সকালের আলোয় অবনী দেখল আর জল বাড়েনি। কলাগাছের কোমর ডোবা জল একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
লাল চা বানিয়ে সরস্বতী ডাকল, কই আসো। চা খাবা না?
চায়ের কথা শুনে মনে স্মৃর্তি হল অবনীর। ফি-সকালে অতলী দিদিমণি তার জন্য চা বানান। ওর জন্য আলাদা কাপ রাখা আছে দিদিমণির ঘরে। সকালবেলায় অতসী দিদিমণির ঘরে চা খাওয়াটা তার কাছে একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছে।
লাল চায়ের দিকে তাকিয়ে অবনীর মনটা হঠাৎ ভরে উঠল বিষাদে। অতসী দিদিমণি তার পাশের গাঁয়ের অথচ বিপদের দিনে তাকে ফেলে চলে লেগেন এই ক্ষোভ জ্বালার কথা সে কাকে বলবে? কিছু কথা থাকে যা গলা ফাড়িয়ে বলা যায় না? অতসী দিদিমণি ফিরে এলে সে কি আগের মতো তার সাথে মিশাতে পারবে?
সিঁড়ি বেয়ে নেমে গিয়ে জলে হাত রেখেছে শুভ। সরস্বতী তাকে দেখতে পেয়ে সাবধান করল, অমন করিস নে বাবা, পড়ে গেলে বিপদ ঘটে যাবে।
শুভ মার কথাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো করে তাকাল, পড়ে গেলেই বা, আমি তো সাঁতার জানি!
সাঁতার সব সময় কাজে লাগে না। এ তো পুকুর নয় যে সাঁতার কাটবি। বানের জল বড়ো নোংরা হয়।
শুভ ত জলের কাছ থেকে নড়ল না। সরস্বতী তাকে ভোলাবার জন্য বলল, সময় নষ্ট না করে বরং ছিপ নিয়ে বস। বানের জলে ডোবা-পুকুরের মাছ থাকে।
